গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজের বহরে বাজি ধরছেন রিসাইকেল ব্যবসায়ীরা

কভিড ১৯ এর কারণে ব্যবসায় মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অধিকাংশ বিমান পরিবহন সংস্থা। এয়ারলাইনসগুলো পুরো না হলেও তাদের উড়োজাহাজ বহরের একটি বড় অংশ গ্রাউন্ডেড রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এসব উড়োজাহাজ ফের আকাশে ফিরতে পারবে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। কারণ এরই মধ্যে গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজ অবসরে পাঠাচ্ছে বহু এয়ারলাইনস। আর এ অবস্থায় উড়োজাহাজ ভাঙা শিল্পের কার্যক্রমে প্রত্যাশিত প্রতিক্ষেপের প্রাথমিক লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। খবর রয়টার্স।

বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে এয়ারলাইনসগুলো তাদের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ যতটা সম্ভব হ্রাস করতে চাইছে। ফলে তারা নতুনের বদলে ঝুঁকছে পুরনো ব্যবহারোপযোগী যন্ত্রাংশের দিকে। বিমান পরিবহন সংস্থার এ প্রবণতায় গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজে ব্যবসার দারুণ সুযোগ দেখছে ব্যবহূত উড়োজাহাজের অংশ ও যন্ত্রাংশ বিক্রিকারী রিসাইকেল কোম্পানিগুলো। তবে হঠাত্ করেই ব্যবহূত যন্ত্রাংশের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে বার্ষিক ৩০০ কোটি ডলারের এ খাতে দরপতনেরও যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অ্যারোস্পেস কোম্পানি জিএ টেলেসিসের প্রধানকে পাঁচটি বিমান পরিবহন সংস্থার উড়োজাহাজ ভাঙার প্রস্তাবের বিষয়ে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজ ক্রয়ের জন্য দরকষাকষি করছে কানাডার অ্যারোসাইকেল।

এর মধ্য দিয়ে কোম্পানিটি প্রথমাবারের মতো উড়োজাহাজ ভাঙার পাশাপাশি যন্ত্রাংশ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজের দিকে সতর্ক নজর রাখছেন ব্যবহূত যন্ত্রাংশের বাজারের ব্যবসায়ীরা। কারণ পরামর্শক সংস্থা অলিভার ওয়াইম্যানের এক প্রতিবেদন বলছে, এয়ারলাইনসগুলোর খরচ কমানোর নীতি এ ধরনের যন্ত্রাংশের চাহিদায় রীতিমতো সুনামি সৃষ্টি করবে।

তবে পরিচয় না প্রকাশের শর্তে এ শিল্প খাতের এক কার্যনির্বাহী জানান, তিনি বর্তমানে যন্ত্রাংশ ক্রয় করা থেকে বিরত থাকছেন। কারণ খুব বেশি উড়োজাহাজ ভাঙা হলে যন্ত্রাংশের দরপতন ঘটতে পারে। তিনি বলেন, আমার ধারণা ব্যবহূত যন্ত্রাংশে আমরা খুব দ্রুত দরপতন দেখতে যাচ্ছি।

ডেটা ফার্ম সিরিয়ামের দেয়া উপাত্ত অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৩ সাল নাগাদ প্রতি বছর যন্ত্রাংশের জন্য এক হাজার উড়োজাহাজ ভাঙা হতে পারে। অথচ ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি বছর এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে ৫০০।

এদিকে নাভেও বলছে, বর্তমানে বিশ্বের মোট যাত্রীবাহী ও কার্গো উড়োজাহাজের ৬০ শতাংশের মাধ্যমে ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২০ সালে অবসর যাবে কিংবা আর ফ্লাইট পরিচালনা করবে না এমন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে দুই হাজারের মতো।

২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৮০। এ বিষয়ে নাভেওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড ব্রাউন বলেন, সব গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজ যে এখনই ভাঙা হবে তা নয়। এক্ষেত্রে অনেক এয়ারলাইনস বাজারের পরিস্থিতির উন্নয়নের আশায় অপেক্ষা করবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক এয়ার স্যালভেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা প্রতি বছর সাধারণত ৪০ থেকে ৫০টির মতো উড়োজাহাজ ভেঙে থাকে। কিন্তু এ বছর তারা অনেক বেশি উড়োজাহাজ পার্ক করে রেখেছে।

তবে এখন পর্যন্ত এগুলোর যন্ত্রাংশের জন্য তারা কোনো ক্রেতা পায়নি। তবে কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা মার্ক গ্রেগরি আশা করছেন, এসব উড়োজাহাজের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হবে। মূলত এয়ারলাইনসগুলো তাদের অপেক্ষাকৃত নতুন উড়োজাহাজের জন্য টেকসই পুরনো যন্ত্রাংশ খুঁজে থাকে। এর মধ্য দিয়ে তারা অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উড়োজাহাজগুলো আকাশে রাখতে সক্ষম হয়।

বৈশ্বিক মহামারীর কারণে ২০২০ সালে উড়োজাহাজের যাত্রী সংখ্যায় প্রায় ৫৫ শতাংশ পতন হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ফলে পুরনো অনেক উড়োজাহাজ একটু আগেভাগেই অবসরে পাঠানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বোয়িংয়ের ৭৪৭ মডেলের উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড করেছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, যেগুলোর বেশ কয়েকটি এয়ার স্যালভেজে পাঠানো হয়েছে।

তবে সমস্যা হলো করোনা পরিস্থিতিতে বর্তমানে টুইন-আইল বা বড় পরিসরের উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিকভাবে কম উড্ডয়ন করছে। ফলে এগুলোর জন্য যন্ত্রাংশের চাহিদা এখন খুব একটা নেই। এ অবস্থায় সিঙ্গল-আইল বা সংকীর্ণ পরিসরের উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ খুঁজছে এয়ারলাইনসগুলো। কারণ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে সিঙ্গল-আইল উড়োজাহাজই বেশি উড্ডয়ন করছে।

সব মিলিয়ে অ্যারোসাইকেল গ্রাউন্ডেড উড়োজাহাজে ব্যবসার সুযোগ দেখছে। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকতা রন হাবার জানিয়েছেন, তারা চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একজন ব্যবসা উন্নয়ন নির্বাহীও নিয়োগ দিয়েছেন। তার মতে, তারা হিসাব কষেই এ ঝুঁকি নিচ্ছেন। কারণ কোন ধরনের উড়োজাহাজ আকাশে ফিরে আসবে এবং কোনগুলোর এখনো উচ্চ চাহিদা রয়েছে, তারা তা জানেন।

সুত্র- বণিকবার্তা

আরও খবর
Loading...