চলতি বছর হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে জমিজমা বিক্রি করে ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা রাজধানীর খান ট্রাভেল সার্ভিসে জমা দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের আব্দুল হাসেম। তাকে ২৭ আগস্ট ফাইট দেওয়ার কথা বলে এজেন্সির লোকজন ঢাকার হজক্যাম্পে নিয়ে আসেন। অথচ গতকাল পর্যন্ত তার ফাইট হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি জানতে পেরেছেন, টিকিট হয়নি বলে তার জেদ্দা যাওয়া হচ্ছে না। এদিকে এজেন্সির লোকজনকেও এখন খুঁজে পাচ্ছেন না হতভাগ্য এ ব্যক্তি। দিশেহারা আবদুল হাসেম যাকেই সামনে পাচ্ছেন, তার কাছে বিমানের টিকিট পাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা চাইছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার মতো প্রতারিত ১২৮ হজযাত্রী এমন রাজধানীর হজক্যাম্পে আছেন।
হজ অফিসের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ১ লাখ ১ হাজার ৪ জনের হজ ভিসা ইস্যু করেছে ঢাকার সৌদি দূতাবাস। চুক্তি অনুযায়ী, ১ লাখ ১ হাজার ৭৫৮ জনের ভিসা ইস্যুর কথা থাকলেও নানা কারণে ৭৫৪ জনের ভিসা হয়নি। গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৩০টি এবং সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের ১৩৬টি ফাইটে ৮৯ হাজার ৯৯১ হজযাত্রী সৌদি আরবে গেছেন। বাকি ১১ হাজার ৭৬৭ জনের আগামীকালের মধ্যে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু হজক্যাম্পে থাকা ১২৮ জনের হজ পালন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে ভিসা পাননি ১৩ জন। বাকি ১১৫ জন ভিসা পেলেও টিকিট পাননি। প্রতারিত এসব হজযাত্রী বিমানের টিকিটের আশায় এখন আশকোনার হজ অফিসের কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
জানা গেছে, খান ট্রাভেলস সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে হজের টাকা জমা দিয়ে গতকাল বিমানের টিকিট পাননি এমন ২৬ জন হজযাত্রী হজক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের ভিসা হয়েছে। তাদেরই একজন মঞ্জুর আলীর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগরে। তিনি জানান, স্ত্রীকে নিয়ে হজের টাকা জমা দিয়েছেন। খান ট্রাভেলসের কর্মকর্তা মাসুদ তাদের ২০ আগস্ট ফাইট দেওয়ার কথা বলেন। পরবর্তীকালে ২৭ আগস্ট ফাইট দেওয়ার কথা বলে তাকেসহ অন্যদের ঢাকায় নিয়ে আসেন ওই ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তা মাসুদ ও মালিক মোনায়েম খান। এখানে এসে তারা জানতে পারেন, তাদের বিমানের টিকিট হয়নি। এখনো ওই এজেন্সির কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে হজের টাকা পরিশোধের পর ভিসা-টিকিট হয়নি এমন ১৩ হজযাত্রী ঘুরছেন হজক্যাম্পে। প্রতারণার অভিযোগে তারা গ্রুপ লিডার মইনউদ্দিনকে ধরে হজ অফিসে সোপর্দ করেছেন। মইনউদ্দিন জানান, ইউনিয়ন ট্রাভেলস লিমিটেডের মাধ্যমে ১৩ হজযাত্রী নিবন্ধিত হয়ে হজের টাকা জমা দেন। ওই এজেন্সির কোটা পূর্ণ না হওয়ায় এসব হজযাত্রীকে আরআর ট্রাভেলস লিমিটেডের মাধ্যমে হজপালনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু টাকা জমা দেওয়ার পর ১৩ হজযাত্রীর ভিসা-টিকিট কিছুই করা হয়নি। এই হজযাত্রীদের ভিসা করতে গত ৩ সেপ্টেম্বর আবেদন করা হয়। কিন্তু ভিসা হয়নি। তবে হজ অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ওই ১৩ হজযাত্রীর ভিসার আবেদনই করেননি এজেন্সি মালিক। ভিসা কার্যক্রম ২৮ আগস্ট বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রুপ লিডার প্রতারণা করায় তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টলা হজ ট্রাভেলসের (৭১৭) মালিক মো. নিজামউদ্দিন ২৪ হজযাত্রীর টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
জানা গেছে, জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে হজ এজেন্সি শুভ ইন্টারন্যাশনালের মালিক মমিন খান ১৪ জুলাই মতিঝিলের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে হজযাত্রীদের বিমানভাড়ার ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে কাজী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেডের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেন। এতে সহযোগী হজ এজেন্সি ট্রাভেল নূরানী এবং মেরাজ এয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ১০১ জন বিপাকে পড়েন। গতকাল এসব হজযাত্রী টিকিট পান।
হাবের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাহার বলেন, মেরাজ ও নূরানী ট্রাভেলসের এজেন্সিরা বিমানের টিকিট পেয়েছেন। এখন শুধু শুভ ইন্টারন্যাশনালের ৬৮ হজযাত্রীর টিকিট পাননি। তারা বিপাকে আছেন।
হজ অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, হজযাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতারণার কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের মধ্যে তিনটি এজেন্সির তিনজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি এজেন্সির মালিক সৌদি আরবে গেছেন। তাকে সেখানেই আটকের চেষ্টা চলছে।