করোনাযুদ্ধে টিকে থাকতে চায় বিমান সংস্থা

চার্জ মওকুফ ও প্রণোদনা প্যাকেজে অগ্রাধিকার দাবি ইউএস-বাংলার এমডির

নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে দেশের চারটি বিমান সংস্থাকে। বড় বহর ও গন্তব্য বেশি হওয়ায় বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে ইউএস-বাংলা সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের এভিয়েশন খাতের সংকট ও উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেন মিডিয়ার সঙ্গে।

করোনাভাইরাসে এভিয়েশন খাত ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। বিমান চলাচল স্থগিত থাকায় বিশ্বের নামিদামি বিমান সংস্থাকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। করোনাযুদ্ধে টিকে থাকতে তিনটি বেসরকারি সংস্থাকে তিন বছরের জন্য সিভিল এভিয়েশন চার্জ মওকুফ, নীতি সহায়তা এবং অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রণোদনার অর্থ দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানান ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের এমডি।

দেশের বিমান পরিবহন খাতের ৭০ শতাংশই বিদেশি বিমান সংস্থার দখলে। বাকি ৩০ শতাংশ দেশীয় এয়ারলাইনসের দখলে যারা বছরে প্রায় আট হাজার ৪০০ কোটি টাকার বাজার নিয়ে কাজ করে। স্থানীয় বিমান সংস্থা টিকে না থাকলে দেশের এভিয়েশন খাত বিদেশিদের হাতে চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া ফ্লাইট পরিচালনা করি তখন অনেকগুলো বিদেশি বিমান সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিদেশি মুদ্রা দেশে নিয়ে আসি। আমরা যদি টিকে থাকতে না পারি তাহলে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা নিয়ে যাবে। তাই দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই সকল বেসরকারি বিমান সংস্থার টিকে থাকা জরুরি। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা প্রয়োজন।’

বেসরকারি বিমান সংস্থার মধ্যে ইউএস-বাংলার বহরে আছে সবচেয়ে বেশি ১৩টি উড়োজাহাজ। আর নভো এয়ারে সাতটি এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজে আছে ছয়টি। বেসরকারি খাতে ইউএস-বাংলা সব অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি সাতটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানের এমডি বলেন, ‘আমরা গত আট মাসে ছয়টি ব্র্যান্ড নিউ উড়োজাহাজ এনে বহর সম্প্রসারণ করেছি। কিন্তু করোনাভাইরাস আমাদের সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।

টিকিট বিক্রির আয় না থাকলেও ব্যাংকের কিস্তি, উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন কর, সিভিল এভিয়েশনের নানা চার্জ, বিদেশে সাতটি কার্যালয় পরিচালনার খরচ, পাইলট, ইঞ্জিনিয়ারসহ কর্মীদের বেতন চালাতে আমরা চরম সংকটে পড়েছি। রাষ্ট্র বিমানকে দেখভাল করছে; কিন্তু বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোকেও করোনাযুদ্ধে টিকে থাকতে সরকারের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। চলতি মার্চ পর্যন্ত আমাদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। আর এপ্রিলসহ এই ক্ষতি ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সিঙ্গাপুর, ভারত, চীনের আদলে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।’

তিনি জানান, এভিয়েশন খাতের জন্য ৬১ বিলিয়ন ডলারের ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী এয়ারলাইনসগুলোকে অর্থ সহায়তা, এভিয়েশনসংশ্লিষ্ট সব ধরনের চার্জ থেকে অব্যাহতি, অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থাগুলোর জন্য জেট ফুয়েলের দাম হ্রাস করেছে। ভারতও বিমান সংস্থাগুলোকে বাঁচাতে ১১ হাজার ৯০০ কোটি রুপির প্যাকেজ করছে।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুর বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য ৫০ শতাংশ চার্জ মওকুফ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে যেসব স্পেস বিভিন্ন বিমান সংস্থা ভাড়া নিয়েছে তাও তারা মওকুফ করে দিয়েছে। গুয়াংজু আমাদের সব ধরনের চার্জের ওপর ১০ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। চীনের দুর্দিনেও আমরা ফ্লাইট বন্ধ না করায় গুয়াংজু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের চিঠি দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। যাত্রী কমে গেলেও এখনো আমরা সপ্তাহে একটি ফ্লাইট চালু রেখেছি।’

বিমান, রিজেন্ট, নভো, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস বিদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করে দেশে রেমিট্যান্স আনছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালানোর কারণে আমাদের বিদেশের অফিস চালানোর ভাড়া, কর্মীদের বেতন, এয়ারপোর্ট চার্জ গুনতে হচ্ছে। আমরা যখন ডমেস্টিক ফ্লাইট পরিচালনা করি তখন মাসে আমাদের বিমানবন্দর চার্জবাবদ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) দিতে হয় এক কোটি টাকা।

কিন্তু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় বেবিচককে শুধু ইউএস-বাংলার দিতে হয় প্রতি মাসে ১৫ কোটি টাকা। এ অবস্থায় আগামী তিন বছরের জন্য সব বিমান ও হেলিকপ্টারের যাবতীয় নেভিগেশন, ল্যান্ডিং ও পার্কিং চার্জ মওকুফ করা; প্রণোদনাস্বরূপ এভিয়েশন শিল্পকে আগামী ১০ বছরের জন্য বিবিধ আয়কর ও ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান; যন্ত্রাংশ আমদানি পর্যায়ে ‘আগাম কর’ অব্যাহতি, বকেয়া পরিশোধের ক্ষেত্রে লেট ফি অন্যান্য দেশের মতো বার্ষিক ৬-৮ শতাংশ হারে ধার্য করার দাবি জানাচ্ছি। আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম নিম্নমুখী হওয়ায় জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমরা ৫০ শতাংশ ছাড় চাই।”

সরকারের সাম্প্রতিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে ইউএস-বাংলার এমডি বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এভিয়েশন খাতের কথাও বলেছেন। আমরা একটি তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করব। এই ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল আমাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে সাহস জোগাবে।’

আরও খবর
Loading...