রিয়াদ-ঢাকা ও সিলেট লন্ডন রুটের টিকেট নিয়ে তুঘলকি কান্ড

সিলেট- লন্ডন ও রিয়াদ রুটে বাংলাদেশ বিমানের স্পেশাল ফ্লাইটের টিকেট নিয়ে চলছে তুঘলকি কান্ড। নির্দিষ্ট দামের চেয়ে বেশি দিয়ে টিকেট বিক্রির মতো ঘটনায় ক্ষুব্দ এজেন্সি ও যাত্রীরা। এরই মধ্যে সিলেট থেকে লন্ডন রুটে টিকেট বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়েছে আটাব। একইভাবে চড়া দামে টিকেট থেকে ঈদের আগে রিয়াদ থেকে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে শত শত যাত্রীকে। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মোকাব্বির হোসেন বলেছেন, সিলেটে যেটা হচ্ছে সেটার জন্য আটাব দায়ী। বেশি বুকিং দিয়ে কম টিকেট কিনে অনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করছিল। আর রিয়াদে টিকেট বিক্রির জন্য বিমান দায়ী নয়। সেটা করে থাকে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস। তারপরও অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে। যাত্রীরা যদি দালালের কাছে প্রতারণার শিকার হয়ে ঠকে তাহলে বিমান দায়ী হয় কিভাবে। তাহলে তো আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাত্রীরা নিজে হাজির না হলে টিকেট দেয়া যাবে না।

অভিযোগ উঠেছে, রিয়াদ থেকে ঢাকায় আসার জন্য ঈদের আগে টিকেট নিয়ে রীতিমতো দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে চড়া দামে টিকেট কাটতে হয়েছে। কেউ দেখার নেই। সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা, বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজারের অফিসের তিন কর্মকর্তার সঙ্গে রিয়াদের একডজন চিহ্নিত দালাল ও ট্রাভেল এজেন্টদের সিন্ডিকেট ঘরমুর্খী প্রবাসী যাত্রীদের কাছ থেকে গলাকাটা দাম নিচ্ছে। রিয়াদ থেকে ঢাকায় আসার ইকোনমি ক্লাসের ১৯০০ শ’ রিয়ালের টিকেট কিনতে হয়েছে অতিরিক্ত আরও ৫শ’ থেকে এক হাজার রিয়াল বেশি দিয়ে। গত রবিবার রিয়াদ থেকে ঢাকায় আসা বিমানের অন্তত এক শ’ যাত্রীর সঙ্গে এই প্রতিনিধির কথা হয়। তারা সবাই একযোগে বিমানবন্দরে রীতিমতো বিমান সম্পর্কে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন- একটি সংঘবদ্ধ চক্র করোনাকালীন স্পেশাল ফ্লাইটের টিকেট নিয়ে প্রকাশ্যেই হরিলুট করছে। বিমান অফিসে গেলে বলা হয়- টিকেট নেই। আবার স্থানীয় ট্রাভেলস অফিসে গেলেই অতিরিক্ত টাকায় মিলছে টিকেট। একমাত্র বিজনেস ক্লাস ও অনলাইন টিকেট ছিল স্বাভাবিক। বাকি সব টিকেট বিক্রি হয়েছে দেড়গুণ দ্বিগুণ দামে। ৪১৯ আসনের ৭৭৭ উড়োজাহাজের সবগুলো আসন পূর্ণ করেই সেদিনের ফ্লাইটটি ঢাকায় আসে। এতে মানা হয়নি ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি। অথচ স্বাস্থ্যবিধির কথা বলে টিকেটের দাম বাড়ান হয়েছে। এভাবে প্রতিটি ফ্লাইট থেকে ৭০/ ৮০ হাজার সৌদি রিয়াল হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র।

এ বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন জানান- করোনাকালীন সিডিউল বন্ধ থাকায় বিমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সহায়তায় স্পেশাল অপারেট করছে। এর নিয়ম হচ্ছে- সৌদি আরব থেকে যারা দেশে ফিরতে চাইবে তারা সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে সিরিয়াল দিয়ে নাম রেজিস্ট্রেশন করবে।
তারপর দূতাবাস সেই তালিকা রিয়াদের বিমান অফিসে পাঠিয়ে দেবে এবং বিমান সেই তালিকা ধরেই শুধু টিকেট ইস্যু করবে।
রিয়াদের দূতাবাসের বেলাল নামের এক কর্মকর্তা বিমানের অফিসে বসেই সেটা ইস্যু করেন।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এই ব্যক্তব্য সম্পর্কে যাত্রীদের অভিযোগ জিএসএ টিকেট বিক্রি করে না। বিক্রি করছে বিমানের আমিন গ্যাং ও বেলাল গ্যাং। এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে প্রবাসী যাত্রীদের কাছে।

