করোনার প্রাদুর্ভাবে ছোট হচ্ছে আকাশপথ, রাজস্ব নামবে অর্ধেকে

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় পর্যটক ভিসা স্থগিত করেছে ভারত। এর ফলে আজ শুক্রবার থেকে আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোনো দেশ থেকেই ভারতে যাওয়া যাবে না। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব বিমান সংস্থা ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে। তাই আজ থেকে আগামী এক মাস সড়ক ও রেলপথের মতো আকাশপথেও ভারতে যাওয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় বিমান সংস্থাগুলোর শুধু যাত্রী হারানোয় দুই কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হতে পারে। পুরো এভিয়েশন খাতে মাসে ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব এরই মধ্যে কমে যেতে পারে।

ভারতের এই সিদ্ধান্তের আগেই আকাশপথ বন্ধ করে দেয় মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ কুয়েত ও কাতার। ৭ মার্চ বাংলাদেশসহ ৯টি দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে কুয়েত। এর পর ৯ মার্চ বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় কাতার সরকার। এ ছাড়া মালদ্বীপও করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ করেছে। তবে ভারতে ভিসা স্থগিত হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ ও ক্ষতির মাত্রা বেশি হবে। কারণ ভারতের এই সিদ্ধান্তের আগে যাঁরা ভিসা পেয়েছেন, তাঁরাও দেশটিতে যেতে পারবেন না।

ভারত ভিসা স্থগিত ও নতুন করে ভিসা প্রদান বন্ধ করায় বহু যাত্রী টিকিট বাতিল করতে শুরু করেছেন। আর যাত্রী হারিয়ে ফ্লাইট গতকাল বৃহস্পতিবার বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে বিমান, নভোএয়ার, ইউএস–বাংলা ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ।

বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার বলেন, কলকাতায় প্রতিদিন দুটি করে বিমানের ফ্লাইট রয়েছে। দিল্লিতেও প্রতিদিন একটি করে ফ্লাইট ছিল। তবে করোনাভাইরাসের কারণে কয়েক দিন ধরে ঢাকা-দিল্লি রুটে প্রতি সপ্তাহে তিনটি করে ফ্লাইট চলত। ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে শুক্রবার সন্ধ্যার পর বিমানের কোনো ফ্লাইট ভারতে যাবে না।

একই কথা জানান নভোএয়ারের সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) এ কে এম মাহফুজুল আলম। তিনি বলেন, আজ সন্ধ্যায় নভোএয়ারের ফ্লাইট যাত্রী ছাড়াই কলকাতায় যাবে। সেখান থেকে ফিরতি যাত্রীদের আনা হবে। তবে ১৪ মার্চ থেকে তাদের কলকাতা ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা-চেন্নাই রুটে এবং ১৬ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা-কলকাতা রুটে কেবল ফিরতি যাত্রীদের আনতে ফ্লাইট চালাবে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস। ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার থেকে ভারতীয় ছাড়া অন্য কোনো দেশের যাত্রীদের কলকাতা ও চেন্নাইয়ে নেওয়া হবে না। এরপর থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইউএস বাংলার ভারতের ফ্লাইট বন্ধ থাকবে।

ভারতের তিনটি বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া, স্পাইস জেট ও ইনডিগো আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্লাইট বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। তবে ভারতীয় ছাড়া অন্য কোনো দেশের যাত্রীদের বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইটে তুলবে না।

অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি ভারতে যাতায়াত করে থাকেন। এদের মধ্যে আকাশপথের যাত্রী সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। তবে ঈদের সময় হলে এই সংখ্যা বেশ বেড়ে যাবে। আকাশপথের এই বিপুলসংখ্যক যাত্রী বাংলাদেশ থেকে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাই রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস বাংলা, নভোএয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, স্পাইস জেট, ইনডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে চলাচল করেন। প্রতি সপ্তাহে এই সাতটি বিমান সংস্থার ফ্লাইট রয়েছে ১৯৪টি।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ভারতের ভ্রমণ বন্ধ থাকায় শুধু যাত্রী হারানোয় বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিদিন দুই কোটি টাকা ক্ষতি হবে। এক মাস এই অবস্থা থাকলে ক্ষতির পরিমাণ হবে ৬০ কোটি টাকার বেশি ছাড়াতে পারে। এর সঙ্গে কার্গো পণ্য আনা-নেওয়া বন্ধ থাকে। তবে দেশের পুরো অ্যাভিয়েশন খাতে ক্ষতি হবে মারাত্মক। কারণ ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় উড়োজাহাজগুলো বসে থাকবে। বসে থাকলে বা আকাশ উড়লে জ্বালানি খরচ ছাড়া উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কিন্তু একই রকম। আর বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাতে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলো লাভের মুখ দেখেনি। সম্প্রতি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। তাদের উড়োজাহাজগুলোও লিজে আনা। উড়োজাহাজের রুট বন্ধ থাকলেও লিজের টাকা ও ব্যাংক ঋণ তাদের গুনতেই হবে। তাই করোনাভাইরাসের প্রভাব কেটে গেলেও বিমান সংস্থাগুলোর ক্ষতি কাটাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।

শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করে ২০১৮ সালে প্রতিদিন ৯ হাজার ৮৩৩ জন যাত্রী দেশে ফিরেছেন। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ১৬৬ জন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এই সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় গড়ে প্রতিদিন ৭ হাজার যাত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ ফেরত যাত্রী আরও কমে গেছে। গত বুধবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে চার হাজার ৬০০ যাত্রী দেশে এসেছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের আগে প্রতি মাসে দেশের অ্যাভিয়েশন খাত থেকে রাজস্ব আসত ১০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এই অঙ্ক ৮০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিদেশফেরত যাত্রী কম আসতেন, কিন্তু বেশি দেশ ছাড়তেন। তবে বিভিন্ন দেশ ফ্লাইট বাতিল করায় এখন বাংলাদেশ থেকেও বিদেশগামী যাত্রী কমছে। তবে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে। যাত্রী সংখ্যা কমায় এ দেশের বিমান সংস্থাগুলোর ক্ষতি হচ্ছে। তাদের কাছে বিভিন্ন চার্জ বাবদ বেশ কিছু অর্থ বকেয়া রয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে সিভিল অ্যাভিয়েশনের পক্ষ থেকে আপাতত তাদের পাওনা আদায়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে না। করোনাভাইরাসের কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের অ্যাভিয়েশন খাত থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হতো, সেটি অর্ধেকে নেমে যেতে পারে।

আরও খবর
Loading...