ইজিপ্ট এয়ার থেকে লীজে আনা লক্কর ঝক্কর এয়ারক্রাফটিই আকাশে বিকল

Biman_bangladeshএভিয়েশন নিউজ: মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ইজিপ্ট এয়ারলাইন্স থেকে ভাড়ায় আনা দুটি উড়োজাহাজের একটি বৃহস্পতিবার রাতে আকাশে ৩ হাজার ফুট উচ্চতায় হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। এসময় ফ্লাইটে ২৪১ জন যাত্রী ছিলেন। রাত ১২টা ৩৩ মিনিটে বিজি-০৪৭ ফ্লাইটটি চট্টগ্রাম থেকে দুবাইয়ের পথে উড্ডয়নের ১৮ মিনিটের মাথায় হঠাৎ বিকট শব্দে উড়োজাহাজের একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে।

‘ইঞ্জিন গ্যাস টেম্পারেচার (ইজিটি)’ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এসময় উড়োজাহাজটিতে কাঁপতে শুরু করে। অন্য ইঞ্জিনটিতেও সমস্যা দেখা দেয়। এয়ারক্রাফটের বিদ্যুৎ সরবরাহে নির্বিঘ্ন ঘটে।

এক পর্যায়ে বিমানের সিনিয়র পাইলট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ও কো-পাইলট ক্যাপ্টেন নওশাদ দ্রুত ওই ক্ষতিগ্রস্ত ইঞ্জিনটি শাটডাউন করে দেন। কার্যত তাদের দূরদর্শিতায় দ্বিতীয় ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করে দ্রুত ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। এতে প্রাণে বেঁচে যান ২৪১ যাত্রীসহ বিমানের পাইলট কেবিন ক্রুরা। এ ঘটনায় শুক্রবার রাত পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি হয়নি।

দুবাইগামী যাত্রী চট্টগ্রামের নাজমুল হাসান জানান, ফ্লাইট টেকঅফ করার ৭/৮ মিনিট পর থেকে হঠাৎ উড়োজাহাজের মধ্যে দমবন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রচণ্ড গরম অনুভ‚ত হয়। এ সময় ফ্লাইটকর্মীরা এয়ারকন্ডিশনে ঠাণ্ডার মাত্রা বাড়িয়ে দিলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর কিছুক্ষণ পরেই উড়োজাহাজটি কাঁপতে শুরু করে। মনে হচ্ছিল বার বার হোঁচট খাচ্ছে।

নাজমুল আরো জানান, কেবিন ক্রুদের দৌড়াদৌড়ি দেখে যাত্রীরা ভয় পেয়ে যান। এসময় অনেকে দাঁড়িয়ে যান। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে কেবিনক্রুদেরও উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। কিন্তু তারা বারবার যাত্রীদের সিট বেল্ট বেধে আসনে বসে থাকার অনুরোধ জানান। অস্বস্তির কারণে শিশুযাত্রীদের কান্নাকাটি করতে দেখেছেন। এক পর্যায়ে পাইলট ঘোষণা দেন কিছুক্ষণের মধ্যে হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছেন। এসময় অনেক যাত্রীকে দোয়া-দরুদ পড়তে শোনা গেছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণের পর প্রায় ৩ ঘণ্টা যাত্রীদের ইমিগ্রেশন এলাকায় বসিয়ে রাখা হয়। এ অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে অপর একটি এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রীদের মধ্য থেকে ২৩৭ জনকে দুবাই পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৪ জন যাত্রী দুবাইগামী কোনো ফ্লাইটে উঠতে পারেননি। তাদেরকে উত্তরায় একটি হোটেলে রাখা হয়েছে।

বিমানের জেনারেল ম্যানেজার খান মোশাররফ হোসেন বলেন, যে ফ্লাইটটি রোম যাওয়ার কথা ছিল সেটি বাতিল করে ওই ফ্লাইটেই আটকেপড়া যাত্রীদের দুবাই পাঠানো হয়েছে। অবশ্য এ কারণে কিছু সিডিউল বিঘœ ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ককপিট ক্রু জানান, উড়ন্ত অবস্থায় যদি ওই ইঞ্জিনটি তাৎক্ষণিক বন্ধ করা না হতো তাহলে উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যেতো। সেক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা ছিলো।

