উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের আজীবন ফ্লাইট নিষেধাজ্ঞার চিন্তা ব্রিটেনের

যুক্তরাজ্যে বিমানে উচ্ছৃঙ্খল ও অসদাচরণকারী যাত্রীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যে বিমানে উচ্ছৃঙ্খল ও অসদাচরণকারী যাত্রীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমানযাত্রার সময় যাত্রীদের বিশৃঙ্খল আচরণ, কেবিন ক্রুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, নিরাপত্তা বিধি অমান্য এবং সহযাত্রীদের হয়রানির ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার আওতায় গুরুতর অপরাধে জড়িত যাত্রীদের জন্য আজীবন বিমান ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ বিমান পরিবহন খাতের বিভিন্ন সংস্থা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিমানে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন ঘটনার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা কেবিন ক্রুদের নির্দেশনা অমান্য করছেন, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করছেন কিংবা মদ্যপ অবস্থায় বিমানে উঠে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন। এসব ঘটনা শুধু যাত্রীদের ভোগান্তির কারণই নয়, বরং পুরো ফ্লাইটের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে, উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের কারণে প্রায়ই ফ্লাইট বিলম্বিত হয়, কখনও কখনও মাঝপথে বিমানকে বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণ করতেও বাধ্য হতে হয়। এতে বিমান সংস্থার আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অন্যান্য যাত্রীদের সময় ও ভ্রমণ পরিকল্পনাও ব্যাহত হয়। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, একজন যাত্রীর অসদাচরণের কারণে শত শত যাত্রীকে দীর্ঘ সময় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দায়ে যাত্রীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিদ্যমান শাস্তি অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর নয়। এজন্য আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার এখন গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য আজীবন ফ্লাইট নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর শাস্তির বিষয়টি বিবেচনা করছে।

বিমান শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিমানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে যারা বারবার একই ধরনের অপরাধ করেন বা কেবিন ক্রুদের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা শারীরিক নির্যাতনের মতো গুরুতর ঘটনায় জড়িত হন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিমান পরিবহন খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলোও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাঁদের মতে, কেবিন ক্রু এবং পাইলটরা প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ক্রু সদস্যদের প্রতি হুমকি, গালিগালাজ ও আক্রমণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ফলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু যুক্তরাজ্য নয়, বিশ্বের বহু দেশেই উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের সমস্যা বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটে মদ্যপান, ধূমপান নিষেধাজ্ঞা অমান্য, ক্রুদের নির্দেশনা উপেক্ষা এবং সহযাত্রীদের সঙ্গে বিরোধের ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক বিমান সংস্থা ইতোমধ্যে নিজস্ব কালো তালিকা বা ব্ল্যাকলিস্ট ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে অসদাচরণকারী যাত্রীদের ভবিষ্যতে সেই সংস্থার বিমানে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়।

তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, শুধু একটি বিমান সংস্থা নয়, বরং গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যদি অত্যন্ত গুরুতর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন, তাহলে তিনি দীর্ঘমেয়াদে বা আজীবনের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত বিভিন্ন ফ্লাইটে ভ্রমণের সুযোগ হারাতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিমান ভ্রমণ নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখতে কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। যাত্রীদের অধিকারের পাশাপাশি তাঁদের দায়িত্বও রয়েছে। বিমানে ভ্রমণের সময় নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা, ক্রুদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং সহযাত্রীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেক যাত্রীর দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে কেউ যদি অন্যদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত করেন, তাহলে কঠোর শাস্তি আরোপকে অনেকেই যৌক্তিক বলে মনে করছেন।

এদিকে যুক্তরাজ্য সরকার বিষয়টি নিয়ে বিমান সংস্থা, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে তা দেশটির বিমান পরিবহন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। এর মাধ্যমে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণে আরও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই উদ্যোগ সফল হলে অন্যান্য দেশও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাতে উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের বিরুদ্ধে আরও সমন্বিত ও কঠোর অবস্থান দেখা যেতে পারে। বর্তমানে আলোচনার পর্যায়ে থাকা এই প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিমান শিল্পে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.