রিয়াদ-ঢাকা রুটের বিশেষ ফ্লাইটে ‘বিশেষ টাকা’ গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের

করোনা পরিস্থিতিতে শিডিউল ফ্লাইট বন্ধ থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। রিয়াদ-ঢাকা রুটের এ বিশেষ ফ্লাইট নিয়ে যেন চলছে তুঘলকি কাণ্ড। ঢাকাগামী যাত্রীরা রিয়াদের বিমান অফিসে গেলে বলা হচ্ছে, টিকিট নেই। তবে সেখানকার বেসরকারি ট্রাভেলস এজেন্ট অফিসগুলোতে গেলেই চড়া দামে মিলছে টিকিট।

বিমান, বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং কয়েকজন দালালের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক প্রবাসীরা। নির্দিষ্ট দামের চেয়ে দেড়-দুইগুণ বেশি দাম দিয়ে টিকিট কিনে ঈদের আগে রিয়াদ থেকে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে শত শত প্রবাসীকে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। এদিকে নানা কৌশল নিয়েও রিয়াদে বিমানের টিকিট বিক্রি নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটটি ভাঙতে পারছে না বলে দাবি বিমান কর্র্তৃপক্ষের। তাদের কাছে অনেকটা অসহায় তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা এবং বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার অফিসের তিন কর্মকর্তার সঙ্গে রিয়াদের এক ডজন চিহ্নিত দালাল ও ট্রাভেল এজেন্টদের সিন্ডিকেট ঘরমুখী প্রবাসী যাত্রীদের কাছ থেকে টিকিটের গলাকাটা দাম নিচ্ছে।

রিয়াদ থেকে ঢাকায় আসার ইকোনমি ক্লাসের ১ হাজার ৯০০ রিয়ালের টিকিট কিনতে হচ্ছে অতিরিক্ত দেড়-দুইগুণ দাম দিয়ে। বিমানের ফ্লাইটে গত রবিবার রিয়াদ থেকে ঢাকায় আসা অন্তত ১০০ যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। বিমানবন্দরে তারা এ প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি সংঘবদ্ধ চক্র করোনাকালীন স্পেশাল ফ্লাইটের টিকিট নিয়ে প্রকাশ্যেই হরিলুট করছে। বিমান অফিসে গেলে বলা হচ্ছে টিকিট নেই।

আবার স্থানীয় ট্রাভেলস অফিসে গেলেই অতিরিক্ত টাকায় মিলছে টিকিট। একমাত্র বিজনেস ক্লাস এবং অনলাইনে টিকিটের দাম ছিল স্বাভাবিক। বাকি সব টিকিটই বিক্রি হয়েছে দেড়-দ্বিগুণ দামে। ঢাকা-রিয়াদ রুটের ৪১৯ আসনের ৭৭৭ উড়োজাহাজের সব আসন পূর্ণ করেই বেশিরভাগ ফ্লাইট ঢাকায় আসছে। এতে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। অথচ স্বাস্থ্যবিধির কথা বলেই টিকিটের বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি ফ্লাইট থেকে ৭০-৮০ হাজার সৌদি রিয়াল হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।

তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘রিয়াদে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে বিমান নেই। সেটা করছে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস। এ ক্ষেত্রে যাত্রীরা যদি দালালের কাছে প্রতারণার শিকার হয়ে ঠকে থাকে তাহলে বিমান দায়ী হয় কীভাবে? তারপরও অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে। তাহলে তো আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাত্রীরা নিজে হাজির না হলে টিকিট দেওয়া যাবে না।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাকালে শিডিউল ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বিমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহায়তায় স্পেশাল ফ্লাইট অপারেট করছে। এর নিয়ম হচ্ছে সৌদি আরব থেকে যারা দেশে ফিরতে চাইবে তারা সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে সিরিয়াল দিয়ে নাম নিবন্ধন করবে। তারপর দূতাবাস সেই তালিকা রিয়াদের বিমান অফিসে পাঠিয়ে দেবে এবং বিমান সেই তালিকা ধরেই শুধু টিকিট ইস্যু করবে। রিয়াদের দূতাবাসের বেলাল নামের এক কর্মকর্তা বিমানের অফিসে বসেই সেটা ইস্যু করেন। কিন্তু টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে বিমান এ নিয়ম মানছে না বলে অভিযোগ করেন ঢাকায় আসা যাত্রীরা।

গত রবিবার রাত ৯টায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাগেজ বেল্টে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, তিনি রিয়াদের বিমান অফিসে গিয়ে ১ হাজার ৯০০ রিয়ালের ইকোনমিক ক্লাসের টিকিট পাননি। পরে বাথা মার্কেটের এক দালালের মাধ্যমে ২ হাজার ৯০০ রিয়ালে একটি টিকিট সংগ্রহ করে ঢাকায় ফেরেন।

একই ফ্লাইটে দেশে ফেরা চট্টগ্রামের বন্দর থানার বাসিন্দা শাহজাহান দ্বিগুণ দামে (৩৮০০ রিয়াল) টিকিট কেনার কথা জানান।

