যে কোন দেশের আন্তর্জাতিক পরিবহন সংস্থা সে দেশের জাতীয় অহংকার। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স এর মাধ্যমেই একটি দেশ সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। তাই শুধু মুনাফা অর্জনই জাতীয় পরিবহন সংস্থার লক্ষ্য নয় । মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বহির্বিশ্বের সাথে দেশের সেতুবন্ধন এর অন্যতম লক্ষ্য । এয়ারলাইন্স সংস্থাকে টিকিয়ে রাখার প্রধান কৌশল হিসেবে যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার মানয়োন্নয়ন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার অগ্রভাগে নিয়োজিত কর্মীদের কেবিন ক্রু নামে আন্তর্জাতিক ভাবে অভিহিত করা হয়ে থাকে , যা আমাদের দেশের মানুষেরা বিমান বালা বলতে এবং ভাবতে পছন্দ করেন ।
আকাশযানের কর্মীদের বিষয়ে সাধারণ মানুষের কল্পনা আর আকর্ষণ অনেকসময় কৌতূহলে রুপ নেয় । যাত্রীদের এই আকর্ষণ আর কৌতূহলকে ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যাত্রী পরিবহণের সূচনা লগ্ন থেকেই । ‘বিমান বালা’ শব্দটির মাধ্যমে শুধুমাত্র একটি নারীসুলভ পেশাকেই ইঙ্গিত করা হয় । যে পেশায় পুরুষের কোন পদ নেই বলেই মনে হয় । প্রকৃতপক্ষে এ পেশায় নারী পুরুষ উভয়ই একসাথে কাজ করছেন। পৃথিবীর পরিবহণ ব্যবসার ইতিহাসে এ পেশার প্রথম পেশাজীবী জার্মানির হেনেরিস কিউবিস একজন পুরুষ ছিলেন যিনি ১৯১২ যিনি এই পেশাকে সম্পূর্ণভাবে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সফল্ভাবে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন । এক বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মোট ৬২ জন যাত্রীকে জরুরী অবতরণে সক্ষমভাবে বহির্গমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন । জরুরী বহির্গমন এবং আগুন নেভানোর যোগ্যতায় লৈঙ্গিক বিভাজন এখানে উল্লেখযোগ্য কোন বিষয় ছিলোনা ।
বিমান সংস্থায় বিমান বালা সম্বোধনে বা নামে কোন পদ নেই । অথচ গত কিছুদিন আগে কাতার এয়ারোয়েজের একজন কেবিন ক্রুর মৃত্যু হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি প্রথম সারির টেলিভিশন এবং জাতীয় দৈনিকে এ পেশাকে ‘বিমান বালা’ হিসেবেই সংবাদ প্রকাশ করেছে। সাহিত্যাঙ্গনে,কবিতায় কিংবা গানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবিন ক্রুদের ‘বিমান বালা’ বলা হয়ে থাকে এবং বিশেষণ হিসেবে ‘সুন্দরী’ যুক্ত করা হয় যা এই পেশার গুরুত্ব এবং দায়িত্বশীলতার প্রতি অসম্মান এবং বৈষম্যমূলক ।সংস্কৃত শব্দ ‘বাল’মানে শিশু বা অল্পবয়েসী বালক।সেখান থেকেই বালিকা বা বালা। বালা মানে মেয়ে কন্যা যুবতী,বালিকা,স্ত্রী অথবা রমনী , যা একটি স্ত্রী বাচক শব্দ ।বালা শব্দের আরেক অর্থ হাতকড়া। যা নারীর মর্যাদার প্রস্নে নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হতো।পেশা হিসেবে বিমানবালা শব্দটি অতীত কালে নেতিবাচক প্রথার মতো ধীরে ধীরে আপত্তিকর হয়ে উঠেছে, শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থের নয় , বরং এর ব্যবহারিক অর্থে । শাব্দিক অর্থে বালা বা বালক কোন নেতিবাচক শব্দ নয় । কিন্তু ব্যবহারিক অর্থে ‘ বিমান বালা’ শব্দে মানুষের আচরনের যেই বহিঃপ্রকাশে তা থেকে হীন নারীবিদ্বেষই প্রকাশ পায়, যা নারীর পেশাগত জীবনকে অনৈতিক এবং নিষ্ঠুরভাবে বিদ্ধ করে ।
