বিমানের বিদেশ স্টেশনে বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্য

Biman-Bangladeshএভিয়েশন নিউজ: বাংলাদেশ বিমানের বৈদেশিক স্টেশনে বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। অভিযোগ, জনবল নিয়োগ নিয়ে ২২ স্টেশনে বছরে দেড়শ কোটি টাকার বেশি ঘুষবাণিজ্য হচ্ছে। স্টেশনভেদে কোনো কোনো দেশে নিয়োগ পেতে কান্ট্রি ও স্টেশন ম্যানেজারকে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে। আর নিয়োগের পর স্টেশন, কান্ট্রি আর ফাইন্যান্স ম্যানেজারকে মাসোহারাও গুনতে হচ্ছে ২০ হাজার থেকে থেকে ১ লাখ টাকা।

যার কারণে ঘুরেফিরে একই কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ পাচ্ছেন বিমানের বৈদেশিক স্টেশনগুলোতে। রেকর্ড আছে ২০ বছরের চাকরি জীবনে কেউ কেউ ৫টি বৈদেশিক স্টেশনে পোস্টিং পেলেও ঘুষ না দিতে পারায় ২৪ বছরেও অনেক মেধাবী কর্মকর্তা একবারও নিয়োগ পাননি। অনেকে পোস্টিং নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্বও নিয়ে নিয়েছেন। বিমানে এরকম দ্বৈত নাগরিক আছেন কমপক্ষে ২০ জন। এদের বেশিরভাগই দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার অনেকে নাগরিকত্ব লাভের জন্য ৩ বছরের জন্য পোস্টিং নিয়ে ১০ বছরের বেশি সময় কর্মরত আছেন।

অভিযোগ আছে, বিমানের একটি শীর্ষ সিন্ডিকেটকে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা মাসোহারা দিয়ে অন্তত ৫০ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন স্টেশনে নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণের বেশি সময় ধরে কর্মরত। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে একাধিকবার দেশে ডেকে পাঠালেও তারা নানা ছল-ছুতোয় ও ঘুষ দিয়ে বদলি আদেশ ঠেকিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া কিছু কিছু স্টেশনে বিমানের ফ্লাইট না থাকলেও মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে সেখানেও জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বসে বসে বৈদেশিক মুদ্রায় বেতন নেয়া ছাড়া এদের আর কোনো কাজ নেই। একবার কোনো স্টেশনে চাকরি করতে পারলে নিয়ম অনুযায়ী এই কর্মকর্তা-কর্মচারী বি ক্যাটাগরি হয়ে যান।

আর বি ক্যাটাগরির কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে অন্য স্টেশনে নিয়োগ পেতে অনেক সময় নেয়ার কথা। কিন্তু বিমানে এই নিয়ম কেউ মানে না। গত কয়েক মাসে বিমানের বৈদেশিক স্টেশনে অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন যাদের বেশিরভাগ বি ক্যাটাগরির। এদের মধ্যে রয়েছেন- মনজুরুল হক, সফিকুল ইসলাম, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মোল্লা জিল্লুর রহমান, রেজাউল ইসলাম, হোসাইন আলমগীর, রফিকুল ইসলাম, মাহফুজুল আলম প্রমুখ।

সম্প্রতি এক পরীক্ষায় বৈদেশিক স্টেশনে পোস্টিং দেয়ার জন্য ৩০ জন কর্মকর্তাকে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু এদের মধ্যে ২৫ জনই ৩/৪টি দেশে আগে চাকরি করে ফেলেছেন। এদের মধ্যে আছেন- মাহফজুল আলম, ইমরুল হাসান নোমান, একেএম তৌফিকুর রহমান, মিজানুর রহমান মিয়া, শহীদুল আলম মিয়া, জোহরা জান্নাত, রেজাউল ইসলাম, এটিএম শামসুজ্জামান, আরিফুজ্জামান খান প্রমুখ। অভিযোগ আছে, কাজী নামে একজন স্টেশন ম্যানেজার দুবাইতে নিয়োগ পেয়ে সেখানে নামে বেনামে ট্রাভেল এজেন্টের ব্যবসা করছেন।

এছাড়া আরেক কর্মকর্তা সিঙ্গাপুরে নিয়োগ নিয়ে ৭/৮ বছর ধরে চাকরি করছেন। এই দুই কর্মকর্তাকে একাধিকবার দেশে ফেরত আনার জন্য চিঠি ইস্যু করা হলেও তারা নানাভাবে ম্যানেজমেন্টকে বশীভূত করে তলবের আদেশ স্থগিত করিয়েছেন। অপরদিকে বিমানের সিবিএ নেতা হলে তো কথাই নেই। সিবিএ থেকে যার নাম দেয়া হবে তাকেই নিয়োগ দিতে হয় সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোয়। এই খাত থেকে সিবিএর শীর্ষ নেতারা বছরে কোটি কোটি টাকা ঘুষবাণিজ্য করছেন।

