কাস্টমসের স্বর্ণ উদ্ধারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উড়োজাহাজ

স্বর্ণ, জাল বৈদেশিক মুদ্রাসহ চোরাচালান পণ্য আমদানি রোধে কাজ করছে কাস্টমস। এছাড়া কাস্টমস ক্ষতিকর ও নকল পণ্য প্রবেশ রোধেও কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে উড়োজাহাজে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়েছে। কাস্টমস তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি উড়োজাহাজ তল্লাশি করে বড় অঙ্কের স্বর্ণ আটক করে। এ নিয়ে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে কাস্টমস।

যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান থেকে স্বর্ণ উদ্ধারে গিয়ে বিমানের যন্ত্রাংশের ক্ষতি এবং একজন বিমানকর্মীকে মারধর করার অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বিষয়ে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সচিবকে। বিমান সচিব ব্যবস্থা নিতে এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছেন। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেন ২৯ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি বিমানের কিছু ফ্লাইট ঢাকা শাহজালাল এবং চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর অবৈধ স্বর্ণ উদ্ধারে কাস্টমস উড়োজাহাজে তল্লাশি চালায়। উদ্ধার অভিযান চলার সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা উড়োজাহাজের টয়লেটের সাইড ওয়াল প্যানেল, প্যাসেঞ্জার সিটের যন্ত্রাংশ, কেবিন সাইড ওয়াল প্যানেল খোলার জন্য বিমানের প্রকৌশল বিভাগের কর্মচারীদের সহায়তা করার অনুরোধ করে থাকেন। যে অংশ খোলার অনুরোধ করা হয়, সে অংশ খোলার জন্য উপস্থিত বিমানের কর্মচারীর যোগ্যতা না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ডিউটিতে না থাকলে কোনো কোনো সময় সংশ্লিষ্ট কাউকে ঘটনাস্থলে পাঠাতে বিলম্ব হয়। সেক্ষেত্রে কাস্টমস কর্মকর্তারা নিজেরাই এককভাবে বিভিন্ন অংশ খোলার উদ্যোগ নেন। যার ফলে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায়ই দেখা যায়, অভিযান চালাকালে কাস্টমস কর্মকর্তারা উপস্থিত বিমানকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এর ফলে কর্মীরা অভিযান চলাকালে উড়োজাহাজে যেতে অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে।

চিঠিতে কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে গত ১৫ জানুয়ারি ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০, উড়োজাহাজ বিজি-০৮৫ সিঙ্গাপুর থেকে রাত ৭টা ৩৫ মিনিটে ঢাকায় অবতরণ করে। অবতরণের পরপরই রাত ৮টার দিকে কাস্টমস কর্মকর্তারা উড়োজাহাজকে নিজ জিম্মায় নিয়ে অবৈধ স্বর্ণ উদ্ধারে তল্লাশি শুরু করেন। তল্লাশির সময় উড়োজাহাজের বিজনেস ক্লাসের বেশ কয়েকটি আসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উড়োজাহাজটি আন-শিডিউল গ্রাউন্ডেড করতে হয়।

১০ জানুয়ারির ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণনায় বলা হয়, বিজি ০৮৯ সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় অবতরণ করে। স্বর্ণ উদ্ধারে কাস্টমস কর্মকর্তারা তল্লাশি চালায়। কাস্টমস কর্মকর্তারা উড়োজাহাজের টয়লেটের সাইড ওয়াল প্যানেল খোলার জন্য বিমান প্রকৌশল বিভাগের কাছে সহযোগিতা চান। এ বিভাগ থেকে এয়ারক্রাফট মেকানিক মনোয়ার রশিদকে সহযোগিতার জন্য পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে গেলে কাস্টমস কর্মকর্তারা তাকে পদবি জিজ্ঞাসা করেন। বলেন, অবৈধ স্বর্ণ কোথায় রেখেছে। জানি না বলার পরপরই কাস্টমস কর্মকর্তারা মেকানিককে হাতের লাইট দিয়ে মারতে থাকে। পরে একটি কক্ষে নিয়ে জুতা খুলে বেধড়ক মারধর করেন। এ নিয়ে ওই মেকানিক বিচার চেয়ে বিমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর চিঠি দেয়।

১৯ জানুয়ারি ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, বিজি-১৪৮ সকাল ৮টা ২১ মিনিটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। অবতরণের পরপরই কাস্টমস কর্মকর্তারা স্বর্ণ উদ্ধারে উপস্থিত হন। বিমানের দরজা খোলার পর কাস্টমস কর্মকর্তারা কেবিন ক্রুদের ঘোষণা দিতে বলেন, যাতে যাত্রীরা পাসপোর্ট হাতে বিমান থেকে বের হন। যাত্রীরা ঘোষণা অনুযায়ী নেমে আসেন। কর্মকর্তাদের সন্দেহ অনুযায়ী, ১৬-১৭ জন যাত্রীকে তল্লাশির জন্য আলাদা করা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তারা বোর্ডিং ব্রিজের যাত্রীদের তল্লাশির সময় ভেতরে একটি ব্যাগ পান, যা কর্মকর্তারা বিমানের ভেতরে নিয়ে যান এবং তা থেকে ৫২টি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তারা বিমানের ভেতরে তল্লাশি চালান। তারা বিমানের বেশ কিছু সিট কুশন খুলে ফেলেন এবং বিমানের সিটের নিচে সংযুক্ত পাউচের ভেতর থেকে অনেকগুলো লাইফ ভেস্ট বের করে আনেন। লাইফ ভেস্টগুলো ভ্যাকুয়ম পাউচে থাকে। এর মধ্যে তিনটি লাইফ ভেস্ট ভ্যাকুয়ম পাউচ খুলে ফেলা হয়, যা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়। পরে তা প্রতিস্থাপন করতে হয়।

আরও বলা হয়, কর্মকর্তারা বিমানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্যানেল ও টয়লেট অ্যাসেম্বলি খুলতে বলেন। তবে চট্টগ্রামে উপযুক্ত জনবল ও টুলস না থাকায় পরিচালক একজন প্রকৌশলীসহ চট্টগ্রামে যান। পরে বিমানের আটটি টয়লেট খুলে তল্লাশি করে কিছু পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার ফলে বিমানের স্বাভাবিক ফ্লাইট সময়সূচি রক্ষা করা যায়নি। তল্লাশির সময় উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মেরামত করার জন্য উড়োজাহাজ আন-শিডিউল গ্রাউন্ডেড থাকায় অপারেশনাল কস্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি রোধে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের উপস্থিতিতে যন্ত্রাংশ খোলার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।

বিমান সচিব এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ১১ ফেব্রুয়ারি এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। যাতে বলা হয়, তল্লাশির সময় প্রকৌশলী ছাড়াই উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ খোলা হয়। এতে উড়োজাহাজের ক্ষতি হয়। অনেক সময় তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। একজন বিমানকর্মীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের এমন আচরণ অনাকাক্সিক্ষত। বিমানে তল্লাশি করতে চাইলে প্রকৌশল বিভাগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে। কোনো অবস্থায় কাস্টমস কর্মকর্তারা যন্ত্রাংশ নিয়ে টানাটানি করে বা খুলে নষ্ট করতে পারবে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তার দায়িত্ব কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে। এসব অযাচিত ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়।

আরও খবর
Loading...