বিশ্বায়নের এই যুগে যারা যাত্রীদের নিরাপদে বহন করে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিচ্ছে সেই আন্তর্জাতিক ও দায়িত্বশীল পেশাকে তাচ্ছিল্য ও অবমাননা করার নিকৃষ্ট প্রবণতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে ।এই নামকরণের কারণে কিছু অনগ্রসর মানুষ নারীকে অপমান করার সুযোগ পেয়ে উল্লসিত হয়। আর পেশার ধরণকে গুরুত্ব না দিয়ে এখানে নারীর সৌন্দর্য পেশার সাথে যুক্ত করে প্রকাশ করা হয় যা নারীকে পণ্য হিসেবে অপব্যবহারেরই নামান্তর । প্রকৃত পক্ষে উড্ডয়ন কালীন সময়ে যাত্রীর জীবনের নিরাপত্তাই এই পেশার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব , কিন্তু সে বিষয়টি এখানে প্রাধান্য না পেয়ে নারীর রুপ সৌন্দর্যই যেন সর্বস্ব হয়ে উঠছে । অথচ নারী কেবিন ক্রুরা যুগে যুগে যাত্রীদের জীবন রক্ষা করেছেন ইতিহাস তা বহন করছে করুণ ভাবে । বাইশ বছর বয়সি এক ব্রিটিশ নারী কেবিন ক্রু আগুন লেগে যাওয়া উড়োজাহাজ থেকে যাত্রীদের সফলভাবে নামানোর পরে নিজে নামার ঠিক আগে এক পঙ্গু নারীকে বাঁচাতে গেলে উড়োজাহাজটি সম্পূর্ণভাবে বিস্ফোরিত হয়। যাত্রীর জীবনের প্রতি এহেন আত্মত্যাগ এ পেশার পেশাজীবীদের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা।
১৯৯৬ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি এফ২৮ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সিলেটে ঝড়ের কবলে দুর্ঘটনায় পতিত হয়,যে দুর্ঘটনায় বিমানের কেবিন ক্রু প্রমিলা যাত্রীদের মধ্যে একজন শিশু সহ মোট ৮৫ জন যাত্রীকে জরুরী অবতরণে বহির্গমনে সক্ষম হয়েছিলেন । সকল যাত্রীকে বের করার পরেও এক পর্যায়ে কো পাইলট এবং কেবিন ক্রু প্রমিলা লক্ষ্য করেন যে পাইলট ককপিটে আটকা পরে আছেন । পরবর্তীতে তাঁকেও ককপিটের জানালা ভেঙ্গে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় সফল্ভাবে বের করতে সক্ষম হন ।এই দুর্ঘটনায় ঐ কেবিন ক্রুকে কপালে এগারোটি সেলাই দিতে হয়েছে এবং কানে স্থায়ীভাবে সমস্যা হওয়ার কারণে তিনি স্বেচ্ছায় চাকুরী থেকে অবসর নিতে বাধ্য হয়েছিলেন ।বাইরের থেকে অনেক সময়ই এই পেশার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ অপরিসীম যা অনেক সময় বেদনার কারণ হয়ে দাড়ায় । এমন অনেক কেবিন ক্রু আছেন যারা পেশা এবং সংসারের দায়িত্ব পালন করে করে সারাজীবন অবিবাহিতই থেকে যান । আবার দায়িত্বশীলতার কারণেই বহুদিন দেশের বাইরে থাকার ফলে অনেকের সংসার ভেঙ্গে যায় । একবার এক ফ্লাইটে ক্রু সংক্ষিপ্ততার ফলে উড্ডয়ন আটকে যাচ্ছিলো । তখন একজন কেবিন ক্রু মহিলা বিয়ের জন্য ছুটিতে ছিলেন । ফ্লাইট বসে যাবার কারণে উপায়ান্ত না দেখে গাঁয়ে হলুদের দিন বিমানের গাড়ী এসে সেই ক্রুকে ফ্লাইটে তুলে নিয়ে যায় । যা একই সাথে কষ্টকর এবং পীড়াদায়কও বটে ।
ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মহিলা কেবিন ক্রু এলেন চার্চ ১৯৩০ সালে বোয়িং কোম্পানীতে যোগ দেয়ার পরবর্তীতে কিছু এয়ারলাইন্স এই পেশাকে শুধু নারীদের জন্য সীমাবদ্ধ করে দেয় । ১৯৩৫ সালে ট্রান্সকন্টিনেন্টাল এবং ওয়েস্টার্ন এয়ারলাইন্স শুধু মহিলাদের জন্য ৪৩ টি পদের জন্য শুধুমাত্র নারীদের আহ্বান করে যা সে সময়ে হতাশার সৃষ্টি করেছিলো।১৯৩৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমস এ প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত ‘ শুধুমাত্র অবিবাহিত,অথবা বিবাহিত, সিঙ্গেল অথবা তালাকপ্রাপ্তা সন্তানবিহীন নারী অগ্রাধিকার পাবে যাদের বয়স ২০ থেকে পচিশ বছর হবে’।
১৯৬৮ সালের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবিবাহিত থাকার শর্তে নারী কেবিন ক্রুর বয়স সীমা ৩২ থেকে ৩৫ এর মধ্যে ছিল যা বৈষম্য মূলক হওয়ায় সিভিল রাইট এক্ট ১৯৬৪ দ্বারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ঐ আইনে বলা হয় হয় যে লিঙ্গভিত্তিক নির্বাচন পেশার শর্তের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় । ১৯৭১ সালে একটি কোর্ট কেসের কারণে এ পেশায় শুধুমাত্র মহিলা কর্মীদের নিয়োগ সকল এয়ারলাইন্স এর জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং ১৯৮০ সালে নারী কর্মীদের অবিবাহিত থাকার শর্তটিও বাতিল ঘোষিত হয় । বয়স এবং অবিবাহিত হওয়া এই পেশার প্রথমদিকের শর্তের প্রবনতা হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আর্মস ফোরস এ অসংখ্য নার্স এ পেশায় যোগদান করলে এই বিষয়গুলো শিথিল হয়ে যায়.
‘বিমান বালা’ সম্বোধনের এই পদবীর অস্তিত্ত নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড এর ট্রেনিং সেন্টার এর গ্রাহক সেবা বিভাগের উপ মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান প্রশিক্ষক এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন” ‘বিমান বালা’ নামে আমাদের সংস্থায় কোন পদ নেই । স্টুয়ার্ড এবং স্টুয়ারডেস হিসেবে সংবাদপত্রে এ পেশার জন্য কর্মী আহ্বান করা হয়।যথাযথ নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হতে পারলেই এ পেশায় যোগদান করা সম্ভব হয়।বিমানের অন্যান্য সকল কর্মীদের মধ্যে এটি একটি বিশেষ অপারেশনাল পেশা যেখানে তাঁরা সরাসরি যাত্রীদের সাথে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা এবং সেবা দিয়ে থাকে।এ ধরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে যারা অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিতে চায় তাঁরা মেল শভিনিজমে আক্রান্ত” বলে তিনি মনে করেন। ধারণা পরিবর্তনের জন্য ব্যায়বহুল আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ভ্রমণ সম্ভব না হলেও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ভ্রমণ করে ধারণা গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।
আরও খবর
