কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে বেবিচক

Bebicokএভিয়েশন নিউজ: কর্মকর্তাদের দুর্নিতিতে ছেয়ে গেছে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ (সিএএসবি) বা বাংলাদেশ বেসমরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সকল কার্যক্রমের জন্য উৎকোচ গ্রহন প্রতিষ্ঠানটির জন্য সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট নিয়োগে। অথচ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অবৈধ কার্যকলাপ তদারকির জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করার নজীর তৈরি হয়েছে সংস্থাটিতে।

অপকর্ম ও দুর্নীতির কারণে গত ২০১২ বেবিচকের চেয়াম্যানকে বদলিও করা হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সে বদলি বাতিল করা হয়। ভুক্তভোগী প্রাইভেট এয়ারলাইনস কোম্পনির পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেবিচক থেকে এসব ব্যক্তির অপসারণের পাশাপাশি সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার দাবি উঠেছে এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে।

যে কোনো দেশের বিমান বন্দর হচ্ছে সেদেশের একটি সুসজ্জিত ড্রইং রুমের মতে। আর বিমান বন্দরের সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের এয়ারপোর্ট অথরিটির। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হচ্ছে বাংলাদেশের ড্রইং রুম এর মতো। আর বাংলাদেশের সকল প্রইভেট এয়ারলাইন্সের রেগুলেটরি কমিশনের দায়িত্বে আছে বেবিচক। বেবিচকের সকল নিয়ম কানুন প্রাইভেট এয়ারলাইন্স বান্ধব হবার কথা থাকলে বাস্তবে তার কার্যক্রম ভিন্ন। রেগুলেটরি কমিশনের বেশ ক’জন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার অসহযোগিতার ফলে প্রাাইভেট এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের পরিবর্তে ব্যবসা প্রতিকূল অবস্থা বিরাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বেবিচকের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন ও পরিচালক ফ্লাইট সেফটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম নাজমুল আনাম। এ দুই ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রাইভেট এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি বেবিচক থেকে এসব ব্যক্তির অপসারণ দাবি করেছে এসব ভুক্তভোগী এয়ারলাইন্স কোম্পানি।

জানা যায়, অপকর্ম ও দুর্নীতির দায়ে গত ২০১২ সালের জুলাই মাসে মাহমুদ হোসেন ও বিমান মন্ত্রনালয়ের সচিব, উপ-পরিচালক আবু সাঈদকে এ বিভাগ হতে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সে বদলি বাতিল করা হয়। তারপর থেকে বেবিচক আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রাইভেট এয়ারলাইন্সকে অপদস্ত ও হয়রানি করা এবং পরোক্ষভাবে ধ্বংস করে বিদেশী এয়ারলাইন্সকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদানে পরিচালক ফ্লাইট সেফটির সহযোগী হিসেবে শফিউল আজম, প্রনয় কুমার বিশ্বাস এবং আবু সাঈদ একযোগে কাজ করছে।

উৎকোচ নিয়ে লাইসেন্স প্রদান, পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র বিক্রির মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ টাকা গ্রহন কমিশনের কাজের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের দাবি, কোনো কোনো এয়ারলাইন্স প্রকৌশলগত জনবলের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এমন পর্যায়ে রয়েছে যে তারা স্বদেশের বড় বড় এয়ারক্রাফটের মেজর সি-চেক করতে সক্ষম। সি চেকের মাধ্যমে তারা ইতিমধ্যে লাখ লাখ ডলার অপচয় রোধ করতে সক্ষম হয়েছে।

যে কোনো ফ্লাইট উঠা-নামা, পার্কিং, রানওয়ে থেকে বোর্ডিং ব্রিজে যাওয়া, ইঞ্জিন মেরামত, ফিটনেস সার্টিফিকেট, এয়ারওয়ার্দিনেস সার্টিফিকেট দেয়া থেকে শুরু করে পাইলট, কেবিন ক্রুদের ফ্লাইট পরিচালনার প্রতিটি ঘাটে ঘাটে বেবিচককে ধার ধারতে হয়। বেবিচকের প্রতিটি শীর্ষ পর্যায়ে বেসামরিক কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব না থাকায় ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরকে ক্যাটাগরি-২ করে রাখার কথা স্বীকার করেছে। তারা বলেছে, রেগুলেটরি কমিশনে বেসামরিক কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব না আসা পর্যন্ত তাদের ক্যাটাগরি-১ করা হবে না।

বর্তমানে বেবিচকের প্রতিটি বিভাগেরই প্রধান হিসেবে আছেন, বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। এছাড়া ২-৩ লাখ টাকা করে বেতন দিয়ে অর্ধ শতাধিক কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে যাদের অধিকাংশই অবসরপ্রাপ্ত। এসব নিয়োগে কোনো ধরনের নিয়মনীতি মানা হয়নি। অযোগ্য, অদক্ষ এবং বিমান চলাচলে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা নেই এরকম কনসালট্যান্টদের সংখ্যাই বেশি বেবিচকে। কোনো ধরনের কাজ ছাড়াই এরা মাস শেষে লাখ লাখ টাকা বেতন নিয়ে যাচ্ছেন। আর যারা সত্যিকার অর্র্থে কাজ করছেন তারা পড়ে আছেন অনাদরে, অবহেলায়।

