দায়মুক্তি না থাকলে কুয়েতে রাষ্ট্রদূতকেও আটক করা হতো-টিআইবি সেমিনার

কুয়েত ট্রান্সপারেন্সি সোসাইটির (কেটিএস) চেয়ারপারসন মাজিদ আল মুতাইরি বলেছেন, অর্থ ও মানবপাচারের ঘটনায় কুয়েতে বাংলাদেশি সংসদ সদস্য গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে।

কিন্তু কূটনৈতিক দায়মুক্তি না থাকলে কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতও আটক হতো। অর্থ ও মানবপাচার নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং কেটিএসের ভার্চুয়াল সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মানব ও অর্থপাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় অভিজ্ঞতা ও তথ্যবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং সচেতনতা তৈরিতে নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য। নির্ধারিত ক্ষেত্রগুলোতে জনসচেতনতা বাড়াতে সহায়তার পাশাপাশি অপরাধ মোকাবেলায় ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মতামত দেয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় নাগরিক সমাজ কার্যকর অবদান রাখতে পারে।

সেমিনারে অতিথি ছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) চেয়ারপারসন ডেলিয়া ফ্যারাইরা রোবিও। এছাড়াও আলোচনায় যুক্ত হন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মানসূচক প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব কুয়েতের সাবেক সদস্য ড. হাসসান জোহার, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং কুয়েত ইউনিভার্সটি ল স্কুলের ড. দালাল আল সাইফ।

সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন কেটিএসের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মিস আসরার হায়াত। সূচনা বক্তব্যে টিআই চেয়ারপারসন ডলিয়া ফ্যারাইরা রোবিও দুর্নীতি ও অর্থপাচারের (মানি লন্ডারিং) গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ এবং এ ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় টিআইয়ের নানাবিধ কার্যক্রম ও উদ্যোগ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে অর্থপাচার বন্ধ করতেই হবে। সম্মিলিত ও আন্তঃদেশীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ ধরনের সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন করা সম্ভব।

কেটিএসের চেয়ারপারসন মাজিদ আল মুতাইরি সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল আলোচিত ও প্রচারিত অর্থ ও মানবপাচার, অবৈধ সুবিধা লাভ এবং আত্মসাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কেটিএসের নানা প্রয়াস তুলে ধরেন। কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের অর্থ ও মানবপাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কূটনৈতিক দায়মুক্তি না থাকলে হয়তো কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকেও আটক করা হতো।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় সংসদের প্রায় ৬২ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অধিকমাত্রায় অন্তর্ভুক্তি ইতিবাচক নয়। তিনি বলেন, কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ছাড়াও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের একাধিক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ ও মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্যাসিনো ব্যবসা ও নানা অবৈধপন্থায় অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ আছে।

অর্থ ও মানবপাচারের মতো অপরাধে কুয়েতে একজন বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের আটক হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। ড. জামান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু দুর্নীতিতে জড়িতরা নানা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি অব্যাহত রাখছে। এর মানে হল- দুর্নীতিবাজরা অনেক ক্ষমতাবান।

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অব কুয়েতের সাবেক সদস্য ড. হাসসান জোহার সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে আইন সভার সদস্যদের ভূমিকা বিষয়ে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি অর্থ ও মানবপাচারের ঘটনায় কুয়েতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তদারকি সংস্থাগুলোর এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা পালনে অক্ষমতা এবং দুর্নীতির মামলায় কুয়েতের সংসদ সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্বে নিয়োজিতরা সুস্পষ্টভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, দুর্নীতিও করোনার মতোই এক ধরনের ভাইরাস। উৎস থেকেই এ ভাইরাস নির্মূল করতে না পারলে সাধারণ জনগণও দুর্নীতিতে আক্রান্ত ও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই উৎস থেকেই দুর্নীতি নির্মূলে তৎপর হতে হবে। এজন্য কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না।

বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাই দুর্নীতির ঘটনা এবং তা প্রতিরোধে আন্তঃদেশীয় অভিজ্ঞতা বিনিময় জরুরি। বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে তা খুবই কার্যকরি হতে পারে।

আরও খবর
Loading...