বিমানের আয় কমে বাড়ছে ব্যয়: লোকসান কাটাতে ১৫ সুপারিশ

Biman-Bangladesh-Bhabanএভিয়েশন নিউজ: ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ১৯৭৭ সালে করা হয় করপোরেশন। লাভজনক করার জন্য করপোরেশনেও স্থায়ী হয়নি সংস্থাটি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু আয়ের বদলে ব্যয় বাড়ানোই বিমানের প্রচলিত রেওয়াজ। অন্য এয়ারলাইনসে বিএফসিসির খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আয়ের খাতগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

ফলে দেনার পরিমাণ দিন-দিন বাড়ছে সংস্থাটির। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে সুদজনিত ব্যয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই সুদজনিত ব্যয় ও কর পরিশোধ না করেই বিমানের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৩২ কোটি টাকা। ক্ষতি কমাতে হলে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় কমাতে বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিমান-সংক্রান্ত কমিটির এক প্রতিবেদনে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কাটাতে আর্থিক বিষয়ে ১৫ দফা সুপারিশ এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানি হলেও বিমানের শেয়ার বাজারে ছাড়া হয়নি। শতভাগ শেয়ারের মালিক সরকার। অথচ একটি লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে সংস্থাটি তার এভিয়েশন বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করতে পারে। আবার এও ঠিক যে, একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত না হলে শেয়ার ছেড়ে আশানুরূপ অর্থ সংগ্রহ সম্ভব হবে না। পর্যালোচনা কমিটি মনে করে, বিমানকে লাভজনক করতে হলে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, পরিচালনা দক্ষতা ও আন্তরিকতা ছাড়াও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যত দ্রুত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা যাবে, তত দ্রুত শেয়ার অফলোড করে আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করা যাবে।

একসময় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, কাতার এয়ারওয়েজ, আফ্রিকিয়া এয়ার, ইতিহাদ এয়ার, টার্কিশ এয়ারওয়েজ, সাউদি অ্যারাবিয়া এয়ারলাইনস বিমানের ক্যাটারিং সেন্টার থেকে খাবার সংগ্রহ করত। শুরুর দিকে এসব খাবারের মান ভালো ছিল। বিমানের নানা অব্যবস্থাপনায় তা খারাপ হয়ে যায়। দেশি ক্রেতাদের মতো বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোও বিএফসিসি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও আফ্রিকিয়া এয়ার বাংলাদেশে ফাইট পরিচালনা করছে না। বর্তমানে ড্রাগন এয়ার, ক্যাথে প্যাসিফিক ও রিজেন্ট এয়ার বিমানের খাবার নিচ্ছে। বিএফসিসি তাদের উৎপাদনক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না। সংস্থাটির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ৮ হাজার ৫০০ মিল। অথচ উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ মিল। বিএফসিসি লাভজনক করার জন্য এর উৎপাদিত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির সুপারিশ এসেছে।

জানা গেছে, কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর জনবলের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর যে প্রক্রিয়া গ্রহণ করা উচিত ছিল তা করা হয়নি। কোম্পানি গঠনের সময় সরকারের নির্দেশনা ছিল বিমানের অনুমোদিত জনবল ৬ হাজার ৮৮৩ থেকে ৩ হাজার ৪০০ জনে নামিয়ে আনা। কিন্তু বিমানের জনবল এখনও ৪ হাজার ৪৫১ জন। প্রায় ১ হাজার বা ২৫ শতাংশ জনবল বেশি। এটা বিমানের ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ।

বিমানের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মূল বেতনের ১৭২ শতাংশ ভাতা হিসেবে খরচ হয়। ৪০ শতাংশ ওভারটাইম হিসেবে খরচ হয়। ব্যক্তিপর্যায়ে সবাই এই ওভারটাইম পান না। আবার ব্যক্তিপর্যায়ে অনেকে মূল বেতনের চেয়ে দ্বিগুণ ওভারটাইম পান। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে মূল বেতন হিসেবে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ২৬ লাখ ১১ হাজার টাকা। তাদের ওভারটাইম পরিশোধ করা হয়েছে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।

লোকসানি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কাটাতে আর্থিক বিষয়ে ১৫ দফা সুপারিশ এসেছে। ঢালাওভাবে জনবল হ্রাস না করে একটি বিস্তারিত সমীক্ষার মাধ্যমে বিমানের জনবল যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ রয়েছে। কর্মকর্তাদের ওভারটাইম ভাতা বন্ধ করতে হবে। বৈদেশিক স্টেশনের জনবল বেশি রয়েছে। কোনও-কোনও স্টেশনে বিমান অফিসের আদৌ প্রয়োজন নেই। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো হ্যান্ডলিং বিমানের কাজ নয়। এসব সেবাধর্মী কাজ ধরে রাখতে হলে সেবার মান বাড়াতে হবে। বিমানের লোকসান কমানোর জন্য এসব হ্যান্ডলিং বিমানকে দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের সেবামুখী আচরণ তৈরির জন্য মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

অযোগ্যতা, অনিয়ম আর দুর্নীতি রোধের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিমানের কেবিন ক্রুর বয়স ও শারীরিক যোগ্যতার মাপকাঠি প্রয়োজনে পুনর্নির্ধারণ করা দরকার। বিমানের চলাচল সচল ও স্বাভাবিক রাখার জন্য ১৯৫৮ সালের এসেনশিয়াল সার্ভিস অর্ডিন্যান্সের আওতায় একে নেওয়া যেতে পারে। প্রকৌশল পরিদপ্তরকে শক্তিশালী করে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ মেরামতের হ্যাঙ্গার-সুবিধা সম্প্রসারণ করা দরকার।

অপেক্ষাকৃত কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লাভজনক রুট চিহ্নিত করে টাইম শিডিউল ঠিক রাখা দরকার। লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয়ের পরিকল্পনা ও কৃচ্ছ্রসাধনের সুপারিশ এসেছে। এ ছাড়া সংস্থাটিকে লাভজনক করার জন্য কৌশল অংশীদারের সুপারিশ করেছে কমিটি।

আমাদের সময়ের সৌজন্যে।

আরও খবর
Loading...