করোনার প্রভাবে ছোট হচ্ছে আকাশপথ, ক্ষতির পরিমান বড়

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রুট। গতকাল শনিবার থেকে হংকং, থাইল্যান্ড, চীন ও যুক্তরাজ্য ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ফ্লাইট চলবে না। এর প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ রুটেও। এ কারণে দেশের আকাশপথে যাত্রী ৭২ শতাংশের বেশি কমেছে।

যাত্রী কমে যাওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর টিকিট বিক্রির আয় প্রতি মাসে ৪০০ কোটি টাকা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশি-বিদেশি মোট ২৮টি বিমান সংস্থা যাত্রী পরিবহন করে। এর মধ্যে দেশীয় বিমান সংস্থা চারটি।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রাদুর্ভাবের আগে প্রতিদিন ২৮টি সংস্থার বিমান আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটে ১২০ থেকে ১৩০টি ফ্লাইট চলাচল করত। এ সংখ্যা আজ রোববার ৭-এ নেমে এসেছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন ও হংকংয়ের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চলছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কেবল যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে ফ্লাইট চালু রেখেছে। এ দুটি রুটে বিমানের সপ্তাহে ১৪টি ফ্লাইট চলে। এ ছাড়া চায়না সাউদার্ন ও ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনসের ঢাকা-গুয়াংজু রুটে সাপ্তাহিক ১৪টি ফ্লাইট চলবে। ঢাকা-ব্যাংককে থাই এয়ারওয়েজের ১০টি ও ঢাকা-হংকংয়ে ক্যাথে-প্যাসিফিকের ১০টি করে ফ্লাইট চলবে।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে যাতায়াত করছেন ১ এক কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার যাত্রী। এর মধ্য আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী ছিল প্রায় ৮৫ লাখ ৯৬ হাজার এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ছিল ৪৪ লাখ ৮২ হাজার। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক পথে যাত্রী ছিল ৮২ লাখ ৬৪ হাজার এবং অভ্যন্তরীণে ছিল ৪১ লাখ ২৫ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণে মোট ৭ লাখ যাত্রী বেড়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ২০২০ সালে যাত্রীসংখ্যা উল্টো কমে যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণে যাত্রী কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি
অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান বাংলাদেশ, নভোএয়ার, ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনস ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রতিদিন ফ্লাইটসংখ্যা ছিল ১৪৪। এর মধ্যে ইউএস–বাংলার ৬০, নভোএয়ারের ৫৪, বিমানের ২৪টি ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়া রিজেন্ট এয়ারওয়েজ শুধু ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে সপ্তাহে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করে। যাত্রীসংকটে গত এক সপ্তাহে বিমান অভ্যন্তরীণ রুটে ৪০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। নভোএয়ার এখন প্রতিদিন ৪২টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ইউএস–বাংলার অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট না কমলেও যাত্রী কমে নেমেছে অর্ধেকেরও বেশি। তবে বাকি বিমান সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ রুটে ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী কমেছে। অভ্যন্তরীণ রুটে এই চারটি এয়ারলাইনস বছরে টিকিট বিক্রি থেকে আয় করে ৮৫০ কোটি টাকার মতো।

অভ্যন্তরীণে যাত্রী কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনার প্রভাব জানুয়ারি মাসে তেমন পড়েনি বাংলাদেশে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আকাশপথে যাত্রী সংখ্যা কমতে থাকে। মার্চ মাসে দ্রুত এটি নেমে যেতে থাকে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটগুলোয় ৩০ হাজার যাত্রী চলাচল করতেন। এ সংখ্যা এখন ১০ হাজারের নিচে নেমেছে। করোনাভাইরাসের কারণে গত ২১ জানুয়ারি থেকে বিশেষ সতর্কতা জারির পর থেকে দেশের এ প্রধান বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক রুটের দেশে আসা সব যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। জানুয়ারি মাসে গড়ে ১০ হাজার যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দর স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জানা গেছে, বিদেশ থেকে যাত্রী আসা কমে গেছে। এ কারণে ১৫ মার্চ সকাল থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন ২ হাজার ১৭৬ জন যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে।

সিভিল এভিয়েশনের আয় কমেছে দিনে ৩৫ লাখ
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব দেশেই এভিয়েশন খাতে বড় ধাক্কা এসেছে। যাত্রী কমে গেছে। তাই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৭০টি মতো ফ্লাইট চলাচল করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এই সংখ্যা আরও কমতে পারে। ক্ষতি শুধু বিমান সংস্থাগুলোর নয়, সিভিল এভিয়েশনের রাজস্ব আয় প্রতিদিন কমে গেছে ৩৫ লাখ টাকা।

গতকাল বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মো. মফিদুর রহমান বলেন, হংকং, থাইল্যান্ড, চীন ও যুক্তরাজ্যে ফ্লাইট চালু রাখা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে এ চার রুটে ঝুঁকি বেড়ে গেলে সেখানেও ফ্লাইট বন্ধ করা হতে পারে।

করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতি হিসাব কষতে শুরু করেছে বিমান সংস্থাগুলো। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) জানিয়েছে, বাংলাদেশে আকাশপথে শুধু যাত্রীদের টিকিট বিক্রি করে বিমান সংস্থাগুলো প্রতি মাসে আয় করে ৬৫০ কোটি টাকা। এই আয় এরই মধ্যে তিন ভাগের দুই ভাগ কমে গেছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মোকাব্বির হোসেন জানান, জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুধু বিমানের ক্ষতি হতে পারে ২৭০ কোটি টাকা।

টিকিট বিক্রি ৬৫০ কোটি টাকা থেকে নামবে ১৮০ কোটিতে
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, আইএটিএর হিসাবে ৬৫০ কোটি টাকার টিকিট বিক্রির আয় নেমে ১৮০ কোটি টাকার কাছাকাছি চলে আসবে। এর সঙ্গে কার্গো পণ্য আনা-নেওয়া বন্ধ থাকবে। করোনাভাইরাসের প্রভাব কেটে গেলেও এই ধাক্কা সামাল দিতে বহু সময় লেগে যাবে। ফ্লাইট কমানো হলেও উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিমানবন্দরে পার্কিং চার্জ, উড়োজাহাজের লিজের টাকা ও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে হবে।

ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব দেবে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি)। এওএবির মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটে ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী কমে গেছে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোকে বাঁচাতে বহু দেশের সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বর্তমান সংকটকালে সিভিল এভিয়েশন চার্জ, যন্ত্রাংশ আমদানিতে অগ্রিম কর ও জ্বালানির ওপর আরোপিত কর বাতিলের প্রস্তাব সরকারকে দেওয়া হবে।

আরও খবর
Loading...