একই অভিযোগ করেন রাঙ্গুনিয়ার আবুল কাসেম জানান, তিনিও দালালের মাধ্যমে এই টিকেট কিনেছেন ২৮শ’ রিয়ালে। দালাল না ধরলে টিকেটও পেতেন না। মালেক নামের এক যাত্রী জানান, তিনি একই টিকেট কিনেছেন ৩ হাজার রিয়ালে। আকলিমা নামের এক নারী আল কাশিমের এক দালালের কাছ থেকে কিনেছেন ২৯শ’ রিয়াল দিয়ে। তার শিশু কন্যার টুনিয়া আক্তারের টিকেটও একই রিয়াল দিয়ে কিনতে হয়েছে।

আরিফ নামের একজন জানান, বিমানের স্টাফ নাসের তার শ্যালকের নামে কিংডম ট্রাভেলস এজেন্ট চালু করে ব্যবসা করছে ব্ল্যাক টিকেটের। সে আবার বিমানবন্দরেরর কাউন্টারে বসে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত লাগেজের টাকা আদায় করে। তার মাধ্যমেই আমিন ও সোহেল এবার স্পেশাল ফ্লাইেটের টিকেট বিক্রি করে লাখ লাখ রিয়েল হাতিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে সিলেট লন্ডন রুটে গত ১৩ জুলাইয়ের ফ্লাইটে ঘটেছে আরেক তুঘলকি কান্ড। বিমানের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ফ্লাইটের টিকেট বিক্রি নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব। ছুটির দিনে বৃহস্পতিবার রাতে কয়েক মিনিটের ঘোষণা দিয়ে সিস্টেম চালু করা হয়। রাতে বলা হয় টিকেট রিফান্ড হবে না। সকালে আবার এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলা হয় টিকেট রিফান্ডেবেল। এতে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে এজেন্টদেরকে। আটাব মহাসচিব মাজহারুল এইচ ভূঁইয়া বলেন, বিমান এখন আটাবের রাজনীতিতে হাত ঢুকিয়েছে। এটা আগে কখনও দেখা যায়নি। আটাব নিশ্চিত- পছন্দের ট্রাভেল এজেন্সিকে টিকেট পাইয়ে দেয়ার জন্য বিমানের বিশেষ ফ্লাইটের টিকেট বিক্রির ঘোষণা দেয়া হয় রাত ৮টায়। এ ঘোষণার খবরও সিন্ডিকেটভুক্ত এজেন্সিগুলোকে ফোনের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়। পরদিন আসে আরেক সিদ্ধান্ত। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওকে বিষয়টি জানিয়ে প্রতিকার চেয়েছে ভুক্তভোগী ট্রাভেল এজেন্টরা। তারা বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে থাকা সিলেটের বিমানের ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার শাহনেয়াজ মজুমদারের মতো দুর্নীতিবাজদের অপসারণ চেয়েছেন। এমনকি বিষয়টি সুরাহার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে তারা। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকেরই স্কুল, কলেজ, চাকরি বা ব্যবসায় সমস্যা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকেরই চাকরি চলে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছার জন্য তাদের কাছে বিমানের টিকেট সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এখন টিকেট বিক্রি হচ্ছে। বিমানের বিভিন্ন অফিসে টিকেট সংশ্লিষ্ট কাজে যাত্রীদের দীর্ঘলাইন। এ সুযোগে ঘটছে ব্যাপক অনিয়ম। আটাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাজহারল এইচ ভূঁইয়া বলেন, করোনার কারণে আমরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। তিন মাসেরও বেশি আকাশপথের যাত্রা বন্ধ ছিল। সংগঠনের প্রায় চার হাজার সদস্য জীবিকার সঙ্কটে পড়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হওয়ার পর আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে যাত্রীদের টিকেট বিক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা বিমান কর্তৃপক্ষকে বলে আসছি, সব এজেন্ট যাতে টিকেট বিক্রয় করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে। একটি টিকেট বিক্রয় করতে পারলে সাত ভাগ লাভ হয়। তিনি বলেন, করোনার কারণে বিমানমন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আমরা দেখা করতে পারিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারব বলে আশা করছি। তবে আমরা বিষয়টি সুরাহা করার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়েছি। আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সমাধান করে আমাদের রক্ষা করবেন।

