৬ প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন পিকে হালদার

পি কে হালদার কেলেঙ্কারি *

* বিভিন্ন ব্যাংকে আছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা * ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ২৫০০ কোটি টাকা * এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে ১১১৮ কোটি টাকা * পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে ৫০০ কোটি টাকা * বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে ৫১০ কোটি টাকা * রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ৪০০ কোটি * একটি ব্যাংক থেকে ৭ কোটি টাকা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : দেশের একটি বাণিজ্যক ব্যাংক ও পাচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রশান্ত কুমার হালদার বা পি কে হালদার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে ৫০০ কোটি টাকা, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে ৫১০ কোটি টাকা, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ৪০০ কোটি এবং নতুন প্রজন্মের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭ কোটি টাকা আÍসাৎ করেছেন।

সূত্র জানায়, আলোচ্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালিত পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

পি কে হালদার প্রথমে ছিলেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পরে তিনি নতুন প্রজন্মের ব্যাংক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি হন। এমডি থাকা অবস্থায়ই তিনি আর্থিক খাতে জালিয়াতির কাজ শুরু করেন।

আর্থিক খাত থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পি কে হালদার এখন পলাতক। তবে তিনি দেশে ফিরে আসতে চান। এ জন্য নিরাপত্তা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।

তার আÍসাৎ করা টাকার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একাউন্টে ঋণ হিসাবে রয়েছে। পি কে হালদারের নামে বেনামে নেয়া ঋণের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেড় হাজার কোটি টাকার কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো পাচার করে দেয়া হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরই পি কে হালদার নামে বেনামে গড়ে তোলা ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কেনা শুরু করেন। বেশির ভাগ শেয়ার কিনে তিনি তার নিজের আত্মীয় স্বজন বা কর্মচারীদের ওই সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে বসান। একই সঙ্গে পরিচালকদের প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান নিজের অনুগত লোকদের।

এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে তিনি কিনে নেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (আইএলএফএসএল) বেশির ভাগ শেয়ার। এরপর কাগুজে কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন আমানতকারীদের টাকা ফেরৎ দিতে পারছে না।

একই প্রক্রিয়ায় তিনি এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখান থেকে প্রায় ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ প্রতিষ্ঠানটিও এখন আমানতকারীদের টাকা ফেরৎ দিতে পারছে না।

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডও তিনি একই প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণে নেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪৮ কোটি টাকা এখন খেলাপি। খেলাপি ঋণের মধ্যে ৫৭০ কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে পি কে হালদারের স্বার্থ সংশ্লিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামেই নেয়া হয়েছে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। আমানতকারীদের টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখন অবসায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে ৫১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ অর্থও পরিচালকরা হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে পিকে হালদারের মালিকানাও রয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির বেশির ভাগ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

এদিকে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি থাকার সময়ে পি কে হালদার নামে বেনামে ঋণ দিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। এর মধ্যে নিজ প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ব্রেকারেজ হাউজকে দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা। এসব টাকায় তিনি নামে বেনামে শেয়ার কিনে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে নিজেদের লোকদের বসিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৫৮৩ কোটি টাকা।

তিনি যখন একটি ব্যাংকের এমডি ছিলেন ওই ব্যাংকেও নজিরবিহীণ লুটপাট করেছেন। ব্যাংকটি থেকে করোনার পরীক্ষা জালিয়াতির অন্যতম নায়ক মো. শাহেদকে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ঋণ পাইয়ে দেন। যে টাকা এখন ফেরৎ আসছে না। খেলাপি হয়ে গেছে। বেনামে পি কে হালদার নিয়েছেন প্রায় ৭ কোটি টাকা। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ১৫০ কোটি টাকার বেশি। গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১৪৬ কোটি টাকা। করোনার সময়ে নতুন ঋণ খেলাপি না হলেও ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ কোটি টাকা।

আরও খবর
Loading...