নড়বড়ে মোদির গদি!

নড়বড়ে মোদির গদি!

দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে। আগামী মে মাসকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতি এখন সরগরম। একদিকে বিজেপিবিরোধী নতুন নতুন জোট হচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধীদের লক্ষ্য করে তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ ছুড়ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে শুধু কথায় আটকে থাকতে চাইছেন না গুজরাটের এই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। ভোট বাগাতে সংবিধান অমান্য করতেও পিছপা হচ্ছেন না তিনি!

আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। এর আগে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। হাতছাড়া হয়েছে গোবলয়ের তিন বড় রাজ্য মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও রাজস্থান। অন্যদিকে হাসি ফুটেছে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর মুখে। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই তিনটি রাজ্যেই কংগ্রেসকে গোহারা হারিয়েছিল বিজেপি। পরে ২০১৪ সালে কেন্দ্রেও সরকার গঠন করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ওই হিসাব মাথায় নিলে বলাই যায় যে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বেকায়দায় পড়েছে বিজেপি।

Eprothom Aloকিন্তু ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় বিশ্বাসী নরেন্দ্র মোদি অত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। নির্বাচনের আগ দিয়ে তাই বিভিন্ন ‘লোকপ্রিয়’ সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হয়েছে। তাতে আদালতের আদেশ বা সংবিধান চুলোয় যাক, ক্ষতি নেই! কিছুদিন আগেই মোদি সরকার দরিদ্রদের জন্য নতুন কোটা চালু করে আইন পাস করেছে। শনিবার দেশটির রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাতে সায় দিয়েছেন। ফলে সংবিধান ও সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ অমান্য করেই চালু হয়ে গেছে দরিদ্রদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের আইন। নিন্দুকেরা বলছেন, এই কোটা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বেশি সুবিধা দেবে। আর কে না জানে, উচ্চবর্ণের হিন্দুদেরই তো ভোটব্যাংক হিসেবে মানে বিজেপি!
বিরোধীরা এর মধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন এই বলে যে সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদের শেষে এসে কেন এই আইন? এটি কি আগে পাস করা যেত না? কিন্তু তখন কি আর বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল নাকি! অর্থাৎ তিন রাজ্যে হারার পর আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না মোদি। এবার ঝুলিতে ভোট নিতেই হবে তাঁকে। সুতরাং জগাখিচুড়ি মার্কা হলেও কোটা বাড়াতেই হবে। এ ব্যাপারে ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, নতুন এই আইন পাস করে অসম্ভব এক প্রতিশ্রুতি দিলেন নরেন্দ্র মোদি। গত ১৫ মাসের মধ্যে দেশটিতে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। মোদি বলছেন, নতুন কোটা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাবে। কিন্তু কোটাধারী এই অতিরিক্ত ১০ শতাংশের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি চাকরিই যে নেই। তবে কি পুরোটাই ফাঁকা বুলি?

১০ শতাংশ এই কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য। অর্থাৎ, যাঁরা আগের নিয়মে কোটাভুক্ত নন কিন্তু দরিদ্র, তাঁরাই নতুন কোটায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। ভারতের ইকোনমিক টাইমস জানাচ্ছে, নতুন আইনে ‘অর্থনৈতিক দুর্বলতার’ সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যাঁদের বার্ষিক আয় ৮ লাখ রুপির কম বা পাঁচ একরের কম কৃষিজমি আছে বা পৌরসভা এলাকায় থাকা বাড়ির আয়তন ১ হাজার বর্গফুটের কম, তাঁরাই এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবেন। বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে মানি কন্ট্রোল জানাচ্ছে, এই হিসাবে ৮০ শতাংশের বেশি ভারতীয় কোনো না কোনোভাবে কোটাভুক্ত হয়ে যান। তাহলে কি এই বিপুল জনগোষ্ঠীকেই কোটার আওতায় আনা হবে? আবার এই কোটা শিক্ষাক্ষেত্রের জন্যও প্রযোজ্য। সে ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষাতেও কোটার জন্য শিক্ষার্থী আসন বাড়াতে হবে।
নিন্দুকেরা বলছেন, ভারতের সংবিধানে বলা ছিল কোনো অবস্থাতেই কোটা ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। কিন্তু মোদির নতুন আইনের কারণে, সেটি হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ডেকান হেরাল্ডের মতে, ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এক রায়ে কোটা সংরক্ষণের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তখন আদালত বলেছিলেন, শুধু সামাজিকভাবে অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্যই কোটা সংরক্ষণ করতে হবে, অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসরদের জন্য নয়। কিন্তু নতুন আইনে অর্থনৈতিক অনগ্রসরতাকেই মাপকাঠি হিসেবে নেওয়া হয়েছে। আবার যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আদিবাসী ও দলিতদের জন্য নির্বারিত কোটার শর্তের সমান। অর্থাৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনগ্রসরতাকে একই নিক্তিতে মাপা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের তোষণ করতেই নতুন এই আইন করেছে বিজেপি। গোবলয়ের তিন রাজ্যসহ অন্যান্য রাজ্যের উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সমর্থন আদায় করতেই ১০ শতাংশ কোটা প্রবর্তন করা হয়েছে। যদিও এরই মধ্যে এই আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

