ফের আলোচনায় খালেদা জিয়ার মুক্তি

ফের আলোচনায় খালেদা জিয়ার মুক্তি।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুটি ফের আলোচনায়। এ নিয়ে তার পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে নতুন করে শুরু হয়েছে তৎপরতা। রাজনৈতিক এবং আইনি- এ দুই প্রক্রিয়াই চলছে সমানতালে। বিষয়টি নিয়ে পর্দার আড়ালে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

তবে আপাতত প্যারোল বা সাজা মওকুফের আবেদনে নেতিবাচক মনোভাব খালেদা জিয়ার। তবে সবকিছুই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হতে বলেছেন তিনি। এমন নির্দেশনার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

এরই অংশ হিসেবে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন চেয়ে পুনরায় হাইকোর্টে আবেদন করা হবে। পাশাপাশি পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর অনুমতি চেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য বরাবর আবেদন করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আরও জানা গেছে, আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও সোচ্চার থাকবে দলটি। চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে ইতিমধ্যে ঢাকায় সমাবেশ করেছে বিএনপি। শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদেরও সক্রিয় করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে এই দুই জোট সভা-সমাবেশও করেছে।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা বারবার বলে আসছি, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক হতে হবে। অর্থাৎ সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাকে আটক রাখবে নাকি মুক্তি দেবে। মুক্তির বিষয়টি এখন সরকারের কোর্টে। তিনি বলেন, আমরা তার মুক্তির জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব ধরনের চেষ্টা করছি। এখন জনগণের কাছে যাচ্ছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দেশনেত্রীকে মুক্ত করার চেষ্টা করব। আইনের সব প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করেছি, এখনও করে যাচ্ছি।

কারাবন্দি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন তার পরিবার। যে কোনো মূল্যে কারামুক্ত করে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান তারা। শুধু তাই নয়, দলের বড় একটি অংশ চায়- যে কোনো মূল্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তার পছন্দের চিকিৎসক বা হাসপাতালে চিকিৎসা করানো। এ ক্ষেত্রে প্যারোলে মুক্তি নিয়েও তাদের আপত্তি নেই। তার চিকিৎসার ব্যাপারে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ইতিবাচক। মায়ের চিকিৎসাকেই তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার পরামর্শেই পরিবারের সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন।

তবে বিএনপি নেতাদের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও সরকারের সিগন্যাল ছাড়া কিছুই করবে না। এমন পরিস্থিতিতে আইনি প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে কীভাবে তার জামিন পাওয়া যায় সেই চেষ্টাই চলছে। পর্দার আড়ালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ কয়েক নেতা ও পরিবারের সদস্যদের আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিরও চেষ্টা করছে দলটি। খালেদা জিয়ার মুক্তির অংশ হিসেবে পরিবারের পক্ষ থেকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানিয়ে একটি আবেদন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বরাবর এ আবেদন করেন। এতে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে যে কোনো অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন।

খালেদা জিয়ার পরিবার ব্যয় বহন করবে এবং তাদের দায়িত্বে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়ে এ আবেদন করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড যেন খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারকে সুপারিশ করে। মঙ্গলবার এ আবেদন করার পর তার পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কনক কান্তি বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়ার পরিবারের কাছ থেকে আমরা একটি আবেদন পেয়েছি। আবেদনটি মেডিকেল বোর্ডের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এরপর বোর্ড সদস্যদের সঙ্গে বসে তার চিকিৎসার জন্য কী করা সম্ভব, তা করবেন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে বিদেশে পাঠানোর এখতিয়ার নেই। আমরা তার পরিবারকেও এমন অনুমতি দিতে পারি না। কারণ বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার। একমাত্র আদালত চাইলেই আমরা তার মেডিকেল রিপোর্ট দিতে পারি।

বিএনপি নেতারা মনে করেন, মেডিকেল বোর্ড বিদেশে পাঠানোর জন্য সুপারিশ করলেও খালেদা জিয়ার জামিন প্রয়োজন। এ জন্য পুনরায় আদালতে তার জামিন আবেদন করা হবে। জামিন আবেদনে আদালত যাতে পুনরায় তার মেডিকেল রিপোর্ট দেখতে চান, সেই বিষয়টি আবেদনও থাকবে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হলে মেডিকেল বোর্ড তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করতে পারে। বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়টির ওপরই জোর দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। আদালত চাইলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে পারেন। এরপর তিনি দেশে না বিদেশে চিকিৎসা নেবেন, সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু আদালত তাকে জামিন দেননি। তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা আবারও আদালতে জামিন চাইব। সিনিয়র আইনজীবীরা কয়েকদিনের মধ্যে বসে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিএনপি ও চেয়ারপারসনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্যারোলে বা সাজা মওকুফের আবেদন করতে এখনও সম্মতি দেননি খালেদা জিয়া। আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই জোর দিয়েছেন তিনি। দলের বেশিরভাগ নেতাও প্যারোল বা ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে নয়।

তারা মনে করেন, প্যারোলে মুক্তি দেয়া মানে সরকারের সঙ্গে আপস করা। আর শাস্তি মওকুফের আবেদন করাও একই। দুর্নীতি করেছেন এমন দোষ স্বীকার করেই সাজা মওকুফের আবেদন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত যে কোনো একটি আবেদন করা হলে তা খালেদা জিয়া বা বিএনপির রাজনীতির জন্য বড় ধরনের নৈতিক পরাজয় হবে। দীর্ঘদিন ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পাওয়া খালেদা জিয়া ভাবমূর্তি সংকটে পড়বেন। তাছাড়া প্যারোলে মুক্তি চাইলে নানা শর্তও জুড়ে দেয়া হতে পারে।

জিয়া অরফানেজ এবং চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুটি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া ১৭ বছরের সাজা নিয়ে জেল খাটার দু’বছর পুরো হয়েছে গত ৮ ফেব্রুয়ারি। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আরও খবর
Loading...