করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে বাংলাদেশে ফিরেছেন দুই লাখ প্রবাসী

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশী দেশে ফিরেছেন। তাদের নাম ঠিকানাসহ বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। সেই তালিকা প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। দেশে ফেরা প্রবাসীদের মধ্যে লক্ষাধিক প্রবাসী নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। আবার অনেকেই করোনাভাইরাসের কারণে হোম কোয়ারেন্টাইন বা নিজবাড়িতে সঙ্গীহীন থাকার ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের শনাক্ত করতে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। দেশে আসা ব্যক্তিদের অবস্থান জানার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আত্মগোপনে চলে যাওয়া ওইসব ব্যক্তির অবস্থান জানার পর সংশ্লিষ্ট জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করছে পুলিশ। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য অনুরোধ করছেন। অনেক সময়ই তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্য করতে হচ্ছে পুলিশকে। করোনাভাইরাসের হাত থেকে নিরাপদ থাকার প্রয়োজনীয় পোশাক না থাকায় পুলিশ বাহিনীতে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার ইমিগ্রেশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চীনের উহানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশী দেশে ফিরেছেন। সম্প্রতি বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে তার আগেই বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসা ব্যক্তি বিমানবন্দর থেকে যার যার গন্তব্যে চলে গেছেন।

দিন দিন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর ইমিগ্রেশন থেকে বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশীদের একটি তালিকা করা হয়। তালিকা মোতাবেক তাদের সর্ম্পকে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ করে আগত বাংলাদেশীদের নামসহ স্থায়ী ঠিকানা সংবলিত একটি তালিকা তৈরি করা হয়। যে যে এলাকার বাসিন্দা সেই এলাকায় পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন বরাবর সেই তালিকা পাঠানো হয় পুলিশ সদর দফতরের মাধ্যমে। তালিকা পাঠানোর পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশীদের টানা ১৪ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্য করতে পুলিশকে কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়। যারা বাড়ি থেকে আত্মগোপন করেছেন তাদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য সাঁড়াশি অভিযান চালানোর নির্দেশনা জারি করা হয়।
এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে রাজশাহী জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ইতোমধ্যেই পুলিশ সদর দফতরের তরফ থেকে করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশীদের একটি তালিকা প্রতিটি জেলায় পাঠানো হয়েছে। সে মোতাবেক তার কাছেও একটি তালিকা এসেছে। তালিকা মোতাবেক রাজশাহী মেট্রোপলিটন এলাকা বাদে শুধু রাজশাহী জেলায়ই ১ হাজার ৩০৮ বাংলাদেশী করোনা আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ফিরেছেন বলে জানানো হয়েছে। তালিকায় থাকা সেই ঠিকানা মোতাবেক তাদের বাড়িতে বাড়িতে প্রথম প্রথম গোয়েন্দা লাগিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক অনেকেই বাড়ি ফেরার পর করোনাভাইরাসের কারণে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন। অনেকেই বহু দূরের আত্মীয়র বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। আত্মগোপনে যাওয়া অধিকাংশ বিদেশ ফেরত বাংলাদেশী রাজশাহীর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা বহু বছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বেড়াতে গ্রামে এসেছেন বলে ওইসব পরিবারকে বলছেন। এতে করে ওইসব পরিবারের সদস্যরা খুশি হয়ে তাদের থাকার ব্যবস্থা করছেন। বাড়ি এসে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