২০০৬ সালের ৫ আগস্ট থেকে নিউইয়র্ক যাচ্ছে না বিমান। তবু সেখানে একজন স্টেশন ম্যানেজার ও একজন অপারেশনাল ম্যানেজার বহাল রয়েছেন। অথচ গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্যান্স ম্যানেজারের পদটি বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। গত আট বছরে বিমান এদের দেশে ফিরিয়ে আনেনি। বছরে নিউইয়র্ক অফিসের পেছনে বিমানের খরচ হয় ২ থেকে ৩ কোটি টাকা। অথচ আয় বছরে ২০/২৫ লাখ টাকা। একই অবস্থা কানাডার টরন্টোর। সেখানেও বিমানের কোনো ফ্লাইট নেই।

কিন্তু একজন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে আছেন বছর পর বছর। টরন্টো অফিসের পেছনেও বছরে বিমানের ব্যয় প্রায় ১ কোটি টাকা। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে বিমান চলাচল বন্ধ। ওই স্টেশনে সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্টেশনে একজন পিয়ন নিয়োগ পেতেও বিমানের শীর্ষ ম্যানেজমেন্টকে মাসোহারা ছাড়াও এককালীন ৫ লাখ টাকার বেশি ঘুষ দিতে হচ্ছে।

বিদেশে বিমানের ২২টি স্টেশন রয়েছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এসব স্টেশনের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার নানা অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় প্রতিটি বৈদেশিক স্টেশনেই রয়েছে অপ্রয়োজনীয় জনবল। রিপোর্টে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত জনবল চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এসব কর্মকর্তা বৈদেশিক স্টেশনে পোস্টিং নিয়ে এক্সেস ব্যাগেজ থেকে মাসে ১ কোটি টাকা আয় করছে যা বিমানকে দিচ্ছে না। কমিটিতে ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইটি বিশেষজ্ঞ এবং বিমানের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন)। কমিটির সুপারিশ গত মাসে বিমান ব্যবস্থাপনার কাছে পাঠানো হয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে করাচি স্টেশনে আর অপারেশনে যাচ্ছে না বিমান। অথচ করাচিতে ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবস্থান করছেন। বিমানের বাহরাইন স্টেশনের অপারেশন বন্ধ ২০১১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের এ স্টেশনে এখনও রয়েছেন দুই কর্মকর্তা-কর্মচারী। দুবাই স্টেশনে বিমানের জনবল ২০ জন। নেপালের কাঠমান্ডু স্টেশনে জনবল অর্ধেকে নামিয়ে আনা যায়।

রিপোর্টে নেপালের এই স্টেশন থেকে মার্কেটিং বিভাগের একজন জেনারেল ম্যানেজারকে মাসোহারা দেয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বর্তমানে এ স্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৪। কলকাতা স্টেশনের ১৮ জন। ব্যাংকক স্টেশনে আছে ১৬ জন। দিল্লি স্টেশনে পদের সংখ্যা ১৫টি। কুয়ালালামপুরের ১২টি পদের মধ্যে তিনটির কোনো দরকার নেই। এই স্টেশনে প্রতি সপ্তাহে বিমানের সাতটি ফ্লাইট ওঠানামা করে। লন্ডনে বিমানের অনুমোদিত পদ ২৭টি। এই স্টেশনের ১২টি পদ বিলুপ্ত করলেও কোনো সমস্যা নেই। এ ছাড়া রিয়াদের আটটি পদের মধ্যে দুটি এবং সিঙ্গাপুরের ১০টি পদের মধ্যে কমপক্ষে দুটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ রয়েছে। ম্যানচেস্টারে ৬ জন স্টাফ রয়েছেন।

বিমানের অন্য কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ৪২টি এয়ারলাইনস ওঠানামা করে। সেখানে কোনো এয়ারলাইনসের অপারেশন ম্যানেজার নেই। কিন্তু বিমানের রয়েছে। ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে ১৭টি এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করে। শাহজালালেও বিমান ছাড়া কারও অপারেশন ম্যানেজার নেই। ঢাকা-দুবাই রুটে বিমান ঢাকা থেকেই খাবার নিয়ে যায়। কোনো কারণে দুবাই থেকে ফেরার সময় অতিরিক্ত খাবার নিতে হলে এমিরেটস এয়ারলাইনস তা সরবরাহ করে।

অথচ দুবাইতে বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) খাবার সরবরাহ করার জন্য দুজনকে পোস্টিং দিয়ে রেখেছে। বিমান যেসব গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে তার সবকটি স্থানে টিকিট বিক্রি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং তত্ত্বাবধানের জন্য অফিস স্থাপন করেছে। অথচ অনেক এয়ারলাইনস বিদেশে যেসব স্থানে ফ্লাইট পরিচালনা করে সেখানে টিকিট বিক্রির কাজটি জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ তদারকির জন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্ট (জিএইচএ) নিয়োগ করে সম্পন্ন করে।

বিমান বোর্ড চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন জানান, এ ধরনের অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করে সব বৈদেশিক স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিষয়টি ঢেলে সাজানো হবে। কেউ একটি স্টেশনে বারবার নিয়োগ পাবে আবার অন্য কেউ একবারও পাবে না এই বৈষম্য দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এখন থেকে মেধা ও যোগ্যতা বিবেচনা করে পোস্টিং দেয়া হবে।

আরও খবর
Loading...