উড়োজাহাজ ভাড়ায় দুর্নীতির মহোৎসব : বিমানের প্রকৌশল শাখার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিশরের ইজিপ্ট এয়ারলাইন্স থেকে ভাড়ায় আনা দুটি উড়োজাহাজই (বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর) চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বৃহস্পতিবার রাতে যে উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে তার বিকল ইঞ্জিন মেরামত করতে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা লাগবে। বাংলাদেশে এটি মেরামত করা সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের কোনো এয়ারলাইন্স সংস্থার কাছে এ ধরনের উড়োজাহাজ নেই। ইঞ্জিন, এমনকি পার্টসও নেই।’

বিমান কর্তৃপক্ষ এসব কিছু জেনেও গত বছর নিউ ইয়র্ক রুটে চালানোর নামে মাসে ৪৮ কোটি টাকা ভাড়ায় উড়োজাহাজ দুটি লিজ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এই লিজের নেপথ্যে বিপুল অংকের টাকা অবৈধ লেনদেন হয়েছিল বিমান ও ইজিপ্ট এয়ারলাইন্সের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের মধ্যে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিমানের পক্ষে একজন ফাস্ট অফিসারের নেতৃত্বে ওই সিন্ডিকেটে তৎকালীন বিদেশী এমডি কেভিন স্টিল ও ২ জন বোর্ড মেম্বারও ছিলেন। অপরদিকে ইজিপ্ট এয়ারলাইন্সের পক্ষে ছিলেন ভিপি হাসান নামে তাদের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রকৌশল শাখার ওই কর্মকর্তা জানান, বিকল হওয়া উড়োজাহাজটির বিকল্প কোনো ইঞ্জিন নেই।

আজকালের মধ্যে নষ্ট ইঞ্জিনটি মিশরে পাঠানো হবে। নতুন ইঞ্জিন না আসা পর্যন্ত উড়োজাহাজটি শাহজালালের হ্যাঙ্গারে পড়ে থাকবে। কিন্তু ফ্লাইট চলুক বা না চলুক চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিনই ভাড়া বাবদ টাকা গুণতে হবে বিমানকে। বিমানের মার্কেটিং শাখার একজন কর্মকর্তা শুক্রবার যুগান্তরকে জানান, ইঞ্জিনটি মেরামত করতে কমপক্ষে এক-দেড় মাস সময় লাগতে পারে। ইতোমধ্যে দুবাই-রোমসহ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। কাল (আজ শনিবার) থেকে আরো বেশ কয়েকটি রুটের ফ্লাইট রি-সিডিউল করতে হবে। এতে বিমানকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

বিমানের ফাইনান্স শাখা সূত্রে জানা গেছে, কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া উড়োজাহাজ দুটি লিজ নেয়ায় গত ১১ মাসে বিমানকে ৩০৬ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে। গত বছর ফেব্র“য়ারিতে ভাড়া নেয়া হলেও শুধু হজ মৌসুমে উড়োজাহাজ দুটি শতভাগ ব্যবহƒত হয়েছিল। বাকি সময় বসিয়ে রেখেই মাসে জাহাজপ্রতি ২৪ কোটি টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে বিমানকে। যাত্রী না থাকায় শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঢাকা-রোম রুট। লন্ডনের একটি ফ্লাইট বাড়ানো হলেও কিছুদিন আগে দেখা গেছে মাত্র ২৮ জন যাত্রী নিয়ে এই উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট চালানো হয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিমানের অসাধু কর্মকর্তারা মিশর থেকে বোয়িং ৭৭৭-২০০ সিরিজের এয়ারক্রাফট দু’টি ভাড়া নেয়ার সময় নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির কথা বিবেচনায় নেয়নি। ফলে বিমান উড়োজাহাজ দুটি চালাক বা না চালাক প্রতি মাসে এর মালিক পক্ষকে আড়াই ’শ ঘন্টা হারে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ভাড়া দিতেই হবে। চুক্তি বাতিলের ক্ষমতাও রাখা হয়নি।

চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উড়োজাহাজ দুটি ভাড়ার দায় বিমানকেই বহন করতে হবে। এয়ারক্রাফট দুটি আগের অবস্থায় (ভাড়া নেয়ার সময় যে অবস্থায় ছিল) এনে ফিরিয়ে দিতে হবে। বিমানের এই সিন্ডিকেট প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ওয়েট লিজে (এয়ারক্রাফট, ক্রু, মেনটেনেন্স, ইন্সুরেন্সসহ) উড়োজাহাজ ভাড়া নেয়ার অনুমতি নেয়। কিন্তু পরে তারা তথ্য গোপন করে ড্রাই লিজে দুটি উড়োজাহাজ ভাড়া নিয়ে সরকার প্রধানের সঙ্গেও মিথ্যাচার করে বলে জানা গেছে।