তবে যাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের আর বাড়ির বাইরে বের হতে দেয়া হয়নি। বাড়ির সামনে পুলিশের পাহারা বসানো হয়েছে। তারপরেও তারা মাঝে মধ্যেই বাড়ি থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া যে বাড়িতে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তি রয়েছে, সেই সব বাড়ির সামনে পুলিশ রাখা হয়েছে। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে নানা সচেতনতামূলক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এজন্য ওইসব বাড়ির সামনে হ্যান্ডমাইক দিয়ে তাদের দেশ, জাতি, পরিবার, প্রতিবেশী, পরিজনসহ সার্বিক মঙ্গলের জন্য নিজবাড়িতে থাকতে বলা হচ্ছে। তাদের বাড়ির বাইরে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে। অনেকেই এর প্রতিবাদ করছেন। যারা মানছেন, তাদের তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। কারণ তারা সাময়িকভাবে পুলিশের এমন নির্দেশনা মানলেও, সুযোগ পেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে পারেন, এমন ভয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আর যারা এমন নির্দেশনা মানছেন না, তাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যেমন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, গ্রামের মুরুব্বি, মসজিদের ইমামদের ডেকে এনে হ্যান্ডমাইক দিয়ে করোনাভাইরাস সর্ম্পকে তাদের সর্তক করা হচ্ছে। কেন তাদের বাড়িতে থাকতে হবে, এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। অনেকেই আবার নামাজের কথা বলে বা জরুরী কাজের কথা বলে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদেরকে ইমাম ডেকে এনে পবিত্র কোরআন হাদিস মোতাবেক বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ আর অন্য কোন কাজ করতে পারছে না। এ অবস্থা শুধু রাজশাহীতে নয়। প্রায় সারাদেশেই একই অবস্থা বিরাজ করছে। যেসব বাংলাদেশী বাড়ি যাওয়ার পর হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন, তাদের সর্ম্পকে তথ্য পেতে ওইসব ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানার পর সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার ও স্বাস্থ্য বিভাগকে সে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, আমি নিজেও রাত দিন হ্যান্ডমাইক দিয়ে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। অনেক সময়ই তা মানছেন না অনেকেই। যে কারণে তাদের জোরপূর্বক হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে স্বাভাবিক কারণেই পুলিশের কর্মকা- আরও বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পুলিশের স্বল্পতার জন্য সব বাড়িতেই পুলিশ হয়তো সম্ভব হবে না, এজন্য ওইসব বাড়ি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে এক জায়গা থেকে অনেক বাড়ি মনিটরিং করা সম্ভব হবে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, শুধু মানুষের মধ্যে নয়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও করোনাভাইরাস নিয়ে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ সদস্যরা বিদেশ থেকে আসা কোন ব্যক্তির গায়ে হাত দিতে চাচ্ছেন না বা নিরাপত্তার কারণে দিচ্ছেন না। পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য, যদি ওই ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে যে ধরনের পোশাক পরিধান করে একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ধরার নিয়ম, তা তাদের সরবরাহ করা হয়নি। পোশাক না থাকার কারণেও অনেক পুলিশ সদস্য দৌঁড়ে পালিয়ে যাওয়া বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশীর পিছু নিলেও তাকে ধরছেন না। তাকে পুলিশ দিয়ে বা স্থানীয় জনতা দিয়ে ঘেরাও করে আটকানোর পর ভয়ভীতি দেখিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠাতে বাধ্য করছেন। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিদেশ থেকে ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের মধ্যে রীতিমতো দ্বন্দ্ব চলছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান  বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে দেশে আসা বাংলাদেশীর সংখ্যা কমপক্ষে দুই লাখ। যাদের অধিকাংশই বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যার যার গন্তব্যে চলে গেছেন। তাদের নতুন করে শনাক্ত করার কাজ চলছে। তাদের একটি তালিকা তৈরি হয়েছে। সেই তালিকা মোতাবেক কে কোথায় আছে তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। জানার পর পুলিশ স্বাস্থ্য বিভাগকে বিষয়টি অবহিত করছে। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার ভয়ে অনেকেই ঢাকার বিভিন্ন হোটেল বা বাসা বাড়িতে অবস্থান করতে পারেন। কারণ অনেক লোকের বসবাস ঢাকাকে অনেকেই নিরাপদ মনে করছেন। তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সে মোতাবেক অভিযান চালানো হবে।

আরও খবর
Loading...