ঝুঁকি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা শাহজালাল বিমানবন্দরে

ঝুঁকি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা শাহজালাল বিমানবন্দরে।

চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস গতকাল রবিবার দুপুর ২টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং বে-তে এসে থামে। চীনফেরত যাত্রীরা সেখান থেকে বাসে করে নিচতলায় ২১ নম্বর গেট দিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন। এরপর থার্মাল স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে একে একে বের হয়ে তাঁরা হেলথ ডেস্কে জমা দেন ‘হেলথ ডিক্লারেশন ফর্ম’।

ওদিকে দায়িত্বরত চিকিৎসকের সতর্ক দৃষ্টি সব যাত্রীর দিকে। কাউকে দেখে সন্দেহ হলেই হ্যান্ডহেল ইনফ্রারেড থার্মোমিটার কপালের কাছে ধরে শরীরের তাপমাত্রা নিশ্চিত হচ্ছেন। এরপর যাত্রীরা হেলথ ডিক্লারেশন ফর্মে ‘ওকে চেক’ সিল মেরে ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেরিয়ে আসছেন।

আর হেলথ ডিক্লারেশন ফরম ও শরীরের তাপমাত্রাসহ অন্যান্য লক্ষণ দেখে কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদসহ প্রয়োজনীয় আরো কিছু পর্যালোচনার পর সমস্যা পেলে অ্যাম্বুল্যান্সে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাজধানীর নির্ধারিত হাসপাতালে।

এভাবেই চীন থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, দুপর ২টায় চায়না ইস্টার্ন, রাত সাড়ে ১০টায় ড্রাগন এয়ার এবং রাত ১২টায় চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসে আগত যাত্রীদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। চীন থেকে প্রতিদিন ছয়টি ফ্লাইটে ৭০০ জন যাত্রী বাংলাদেশ প্রবেশ করছে। এসব ফ্লাইটের পাশাপাশি অন্য ফ্লাইটের যাত্রীদেরও হেলথ ডিক্লারেশন ফর্ম এবং থার্মাল ডিটেকটর স্ক্যানার দিয়ে আসতে হচ্ছে।

প্রতিদিন শাহজালালে পরিচালিত ২৩০টি ফ্লাইটে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। গতকাল সরেজমিনে দেখা গেল, চীনফেরত যাত্রীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিচ্ছিলেন বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের কর্মী শাহানা বেগম। থার্মাল স্ক্যানার থেকে বের হওয়া যাত্রীদের প্রত্যেকের হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিচ্ছিলেন তিনি।

কথা হলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল-আহসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা চীন থেকে সরাসরি আসা ফ্লাইটগুলোকে বোর্ডিং ব্রিজে রাখছি না। এগুলো রিমোট বে-তে (বে-১৫) রাখা হচ্ছে। যাত্রীদের কারো থার্মাল স্ক্যানারে কিছু সন্দেহজনক পাওয়া গেলে কর্তব্যরত ডাক্তাররা আবার থার্মোমিটার দিয়েও পরীক্ষা করছেন। এ ছাড়া বিমানবন্দরে কর্মরতরা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের পাশাপাশি মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস পরছেন। একই সঙ্গে এয়ারলাইনসগুলোর ক্রুসহ অন্য কর্মীরাও মাস্ক ও গ্লাভস পরছেন। যেখানে নিজেরা ঝুঁকিতে সেখানে দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই।’

তৌহিদ-উল-আহসান বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত আমরা চীনফেরত সাড়ে সাত হাজার যাত্রীকে স্ক্যান করেছি। এর মধ্যে ১৮ জনকে কোয়ারেন্টাইনের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

চীনফেরত এয়ারলাইনসগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন সিকদার মেজবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কেবিন ক্রুরা সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। তারা যতবার কেবিনে যাচ্ছে আমরা তাদের মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস পরতে বলেছি। হ্যান্ডওয়াশের জন্য স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে। তাদের অ্যাপ্রনের পাশাপাশি ইউনিফর্মগুলো ওয়াশ করে দিচ্ছি, তা বাসায় নিতে দিচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের গুয়াংজু ফ্লাইটে হ্যাঙ্গার সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে। আমাদের চীনফেরত সব এয়ারলাইনসের জন্য বে-১৫-তে যাত্রী নামাতে বলা হয়েছে। সব নিয়ম-কানুন মেনে আমাদের সহকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাবে। সরকার না করলে আমরা চীনের ফ্লাইট বন্ধ করতে চাই না। যদিও আমাদের কিছু লোকসান হচ্ছে, কিন্তু আমরা যেসব যাত্রী দেশে ফিরতে চান তাঁদের শেষ দিন পর্যন্ত সেবা দিয়ে যেতে চাই।’ মেজবাহউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, ‘আমাদের গুয়াংজু ফ্লাইটে যাওয়ার পরিমাণ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং আসার পরিমাণ প্রায় শতভাগ আছে এখনো।’

এদিকে চীনফেরত যাত্রীদের ইমিগ্রেশনের জন্য আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি উড়োজাহাজগুলোকেও বোর্ডিং ব্রিজ পর্যন্ত আনা হচ্ছে না। সব ফ্লাইটেই হেলথ ডিক্লারেশন ফর্ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। এর মধ্যে ১০ হাজার যাত্রী আসে প্রতিদিন। এসব যাত্রী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভাইরাস পর্যবেক্ষণে হিমশিম খেতে হচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এভিয়েশন পাবলিক হেলথ (এপিএইচ) ইন্সপেক্টর ও কনসালট্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুর রউফ মিয়া গতকাল বলেন, ‘আগে লোকবল কম ছিল, পরে ডাক্তার বাড়ানো হয়েছে। আইইডিসিআর কিট টেস্টের উপকরণাদি আনার জন্য চাহিদাপত্র দিয়েছি। এটা এলে দ্রুত ভাইরাস পরীক্ষা করা যাবে। চীনের উদ্ভাবিত এই কিট দিয়ে ২০ সেকেন্ডেই পুরো বিষয় সম্পর্কে জানতে পারা যাবে। যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে যুক্তদের বেশি সতর্ক রাখা হয়েছে। লাগেজ থেকে কোনো ভাইরাস ছড়ায় না।

এদিকে আগেই করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে। এতে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে ডাক্তার বাড়িয়ে ১৯ জন করা হয়েছে। দুজন কোয়ারেন্টাইনে থাকায় ১৭ জন তিন শিফটে কাজ করছেন। এখন প্রতি শিফটে তিনজন করে ডাক্তার থাকছেন বলে জানা গেছে।

আরও খবর
Loading...