ইরানের ইসলামি বিপ্লবে কেন এতো আগ্রহ ছিল ফুকোর?

ইরানের ইসলামি বিপ্লবে কেন এতো আগ্রহ ছিল ফুকোর?

যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান কাসেম সোলেমানির হত্যাকে কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যে চলছে উত্তেজনা৷ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের এ সংঘাত নতুন নয়, কয়েক দশক পুরনো৷ কীসের সংঘাত এটি, এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলছেন- এটি সভ্যতার সংঘাত৷ কেউ কেউ আবার ‘সভ্যতার সংঘাত’ বলেই থেমে নেই৷ তারা একে বলছেন- সাম্রাজ্যবাদের সংঘাত৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় নানা সময়ে নানা ধরনের ‘প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে৷ প্রথমদিকে এটি হতো উন্নয়নের নামে যার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ‘আমেরিকানাইজেশন’ ঘটাতে চেয়েছে তারা৷ আর গত দশকের গোড়ার দিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মার্কিন যে ‘চেষ্টা’ তার ফল আমরা সবাই দেখছি৷ অনেকটা কাছাকাছি জায়গা থেকেই ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থাটিকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে৷

১৯৭৮ সালে ইরানে হওয়া ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই মূলত এ দুদেশের বৈরিতার শুরু৷ এ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা পুতুল বলে বিবেচিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি৷ আর তারপরের ইতিহাস অনেকেরই জানা৷

ইরানের এ বিপ্লবটি নানা কারণেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে৷ অনেকেই এটিকে ফরাসি ও বলশেভিক বিপ্লবের পর তৃতীয় বড় কোন বিপ্লব হিসেবে দেখে থাকেন৷ রাজনীতির ময়দান থেকে শুরু করে বিশ্বিদ্যালয়ের জ্ঞানগম্ভীর আলোচনায়ও এটি উচ্চারিত হয়ে থাকে৷ পশ্চিমা দার্শনিকদের মাঝেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে এ বিপ্লব৷ ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ছিলেন তাদেরই একজন৷ তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বিষয়ে ফুকো বেশ কিছু জায়গায় তার সমসাময়িক তাত্ত্বিকদের চেয়ে আলাদা ছিলেন৷ যেমন এ বিপ্লবের সৃষ্টি কাঠামো ও ধরন বোঝার জন্য ফুকো বিপ্লব চলাকালীন ইরান সফর করেন দুবার৷

কাঠামোবাদ ও উত্তরকাঠামোবাদ ঘরানার এ দার্শনিক ইরান বিপ্লব নিয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে শুধু চিন্তার জগতেই নয়, ইউরোপের সাংবাদিকতার এক নতুন ধারা প্রবর্তন করেন৷ ইতালির ‘করিয়েরে ডেলা সেরা’ নামের পত্রিকার সাথে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি৷ কথা থাকে বিপ্লব ঘুরে তিনি এ পত্রিকাটিতে তাঁর নিজস্ব ভাবনার মেলে ধরবেন৷ আর তাই এটিকে নৃবিজ্ঞানী ফুকো একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে নেন৷ ঘটনার হয়ে ঘটনাকে বুঝার যে চর্চা নৃবিজ্ঞান করে থাকে তার সাথে সাংবাদিকতা যুক্ত করলেন ফুকো৷ ইতালির এ পত্রিকাটির পাশাপাশি ফ্রান্সের একটি দৈনিকও তখন ফুকোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়৷ আর এ দুই পত্রিকায় মোট ১৫টি ব্যাখামূলক নিবন্ধ লিখেন দার্শনিক ফুকো ৷ যার মাত্র তিনটি ছিল ইংরেজি ভাষায়৷ যদিও পরবর্তীতে অনেকেই ফুকোর বাকী প্রতিবেদগুলো ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন৷

‘‘আমি ইরানে যেতে চেয়েছি কারণ আমি নতুন ধারণার জন্ম দিতে চেয়েছি, যেখানে বুদ্ধিজীবিতা ও সাংবাদিকতা একসাথে চলবে,’’ বলেন তিনি৷