বিমানের ফাইনান্স বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী এয়ারক্রাফট দুটি ৫ বছরের জন্য ভাড়া নিলেও ২ বছরের আগে ফেরত দেয়া যাবে না। ফেরত দিতে হলে বড় অংকের জরিমানা দিতে হবে। আর যদি ২ বছর উড়োজাহাজ দুটি রেখে দিতে হয় তাহলে এসময়ে শুধু ভাড়া বাবদ জাহাজ দুটির পেছনে বিমানের অহেতুক খরচ হবে ৫৭৬ কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ শেষে এয়ারক্রাফট দুটি আগের অবস্থায় ফেরত নিতে কমপক্ষে আরো ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

মারাত্বক আর্থিক সংকটে থাকা রাস্ট্রীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমানের জন্য এজিপ্ট এয়ারলাইন্স থেকে ভাড়ায় আনা এই দুটি এয়ারক্রাফট এখন গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রযেছে, বিমান ম্যানেজমেন্ট সব কিছু জেনে শুনে শুধুমাত্র কমিশন বাণিজ্যের জন্য এই এয়ারক্রাফট দুটি ভাড়া নিয়েছিল। একদিকে ভাড়া নেয়ার সময় মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য, অপর দিকে মাসিক ভাড়ার টাকা থেকে আরেক দফা কমিশন। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে সিন্ডিকেটের গড় আয় ১০ কোটি টাকার বেশি। এ টাকার মুল জোগান দাতা হচ্ছে আন্তজাতিক সিন্ডিকেটের হোতা ইজিপ্ট এয়ারলাইন্সের ভিপি হাসান ও বিমানের একজন ফাস্ট অফিসার।

বর্তমানে বিমানের বহরে ৪টি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, ২টি এয়ারবাস, ২টি ৭৩৭-৮০০সহ ৮টি উড়োজাহাজ আছে। আগামী বছর আরো দুটি নতুন বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ যোগ হবে বহরে। সব মিলিয়ে বর্তমান যে ফ্লাইট সিডিউল তৈরী করা হয়েছে তাতেও কমপক্ষে আড়াইটি এয়ারক্রাফটের কোন ব্যবহার নেই। সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকা ফ্রাঙ্কফুটের (জার্মানী) মতো বড় একটি রুট। ফ্রাঙ্কফ্রুট রুট বন্ধ করার নেপথ্যে ছিল প্রতি ফ্লাইটে ৮৫ লাখ টাকা গচ্চা।

১১ মাসে ২০ বারের বেশি টেকনিক্যাল ক্রটি
ফ্লাইট চালাতে গিয়ে গত ১১ মাসে কমপক্ষে ২০ বারের বেশি বার কারিগরি ক্রটির কারণে উড়োজাহাজ দুটি দিয়ে ফ্লাইট চালানো সম্ভব হয়নি। এতে ফ্লাইট প্রতি ৫০ লাখ টাকার বেশি লোকসান হয়েছিল বিমানের। এরমধ্যে কমপক্ষে দুই বার জার্মানীতে (রুট চালু থাকাকালীন) গিয়ে ত্র“টি জনিত কারণে নষ্ট হয়ে পড়ে ছিল। এছাড়া উড়োজাহাজ দুটি ঢাকা আসার পর দেখা গেছে এর কনস্ট্রাকশন বোয়িং কোম্পানীর অন্যান্য ৭৭৭-২০০ এর মতো নয়। একারণে বিমানের টেনিংকৃত ক্রুদের পক্ষে এই উড়োজাহাজ পরিচালনাতেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এটি সারাতে বিমানের অনেক টাকা খরচ হযেছে। ক্রুদেরকেও নানাভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। নাম প্রকাশে একজন পাইলট জানান, বিশেষজ্ঞ পাইলট ও কেবিন ক্রু ছাড়া এধরনের অপরিচিত উড়োজাহাজ চালানো খুবই ঝুকিপুর্ণ। তিনি বলেন, বিমান কতৃপক্ষ ও যারা ইন্সপেকশনে গিয়েছিলেন তারা কিভাবে জাহাজ দুটিকে রেসপন্সিভ করেছে তা রহস্যজনক। ইঞ্জিন বিকলের কথা স্বীকার করে বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) খান মোশাররফ হোসাইন বলেন, ১টি ইঞ্জিন দিয়ে উড়োজাহাজটি শাহজালালে জরুরী অবতরণ করা হযেছে। এজন্য বিমানের পক্ষে তিনি যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২৪১ জন যাত্রীর মধ্যে অপর একটি এয়ারক্রাফট দিয়ে রাত সাড়ে ৩টায় ২৩৭জনকে দুবাই পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.