সম্প্রতি বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন ও ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেটর পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম নাজমুল আনামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠিয়েছে খোদ আইকাও। অভিযোগ রয়েছে- এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তা নিজেদের অধীনে নিজেরা পরীক্ষা দিয়ে কমার্শিয়াল উড়োজাহাজ চালনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শীর্ষ ক্ষমতায় বসে নিজেদের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। তাদের বক্তব্য- বাংলাদেশ কেন গোটা বিশ্বে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। আইকাও’র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অধীনে কোনো দেশের বিমানবন্দর অপারেশন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন ও ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেটরী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন নাজমুল আনাম স্ব স্ব ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সম্প্রতি কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে লাইসেন্স (সিপিএল) পেতে লিখিত পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এরাই আবার নিজদের স্বাক্ষরে নিজদের ফলাফল প্রকাশ করেন।

জানা গেছে, দেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের বিষয় দেখার একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি। যে ব্যক্তি বা যারা নিয়ন্ত্রক তারাই আবার পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স নেয়ার ঘটনায় বেবিচক ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। বিমানবাহিনীর সাবেক একজন প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে তারা পেশাগতভাবেই দক্ষ বৈমানিক। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে কমার্শিয়াল পাইলটের লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দেয়া এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এই পরীক্ষাকে কোনোভাবেই বৈধ পন্থার পরীক্ষা বলা যাবে না।

জানা গেছে, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা, বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্স জিএমজি এয়ারলাইন্স থেকে ১৫০ কোটি টাকা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্স এ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স, এয়ার পারাবাত, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা এয়ারওয়েজসহ ফ্লাইট অপারোশন বন্ধ করা অনেক বিদেশী এয়ারলাইন্স এর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা পাবে বেবিচক। সেই সব এয়ারলাইন্স আদৌ পাওনা পরিশোধ করবে কিনা সন্দিহান। কিন্তু ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ দৃঢ় চিত্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার পরও এওসি নবায়ন করতে কালক্ষেপন করেছে বেবিচক। এতে কে লাভবান হবে ? সরকার, বেবিচক না যাত্রী সাধারণ।

বিভিন্ন সূত্রে মতে জানা গেছে খুব শীঘ্রই আরো একটি প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের আতœপ্রকাশ হতে যাচ্ছে। আর সেই এয়ারলাইন্সকে ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদান করার জন্যই বেবিচকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধা গ্রহন করে সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আরো একটি প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের প্রদান করতে কালক্ষেপন করছে সেটাও আর্থিক কারণে।

প্রত্যেকটি দেশের এয়ারপোর্ট অথরিটি তাদের নিজ দেশের এয়ারলাইন্সকে ব্যবসায় পরিচালনা করার জন্য বিভিন্নভাবে ভূর্তকি প্রদান করে থাকে। অনেক সময় নিজ দেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশের বেসরকারী এয়ারলাইন্সকে ব্যবসাবান্ধব করার নিমিত্তে বিভিন্নধরনের ভূর্তকি প্রদান করে থাকে। অথচ বাংলাদেশে এয়ারপোর্ট অথরিটি নূন্যতম কোন ধরনের ভূর্তকি প্রদান দূরে থাক সম্ভব হলে দেশীয় এয়ারলাইন্সকে বিদেশী এয়ারলাইন্সের থেকে বেশী চার্জ প্রদান করতেও দ্বিধা করে না।

বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটি দেশীয় এয়ারলাইন্স থেকেও যেকোন ধরনের এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল ফি নির্ধারন করে থাকে ইউ এস ডলারে। যা সত্যিই প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের জন্য ব্যবসাবান্ধব নয়। একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের মতে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে স্বদেশের এয়ারলাইন্সের ৮০ সিটের নিচের এয়ারক্রাফটের জন্য কোন ধরনের ল্যান্ডিং ফি নেই।

আবার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে নতুন কোন বেসরকারী বিমানসংস্থা সে দেশে বিমান পরিচালনা করলে প্রাথমিকভাবে প্রায় পাচ বছর পর্যন্ত কোন ধরনের ল্যান্ডিং ফি প্রদান করতে হয় না। অথচ বাংলাদেশে একটি বাংলাদেশী রেজিস্টার্ড ২৫০-২৮০ সিটের একটি এয়ারবাসের প্রতিবার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শেষে বাংলাদেশের কোন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করলে প্রায় এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার টাকার সমপরিমান বিল প্রদান করতে হয়। এই হিসাব একটি প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের অগ্রযাত্রার পথে চরম অন্তরায় বলে মনে করেন তারা।

আরও খবর
Loading...