ইরান বিপ্লব নিয়ে কী বলেছিলেন তিনি? আসলে ফুকো কী বলেছেন- তা এক কথায় বলা খুব মুশকিল৷ তবে ইরানের এ ইসলামি বিপ্লবকে তিনি সমর্থন করেছিলেন, এক কথায় বলতে চাইলে এটিই বলা যেতে পারে৷ এমনকি সেসময়ের নিকারাগুয়ার বিপ্লব কিংবা পোল্যান্ডের সলিডারনস্ক বিপ্লব ফুকোকে ততোটা আকৃষ্ট করেনি৷ প্রশ্ন দাঁড়ায়, ধর্মীয় মতবাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ইরানের এ বিপ্লবকে তিনি কী বলে সমর্থন দিয়েছিলেন।

ইরানে এ বিপ্লবের প্রশ্নে মিশেল ফুকো কী বলেছেন বুঝতে হলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে ফুকোর ভাবনাকে বুঝতে হবে৷ ফরাসি এ দার্শনিক ছিলেন ইউরোপের চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর অনেকটা নাখোশ৷ ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ বইতে তিনি বলেন, “আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্ষমতাকাঠামোকে ভিন্নরূপে উৎপাদিত করে যেখানে ব্যাক্তির স্বাধীনতা ভিন্নরূপে দমন করা হয়৷”

এনলাইটেনমেন্টের যে ভাবনার উপর ইউরোপ দাঁড়িয়ে আছে, সে ভিতটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি৷ তার মতে এ এনলাইটেনমেন্টের ফলে মানুষের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি মেলেনি৷ ফ্রান্স বিপ্লবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এ বিপ্লবটি মানুষের স্বাধীনতার নয় বরং নিয়ন্ত্রণের মুখোশ পড়ে ছিল৷” ‘নিয়ন্ত্রণের’ উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বর্তমান শ্রমব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা বলেন, যেখানে ফুকো মনে করেন ক্ষমতা পুনরুৎপাদিত হয় এবং সমাজে এর প্রয়োগ হচ্ছে৷ আর তাই স্বভাবতই ইউরোপের মডার্নাইজেশন প্রকল্পেরও বিরোধী তিনি৷

বিপ্লব চলাকালীন ইরানের বিখাত সাহিত্যিক বাকির পাহরামকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ফুকো বলেন, ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ডে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবের পর তৈরি হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটালিজম৷ যে র‍্যাশনাল সোসাইটি নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল সেটি কিন্তু দাঁড়ায়নি৷

তার ভাষায়- ‘‘আমি বলছি না যে এর জন্য সে সময়ের দার্শনিকরা দায়ী কিন্তু তারা সমাজ গঠনের যে ধারণাটি দিয়েছিলেন সেটিই কিন্তু বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী৷’’

উপায় হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘আমাদেরকে একটি বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন দাঁড় করাতে হবে৷’’

ঠিক এখান থেকেই ইরান বিপ্লবের বিষয়ে ফুকোকে বোঝা যেতে পারে৷ নাগরিক সুবিধার অভাব, সীমাহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জ ক্ষমতাসীন পাহলভির বিরুদ্ধে তখন গর্জে উঠছে ইরানের জনগণ৷ আর খামেনি তখন ফ্রান্সে নির্বাসিত৷ ঠিক সে সময়ে ১৯৭৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ফুকো প্রথম তেহরানে যান৷

পাহলভির সেনাবানীর ট্যাংকের সামনে দিয়ে নির্ভয়ে এগিয়ে যাওয়া জনতার এ ইচ্ছাকে তিনি বলেছেন ‘কালেকটিভ উইল’ বলে৷ নৃবিজ্ঞানে ‘কালেকটিভ উইল’ বলতে বুঝায় একটি গোষ্ঠির সদস্যদের ভাবনার জায়টি যখন একই রকম হয়৷ ফুকো বলেন, এ ধরনের কালেকটিভ উইল দেখতে পায় না সবাই৷ ফুকো নিজেও তাঁর জীবদ্দশায় এমন কিছু দেখতে পাবেন বলে ভাবেননি, নিজেই স্বীকার করেন তিনি৷ জনগণের এ সম্মিলিত ইচ্ছাকে, ফুকোর কথা অনুযায়ী, “আধুনিকায়নের আমেরিকান যে ধারণা সে ধারণাকে প্রতিহত করতে চেয়েছে৷” দল মত নির্বিশেষে এতো মানুষের একটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের বিষয়টিকে তিনি আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন৷ আর এর পেছনের শক্তি হিসেবে তিনি টেনে এনেছেন শিয়াদের ধর্মীয় দর্শনকে৷