রবিবারের ওই ফ্লাইটের লিমা নামে আরেক যাত্রী বলেন, স্পেশাল ফ্লাইটের টিকিট কিছুতেই বিমানের বাইরে ট্রাভেলস অফিসে বিক্রির নিয়ম নেই। অথচ রিয়াদের বিমান অফিসের আমিন, সোহেল ও তানভীর দালাল ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে এসব টিকিট চড়া দামে বিক্রি করছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বাথা মার্কেটের দালাল জাহাঙ্গীর, বাতেন, নাসের, সোহেল ও রুবেল।

লিমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুধু বিমানের টিকিটই নয়, দূতাবাসে তিন মাস ঘুরেও সিরিয়াল দিতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে রিয়াদ দূতাবাসে সিরিয়াল করিয়ে টিকিট পেয়েছি। ওই দালাল দূতাবাসের বেলালের নামে এই টাকা নিয়েছে।’

একইভাবে লক্ষ্মীপুরের আবুল কাসেম, কুষ্টিয়ার আহসান, লক্ষ্মীপুরের মিজান, কুমিল্লার গোলাম হোসেন, ফেনীর সাইদুল হক ও টাঙ্গাইলের জমসেদ জানান, তারা চড়া দামে দালালদের কাছ থেকে টিকিট কিনেছেন।

রিয়াদ প্রবাসী সাংবাদিক আবুল বশির বলেন, ‘বিমান অফিসের আমিন সিন্ডিকেট যেভাবে জিম্মি করে রেখেছে, তাতে আমি সাংবাদিক হয়েও রেহাই পাচ্ছি না। ব্ল্যাক মার্কেটে টিকিট বিক্রি করে ওরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ রিয়াল। তাদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।’

কুমিল্লার আবদুল মালেক বলেন, ‘টিকিট কাটতে হয় দূতাবাসের রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে। আর সেই তালিকা নিয়ে বিমান অফিসে গেলে টিকিট দেয়। আমি বারবার চেষ্টা করেও দূতাবাসে ঢুকতেই পারিনি। ২৫ বার ফোন করার পর দূতাবাস থেকে বলা হলো, তিন মাসের আগে সিরিয়াল নেই। তারপর বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে তিন হাজার রিয়াল দিয়ে টিকিট কেটে ঢাকায় এসেছি। আমি অনলাইনে বারবার চেষ্টা করেও টিকিট পাইনি।’

ঢাকাগামী যাত্রীদের করা এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিমানের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানের স্পেশাল ফ্লাইটের বিদ্যমান কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। এসব অভিযোগ অবিশ্বাস্য লাগলেও রিয়াদে বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার আমিনের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা জানতে চাই। তখন কান্ট্রি ম্যানেজার জানান, বিমান টিকিট বিক্রি করে না। দূতাবাসের বেলালের দেওয়া তালিকা ও সিরিয়ালমতো টিকিট দেওয়া হচ্ছে। এখানে বিমানের করার কিছুই নেই। দূতাবাস আর সৌদিতে জিএসএ এই কাজ করছে।’

তবে বিমানের এ কর্মকর্তার সঙ্গে যাত্রীরা একমত হতে পারছেন না। তারা জানান, জিএসএ টিকিট বিক্রি করে না। বিক্রি করছে বিমানের আমিন ও বেলাল সিন্ডিকেট। এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে প্রবাসী যাত্রীদের কাছে। রিয়াদ থেকে ঢাকায় ফেরা রাঙ্গুনিয়ার আবুল কাসেম জানান, তিনিও দালালের মাধ্যমে টিকিট কিনেছেন ২ হাজার ৮০০ রিয়ালে। দালাল না ধরলে টিকিটও পেতেন না। মালেক নামে আরেক যাত্রী জানান, তিনি একই টিকিট কিনেছেন ৩ হাজার রিয়ালে। আকলিমা নামের অন্য এক নারী যাত্রী আল কাশিমের এক দালালের কাছ থেকে টিকিট কিনেছেন ২ হাজার ৯০০ রিয়াল দিয়ে।

আরিফ নামে এক যাত্রী বলেন, ‘বিমানের স্টাফ নাসের তার শ্যালকের নামে কিংডম ট্রাভেলস এজেন্ট চালু করে ব্যবসা করছে ব্ল্যাক টিকিটের। সে আবার বিমানবন্দরের কাউন্টারে বসে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত লাগেজের টাকা আদায় করে। তার মাধ্যমেই আমিন ও সোহেল এবার স্পেশাল ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি করে লাখ লাখ রিয়াল হাতিয়ে নিচ্ছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রিয়াদে বিমানের ব্যবস্থাপক আমিনুর রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। টাকা যদি খেয়ে থাকে সেটা দূতাবাসের বেলালকে জিজ্ঞাসা করেন। উনি নিজের হাতে টিকিট বিক্রি করে, আমরা শুধু দেখি। দালালরা কিছু টিকিট হয়তো অন্যভাবে আগাম সংগ্রহ করে থাকে। তারপরও বিষয়টি তদন্ত করে দেখব।’

প্রকাশ : দেশ রূপান্তর

আরও খবর
Loading...