NOVOAIR

কত টাকার মালিক বিমানের ট্রাফিক হেলপার নিজেও জানেন না!

বিমানের এক ট্রাফিক হেলপারের কত সম্পদ আছে সেটা তিনি নিজেও জানেন না। বলেছেন, আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। কিছু সম্পদ পেয়েছেন উত্তরাধিকার সুত্রে। ঢাকায় ৫ তলা ২টি বাড়ি আছে। নিজে থাকেন এবং ভাড়া দিচ্ছেন। সম্প্রতি ৬০ লাখ টাকায় কিনেছেন বিলাশবহুল প্রাইভেট কার। একটি মাইক্রোবাস ভাড়ায় চলছে।

গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার আলফাডাংগায়ও গড়ে তুলেছেন পাকা দালান। নিজের নামে ও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামেও আছে বিপুল পরিমান জমিজমা। নামের প্রথম অক্ষর শুরু ‌‌’আ’ দিয়ে। নামের শেষে আছে হোসেন। জানাগেছে এই ট্রাফিক হেলপার বিমান শ্রমিক লীগ, ট্রাফিক শাখা বিভাগ-২ এর প্রভাবশালী  (সিবিএ) নেতা। পি নম্বর শুরু ৩৬ দিয়ে। শেষ নম্বর ৩।

বিমানের এই প্রভাবশালী ট্রাফিক হেলপারের বিরুদ্ধে  মানব পাচার, সোনা পাচার ও ট্রাফিক হেলপারদের বদলি, নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগ আছে।

কিছুদিন আগে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোয়া দুই কেজির বেশি সোনার চালান জব্দ করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এসব সোনা পাচারের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মো. সুমন শিকদার (৩৪), শাহিন হোসেন (২৭) ও বেলাল আকন (২৮)।

 বিমানবন্দরের কনকোর্স হল থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এপিবিএন পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রেপ্তার তিনজন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া সোনার মূল্য প্রায় সোয়া কোটি টাকা। পরবর্তীতে তাদের জবানবন্দিতে এই ট্রাফিক হেলপারের নাম বেরিয়ে আসে। এরপর থেকে বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামে। এই তদন্তে বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদ আয়ের তথ্য।

মানব পাচারের মাধ্যমে প্রতি মাসে এই ট্রাফিক হেলপারের আয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। এছাড়া বিমানের ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের কার্ড কেড়ে নিয়ে, বদলির ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা মাসোহারা পায়। বিমানের কাস্টমার সার্ভিস ও ট্রাফিক শাখার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তার ঘনিষ্টতা রয়েছে। একারণে তার কোন কাজ করতে হয় না। সকালে গাড়ি হাকিয়ে অফিসে আসে। কার্ড পাঞ্জ করে বাড়ি চলে যান। এরপর সন্ধ্যায় এসে এক্সিট কার্ড পাঞ্জ করে সারাদিনের চাকরী কনফার্ম করেন। এভাবে চলে তার প্রতিদিন।

দীর্ঘদিন আগে বিমানের আলোচিত জরিনা মামলার সংগেও এই ট্রাফিক হেলপার জড়িত ছিল। কিন্তু মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ওই মামলা থেকে রক্ষা পান তিনি।

কিছুদিন আগে দেয়া এক প্রতিবেদন থেকে   জানাগেছে, হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মানবপাচারচক্রে জড়িতরা বীরদর্পে অবাধে মানবপাচার করে আসছে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কতিপয় প্রতিষ্ঠানসহ ৮৬ ব্যক্তি পাচারচক্রে জড়িত। পাচারকৃত ব্যক্তিকে ‘টানা’ কোর্ড নামে ডাকা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে মানব পাচারকারীচক্রের বিষয়টি স্বীকার করলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারনেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চক্রের প্রভাবশালীদের মধ্যে সিভিল এভিয়েশনের ২৮ জন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৯ জন, ইমিগ্রেশন পুলিশের (এভসেক) ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ১১ জন সদস্য, ৯টি ট্রাভেল এজেন্সি ও ৯ জন বহিরাগত দালাল রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো বিমানের এই ট্রাফিক হেলপার আ. হোসেন।

গত বছর ১৮ জুন বেসমারিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বিমানবন্দরে সক্রিয় মানবপাচারকারী ও তাদের এজেন্টদের কার্যক্রমের বিষয়ে মানব পাচারে জড়িতদের নাম-সংবলিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এরপর গত ১১ জুলাই মন্ত্রণালয় অভিযুক্ত ৮৬ জনের বিমানবন্দরে প্রবেশের নিরাপত্তা পাস ইস্যু থাকলে তা বাতিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর বিমানবন্দরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর করা হয়নি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ালাইন্সের ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী মানবপাচারে জড়িত। তাদের মধ্যে ট্রাফিক হেলপার আমির ও মো. আকরাম হোসেন, ট্রাফিক অফিসার মামুন, কাউন্টার সুপারভাইজার শাকিল ও জাহাঙ্গীর হোসেন, গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার শওকত, মাহবুব ও আনিস। আবার বেসরকারি এয়ারলাইন্সের আট ব্যক্তি মানবপাচারের শক্তিশালী সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছেন।

তারা হলেন— মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের এসএম কামাল হোসেন, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের শাহ মখদুম উদ্দিন আহমেদ অনন, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের মামুন ও নুরুল হুদা, শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ডেপুটি ম্যানেজার এহসান ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ সুমন, কাতার এয়ারলাইন্সের সিকিউরিটি অফিসার তানিয়া, টার্কিশ এয়ারলাইন্সের সিকিউরিটি অফিসার অভি ও মবিন। এদের নাম প্রকাশ হওয়ার পরও তারা অবাধে বিমানবন্দরে যাতায়াত করেই যাচ্ছেন।

আরও খবর
Loading...