এ তো গেল আইনের কথা। ভোটারদের ‘অবাস্তব’ নতুন সুবিধার প্রলোভন দেখানোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানেও নাক গলিয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। সমালোচকেরা বলছেন, বিজেপি সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ করছে। খেলার ‘রেফারি’দের বশে রাখার চেষ্টা করছেন মোদি। গত সপ্তাহের শেষে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সিদ্ধান্তে অপসারিত হয়েছেন তদন্ত সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) প্রধান অলোক ভার্মা। আদালতের রায়ে পদ ফিরে পেয়েছিলেন অলোক। কিন্তু টিকতে পারলেন না ৪৮ ঘণ্টাও। আদালত বলেছিলেন, অলোক ভার্মাকে ছুটিতে পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। এতেই মনে হয় ‘ইগো’তে লেগে যায় প্রধানমন্ত্রী মোদির! আদালত বলেছিলেন, সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিটির (সিভিসি) সুপারিশে অলোককে সরানো যাবে না। তাই নিয়মের মধ্যে থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে অলোককে সরানোর সিদ্ধান্ত হয়।
স্ক্রল ডট ইনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আদালত ফেরানোর পর এভাবে তাড়াহুড়ো করে অলোক ভার্মাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা খুবই বাজে একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। শেষে পদত্যাগই করেছেন অলোক ভার্মা। বিদায় নেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর দিকে অভিযোগের আঙুলও তুলেছেন তিনি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকে আঙুল তুলছেন সিবিআই প্রধান, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছে—এটি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য স্বস্তির হতে পারে না।

একই অবস্থায় কিছুদিন আগে পড়েছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর উরজিত প্যাটেল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মোদির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণেই মেয়াদ শেষের আগেই চাকরি ছেড়েছেন উরজিত। ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে নজিরবিহীন এই পদত্যাগের আসল কারণ হলো, মোদির ‘লোকরঞ্জনবাদী’ অর্থনৈতিক সংস্কারে সায় ছিল না উরজিতের। ঝগড়াঝাঁটিতে না গিয়ে শেষে পদত্যাগই সমাধান খুঁজেছেন তিনি।

সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদির সরকার। রাফাল যুদ্ধবিমান কেনায় উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। বলা হচ্ছে, রাফাল দুর্নীতির বিষয়ে নাকি অলোক ভার্মাও খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। এবার বুঝে নিন, কেন অলোককে সরানো হলো! দুইয়ে দুইয়ে চার কি হচ্ছে? ওদিকে আবার ভারতের কৃষক সমাজও প্রধানমন্ত্রীর ওপর সন্তুষ্ট নয়।
মোদির কপালের ভাঁজ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মায়াবতী-অখিলেশ যাদবের নতুন জোট। এনডিটিভি বলছে, উত্তর প্রদেশে বহুজন সমাজবাদী পার্টি (বিএসপি) ও সমাজবাদী পার্টি জোট বাঁধায় হুমকিতে পড়বে বিজেপি। অথচ কিছুদিন আগেও এই দুই দল একে অপরের শত্রু ছিল। ওদিকে রাহুল গান্ধী জানিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেসও উত্তর প্রদেশের সব আসনে লড়বে। অর্থাৎ রণনীতি স্পষ্ট, বিজেপিকে ঠেকানোই মূল লক্ষ্য।

দিল্লি শাসন করতে হলে ভারতের লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টিতে জিততে হয়। ভারতীয় পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বেশি আইনপ্রণেতা পাঠায় উত্তর প্রদেশ। আর রাজ্যে রাজ্যে এভাবে চলতে থাকলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে অনেক পেছনে থাকবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট।

মে মাসের নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এবারের স্লোগান, ‘আবকি বার ফির মোদি সরকার’। ২০১৪ সালে আবকি বার মোদি সরকার স্লোগান দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়েছিল বিজেপি। এ বছর তাতে ‘ফির’ যোগ হয়েছে। মোদি বলছেন, যে উন্নয়নের স্বপ্ন তিনি আগে দেখিয়েছিলেন, তা পূরণ করতে আরও সময় দরকার। সেই সময় কি তিনি পাবেন? উত্তর জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আর কয়েকটা মাস।

আরও খবর
Loading...