শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নকশা পরিবর্তন হচ্ছে

প্রকল্পের সাড়ে ৬ শতাংশ কাজ শেষে পরিবর্তন হচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নকশা।
এর আওতায় পাইলিংয়ের নকশা পরিবর্তন হবে। এছাড়া যুক্ত হবে অত্যাধুনিক ভিভিআইপি টার্মিনাল।
এতে শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন ইউ আকৃতির দুই ‘পা’ প্রকল্পটিতে অন্তর্ভুক্ত হবে।

টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ে সয়েল টেস্টের (মাটির পরীক্ষা) রিপোর্টে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং (এসএসপি) অনুপযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এ সংক্রান্ত নকশায় পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় অত্যাধুনিক স্ক্রুড স্টিলের পরিবর্তে বোরড পাইলিং করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তন আনায় প্রকল্প ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে কমপক্ষে ৭১১ কোটি টাকা। ফলে এতে যুক্ত করা হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক ভিভিআইপি টার্মিনাল।
একই সঙ্গে প্রকল্পটি অত্যাধুনিক শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন ইউ আকৃতি করা সম্ভব হবে।
আগে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইউ আকৃতির দুই ‘পা’ প্রকল্পে ছিল না। এখন ব্যয় সাশ্রয় হওয়ায় প্রকল্পে দুই ‘পা’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, যেহেতু মেট্রোরেল প্রকল্পে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং সয়েল টেস্ট রিপোর্টে অনুপযুক্ত হয়েছে সে কারণে আমরা ঝুঁকি নেব না। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও বলেছে, মেট্রোরেল প্রকল্পের এবং থার্ড টার্মিনালের মাটি একইরকম।

তিনি বলেন, প্রকল্প যে কোনো সময় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের সুযোগ আছে। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।
তিনি আরও বলেন, স্ক্রুড পাইলিং না হওয়ায় ৭১১ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হবে। আমাদের টার্গেট হচ্ছে এই টাকায় প্রকল্পের সঙ্গে একটি ভিভিআইপি টার্মিনাল নির্মাণসহ আরও বেশ কিছু কাজ করা। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের একটি মেগা প্রকল্পের মাঝপথে এসে হঠাৎ মূল কাজ অর্থাৎ টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ের ধরন পরিবর্তন করা হলে পুরো প্রকল্পটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাছাড়া প্রকল্পটির ঠিকা চুক্তিতে স্ক্রুড স্টিল পাইল (এসএসপি) একটি সিলেকশন ক্লাইটেরিয়া ছিল।

এটি দরপত্রের অত্যাবশ্যকীয় শর্তেও ছিল। মূলত এই শর্তের ভিত্তিতেই উপযুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছিল।
এ অবস্থায় অত্যাবশ্যকীয় এই শর্ত বাদ দেয়া হলে এই দরপত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
সেক্ষেত্রে অন্যান্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যদি এ নিয়ে আইনের আশ্রয় নেয় তাহলে পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।

তবে এ প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা হবে কিনা সে বিষয়ে আইনি পরামর্শ দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ একটি ফার্মকে নিযুক্ত করেছিল। ফার্মটির নাম মেসার্স শেখ অ্যান্ড চৌধুরী ল’ ফার্ম।

কোম্পানিটি এ সংক্রান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুন যাচাই-বাছাই করে জানিয়েছে, ভেরিয়েশন অর্ডার জারির মাধ্যমে বর্ণিত স্ক্রুড স্টিল পাইলের পরিবর্তে বোরড পাইল কাজ সম্পাদন করতে আইনে কোনো বাধা নেই।
ল’ ফার্ম নিযুক্তির পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিপিটিইউ’র (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট) মতামতও নেয়।

সিপিটিইউও এ সংক্রান্ত ভেরিয়েশন কাজে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে তাদের মতামতে জানায়। এছাড়া প্রকল্পের অর্থদাতা সংস্থা জাইকাও এ নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এ বিষয়ে আইনি পরামর্শ নেয়া হয়। তারাও ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল এভিয়েশনের শীর্ষপর্যায়ের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প শুরুর আগে স্ক্রুড স্টিল পাইলের সুপারিশ করা হয়েছিল প্রকল্প এলাকার মাটির ফিজিক্যাল কন্ডিশন (বাহ্যিক অবস্থা) দেখে। সয়েল টেস্টের প্রকৃত রিপোর্টের ভিত্তিতে দেয়া হয়নি।

তাছাড়া বাংলাদেশের কোথাও এর আগে স্ক্রুড স্টিল পাইল করা হয়নি। তিনি বলেন, বিষয়টির ওপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত চাওয়া হলে তারা সব কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে স্ক্রুড স্টিল পাইলিংয়ের পরিবর্তে বোরড পাইলং করা যাবে বলে মত দিয়েছে।

বেবিচক সূত্রে আরও জানা গেছে, এই প্রকল্পের ভেরিয়েশনজনিত কাজের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যে টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা জানিয়েছে সেটি নিয়েও তারা নানাভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখেছেন। এজন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ, বেবিচকের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ যাচাই-বাছাই করে ৮৪.৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৭১১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের ফাউন্ডেশনের কাজে প্রায় তিন হাজার পাইলিং লাগবে। এর মধ্যে ১৫৪৯টি পাইল স্ক্রুড স্টিল দিয়ে সম্পাদনের বিষয়টি ঠিকাচুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। জানা গেছে, সরকারের অন্যতম মেগা প্রকল্প হওয়ায় এটির বাস্তবায়নকালীন সময় সাশ্রয়ের জন্য জাপানিজ টেকনোলজিগুলোর মধ্যে অত্যাধুনিক স্ক্রুড স্টিল পাইল (এসএসপি) ব্যবহারের বিষয়টি প্রকল্পের দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করে।

কিন্তু ১৯ মে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোই জানায়, স্ক্রুড স্টিল পাইপ দেশের চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের পাইল ফাউন্ডেশন টেস্টে অকৃতকার্য হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরও জানায়, মেট্রোরেল প্রকল্পের সয়েল কন্ডিশন (মাটির অবস্থা) তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের সয়েল কন্ডিশনের মতো। এ অবস্থায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পটির টার্মিনাল ভবনের পাইলিং কাজে স্ক্রুড স্টিল পাইলিং করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

মুজিব মাসুদ, দৈনিক যুগান্তর

আরও খবর
Loading...