জানা গেছে- গত ১৩ জুলাই ঢাকা থেকে লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটের ঘোষণা দেয়া হয় ২ জুলাই। রাত ৮টায় এ ঘোষণা দিয়ে পরের দিন শুক্রবার দুপুরে টিকেট বিক্রির জিডিএস সিস্টেম ওপেন করার ঘোষণা দেয়া হয়। সিট বুকিংয়ের পর টিকেট ইস্যুর জন্য ২০ মিনিট সময় নির্দিষ্ট করে দেয়ার কথা থাকলেও বিমান তা করেছে ১২ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে টিকেট ইস্যু করতে হবে। ২০ মিনিট সময় নির্দিষ্ট থাকলে ফেক বা ভুয়া বুকিং দেয়ার সুযোগ কমে যেত। ফেক বুকিং দিলেও তা ২০ মিনিট পর বাতিল হয়ে যেত। কিন্তু ১২ ঘণ্টা সময় নির্দিষ্ট করে দেয়াতে পছন্দের এজেন্সিগুলো সুবিধা পেয়েছে। এতে টিকেট বিক্রিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। নানা বাধা পেরিয়ে যেসব সাধারণ এজেন্সি টিকেট বুক করতে পেরেছিল টিকেট ইস্যু করতে গিয়ে দেখে এগুলো নন-চ্যাঞ্জেবল এবং নন-রিফান্ডেবল। এ কারণে সাধারণ এজেন্সিগুলো টিকেট ইস্যু করতে পারেনি বা সিট বাতিল করতে বাধ্য হয়। গত ৯ জুলাই বিষয়টি বিমানের এমডি ও সিইও মোঃ মোকাব্বির হোসেনের নজরে আনে টিকেট বিক্রির সংগঠন ট্রাভেল এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আটাব)। সংগঠনের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিমানের সিলেট অফিসের ডিএমডিসহ আরও দুই কর্মকর্তার পছন্দমতো কিছু এজেন্সিকে টেলিফোনে জানিয়ে দেয়া হয় নন-চ্যাঞ্জেবল এবং নন-রিফান্ডেবল শর্তটি ৫ জুলাই তুলে নেয়া হবে। ঠিকই ৫ জুলাই এক মেলের মাধ্যমে এই শর্ত দুটি প্রত্যাহার করা হয়।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বলেন-এসব অভিযোগ একটাও সত্যি নয়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি।
সিলেটের এজেন্ট সোমা আর লতিফ ৪৮ ও ৬৩টি বুকিং দিয়ে টিকেট কিনেছে মাত্র ৪টি আর ২টি।
এটা তো মেনে নেয়া যায় না। সেজন্য বন্ধ করে দিয়েছি। এভাবে অনৈতিক কাজ করতে দেয়া যাবে না।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ২১ জুন লন্ডন ফ্লাইটের মাধ্যমে বিমানের আন্তর্জাতিক রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালু করা হয়। এ পর্যন্ত লন্ডনে যেসব ফ্লাইট গেছে- তার প্রায় সবটিতেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টিকেট বিক্রি করা হয়েছে। আটাব আরও বলেছে, অর্থের বিনিময়ে সিট হোল্ডিং টিকেটধারীকে সিট বুকিং দেয়া হয়েছে। বিমানের কর্মকর্তারা পছন্দের এজেন্সির টিকেট নিজেরা বুকিং দিয়ে কনফার্ম করেছেন। টিকেটের জন্য যাত্রীরা বিমান অফিসে গেলে তাদের আগামী অক্টোবর মাসের শিডিউল দেয়া হয়। অথচ পরে ফোনে অনেক টাকার বিনিময়ে এ সিট জুলাই মাসেই দেয়া হয়। গত ২১ ও ২৮ জুনের ফ্লাইটে অনেক সিট বিমান অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরা কনফার্ম করে দিয়েছেন। এতে বিমান দুর্নাম কামিয়েছে এবং রাজস্ব হারিয়েছে। তদন্তের জন্য আটাব ৩৩টি সিটের তথ্য বিমানের এমডিকে পাঠিয়েছে। বিমান কর্মকর্তারা নিজেরা এসব সিটের শ্রেণী পরিবর্তন এবং কনফার্ম করেছেন। আটাব বলেছে, এই মুহূর্তে এসব ক্লাসের সিট পাওয়া অকল্পনীয়। এছাড়া বিমান যেসব চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করেছে সেগুলোর রেজিস্ট্রেশন সিরিয়াল সামনে-পেছনে নেয়ার মাধ্যমেও আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। একই স্টেশনে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার কারণে এসব কর্মকর্তা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
দৈনিক জনকণ্ঠ

আরও খবর
Loading...