ইরান বিষয়ে ফুকোর লেখায় দেখা গেছে, দেশটির এ বিপ্লবে ধর্মের অবস্থানটিকে তিনি গোঁড়ামি হিসেবে দেখেননি৷ বরং তিনি বলেছেন ধর্ম এখানে প্রতিবাদ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে দাঁড়িয়েছে, সামাজিকভাবে একত্রিত করেছে, বলতে ও শুনতে শিখিয়েছে, এমনকি শুনতে বাধ্য করেছে৷ ‘ধর্ম আফিমের মতো’- বলে কার্ল মার্ক্সের যে দাবি সেটিকে নাকচ করেণ তিনি৷ এ দার্শনিকের মতে সব সময়ে, সব সমাজে আর সব ধর্মকে যদি এভাবে তুলনা করা হয় তাহলে সেটি সাধারণীকরণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ প্রতিহত করতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে আফিমের মতো করে৷ নিপীড়িত গোষ্ঠিকে বলেছে- তোমাদের এ অবস্থাকে ভাগ্য হিসেবে মেনে নাও, বলেন তিনি৷

শিয়াদের ধর্ম-দর্শন ‘আলি শরিয়তি’ খুব মন দিয়েই পড়েছিলেন তিনি৷ অনেকেই বলে থাকেন ‘আলি-শরিয়তি’ ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মূল দার্শনিক জায়গা৷ ফুকো বলেন, এখানে ধর্মগুরুদের মধ্যে কোন ক্ষমতার স্তর নেই৷ ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক স্বাধীনতা৷ তাদের নির্ভরতা আছে শুধু তার শিষ্যদের কাছে৷ তার মতে, এর মধ্য দিয়েই একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে যেখানে ক্ষমতা বণ্টিত হবে সমানভাবে— যেটি ইউরোপ পারেনি বলে দাবি তার৷

ফুকো বলেন, “শিয়া মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো এই যে, জ্ঞান এবং সত্য উদঘাটনের সর্বশেষ দরজা নবী মোহাম্মদ (সা.) এর পরেই বন্ধ হয়ে যায়নি৷ বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা পরবর্তীতে আসা ইমামদের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে৷ এ সত্য মানুষে ভিতরে নিহিত যে আলো সেটিকে উদঘাটিত করবে বলে বিশ্বাস ছিল তার৷”

ইরানের মানুষকে একত্রিত করার, নিজেকে প্রকাশিত করার ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার যে সক্ষমতা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ফুকো এটিকে দেখতে চেয়েছেন রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে৷ তিনি এও বলেছেন যে, রেনেঁসা পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সমাজে এ অধ্যাত্মিকতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে৷

তার এ ভাবনা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, সে বিষয়ে নিজেও অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন৷ ১৯৭৮ সালের অক্টোবরে ফ্রান্সের একটি পত্রিকায় ‘‘কীসের স্বপ্ন দেখছে ইরানিরা?’’ শিরোনামের লেখাটি ফুকো শেষ করেন এই বলে যে- “ইরান বিপ্লব নিয়ে আমি যখন ‘পলিটিক্যাল স্পিরিচুয়ালিটির’ কথা বলছি আমি জানি যে আমার ফ্রান্সের বন্ধুরা তখন হাসছে৷’’

তবে ইরান বিপ্লব নিয়ে ফুকোর এ ভাবনা বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে৷ অনেকেই ইরান বিষয়ে ফুকোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা যথাযথ ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন৷ ‘ফুকো ও ইরান বিপ্লব’ বইতে জে অ্যাফ্রে ও কে বি অ্যান্ডারসন বলেছেন, “ইরানের সংস্কৃতি ও সেখানকার ধর্ম নিয়ে যথেষ্ঠ জানাশোনা ছিলনা ফুকোর, যে কারণে ইরান বিপ্লব বিষয়ে তার অস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রকাশিত হয়েছে৷”

ফুকো সমালোচিত হতে থাকেন বিপ্লবের পর থেকেই যখন খামেনি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে নারী স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়গুলো সংকুচিত হয়ে আসতে থাকতে৷

ফুকো হয়তো নিজেও ভাবেননি যে পশ্চিমা গণতন্ত্র বা আধুনিকায়ন ধারণার বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিকতাকে ভিত্তি করে একটি সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তা মুহূর্তেই ধুলিসাৎ হয়ে যাবে৷ বেঁচে থাকলে এ দার্শনিক হয়তো নতুন কিছু দেখতে চাইতেন ইরানের চলমান সমাজব্যবস্থা থেকে৷

আরও খবর
Loading...