থাইল্যান্ডে প্রতারিত হচ্ছেন পর্যটকরা

thailendbg20160610004709আপনি কি বাংলাদেশি? আমি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছি। বাংলাদেশেও যেতে চাই। আচ্ছা, আপনার কাছে কি বাংলাদেশি টাকা আছে? একটু দেখতে চাই। দেখাবেন, প্লিজ!’

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের পর্যটন এলাকা হিসেবে বিবেচিত সুকুম্ভিতে চেইনশপ সেভেন ইলেভেনের ভেতরে হাঁটু গেড়ে একটি পণ্য দেখছিলাম। খুব মনোযোগের মধ্যেও স্পষ্ট ইংরেজিতে কথাগুলো শুনেই ঘাড় ঘুরিয়ে নিলাম।

বাংলাদেশে যেতে চান একজন পর্যটক, এতো দারুণ ব্যাপার। তবে জোব্বা পরা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো নাগরিকের মতো নন তিনি। রীতিমতো প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোক, টিকালো নাক কিছুটা ইরানিদের মতো ভাব এনেছে চেহারায়। মুগ্ধ হয়ে বললাম, ‘তুমি বাংলাদেশে গেলেই সেখানে বাংলাদেশি টাকা দেখতে পাবে। এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই’।

তবে তিনি নাছোড়বান্দা। কথায় বিশ্বাস না করে বললেন- ‘প্লিজ, তোমার ব্যাগে দেখো না, দু’একটি নোট থাকতেও পারে!’

এবার আমি সত্যিই তার জেদের কাছে হেরে কিছুটা আগ্রহ নিয়েই টাকার ব্যাগটা খুললাম। কারণ, আমি জানি, সেখানে একপাশে সদ্য ডলার ভাঙানো মোটা অঙ্কের বাথ(থাই মুদ্রা) রয়েছে, অন্যপাশে কিছু টাকাও রয়েছে।

ভদ্রলোক বলতে থাকলেন, ‘আমি আর আমার স্ত্রী ঘুরতে এসেছি। বাংলাদেশের নাম খুব শুনেছি। থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশও নাকি খুব সুন্দর দেশ’।

রীতিমত মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আমার থাইল্যান্ড ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল- প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ডে আয়োজিত বাংলাদেশ এক্সপো কাভার করা। যার একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং। তখনও সে অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। তার আগেই বাংলাদেশে যেতে চাইছেন এক দম্পতি! তাদের সঙ্গে টাকা চিনিয়ে দেওয়ার মতো ভদ্রতা করাই যায়।

ভদ্রলোক বাংলাদেশে ডলারের মূল্য কতো সেটাও জেনে নিলেন। খুশি হয়ে বললেন, ‘বাহ, নিশ্চয়ই অনেক শপিং করা যাবে’। আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই’।
এবার হাতে থাকা টাকার ব্যাগটি খুললাম। ব্যাগের যে পাশে থাই মুদ্রা রয়েছে, সে পাশটি চেপে ধরে অপর পাশ থেকে ২০ টাকার একটি নোট বের করে তাকে দেখালাম।

লোকটি বেশ কাছে ঘেষে দাঁড়ালেন। এবার তার হাত চলে গেলো আমার টাকার ব্যাগে। আর সেটি ব্যাগে থাকা টাকার নোটগুলোতে নয়, মোটা ভাজের বাথের দিকে। মুহূর্তেই আরো শক্ত করে বাথগুলো চেপে ধরলাম। বিষ্ময় আর ক্রোধে তাকালাম সেই আগন্তুকের দিকে।

এবার ‘নো প্রবলেম, নো প্রবলেম’- বলেই সোজা সেভেন ইলেভেন থেকে বের হয়ে গেলেন তিনি।

লোকটার উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করতে পেরে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আবার কেন জানি মনে হচ্ছিল- হতেও পারে তিনি বাংলাদেশে যাবেন।

দোকান থেকে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে বের হলেও ওই ঘটনা মাথা থেকে সরছিল না- কি ছিল তার উদ্দেশ্য!

উত্তর মিললো কয়েকদিন পর। ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এক্সপো ২০১৬’– এর শেষ দিনে থাইল্যান্ডে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আলাপকালে শোনা গেলো এর বিস্তারিত।

আরব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ট্যুরিস্ট পরিচয় দিয়ে এভাবেই থাইল্যান্ডে আসা সাধারণ ট্যুরিস্টদের কাছ থেকে ডলার ও স্থানীয় মুদ্রা ছিনিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। তারা সাধারণত ইরানের নাগরিক বলেই স্থানীয়দের ধারণা।

তাদের খপ্পরে পড়া একাধিকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তারা কখনো একা থাকেন না। একজন নারী ও একজন পুরুষ একটি দলে থাকেন। নিজেদেরকে একই পরিবারের সদস্য বোঝাতে কখনো কখনো একটি বা দু’টি করে বাচ্চাও সঙ্গে রাখেন তারা। এরপর সুযোগ বুঝে কোনো ট্যুরিস্টকে একা পেলেই কাছে গিয়ে ডলার কিংবা বাথ কিংবা তার নিজে দেশের মুদ্রা দেখতে চান। ব্যাগ-মানিব্যাগ বের করতেই কোনো এক ফাঁকে আগুল গলিয়ে চোখের সামনে থেকেই ডলার কিংবা বাথ হাওয়া করে দেন তারা। অদ্ভূত এই কৌশলী লোকগুলোর দেখা বেশি মেলে থাইল্যান্ডের সুকুম্ভিভ এলাকায়।

ব্যাংককে বসবাসকারী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মো. রহিম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটকরা সাধারণত ধনী হন। তাছাড়া মুসলিম হওয়ায় তাদের প্রতি বাংলাদেশিদের এক ধরনের সহানুভূতি রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশি পর্যটকরাই তাদের খপ্পরে পড়েন বেশি। চোখের সামনে থেকেই ডলার-বাথ হাতিয়ে নেন, অথচ টেরও পাওয়া যায় না। অদ্ভূত সব কৌশল জানেন তারা। আর পরে বুঝতে পারলেও কিছু করার থাকে না। কারণ, ডলার বা বাথ হাতিয়ে ওই এলাকায় আর থাকেন না তারা। আর ট্যুরিস্টরাও দু’চারদিনের বেশি ব্যাংককে থাকেন না’।

থাইল্যান্ডের একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সাপ্লিমেন্ট সম্পাদক সিম্থ পি বলেন, ‘ব্যাংককে পর্যটকদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা খুব বিরল। তবে এখন এ ধরনের কিছু ঘটনা শুনছি। আশা করি, থাই কর্তৃপক্ষ শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’।

থাইল্যান্ড প্রবাসী অন্য বাংলাদেশিরাও বাংলাদেশি পর্যটকদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

মো. রহিম বলেন, ‘এভাবে কেউ যদি টাকা, বাথ বা ডলার দেখতে চান, তাহলে যেন কেউ তা না দেখান। কিংবা তাদের কথায় গলে না যান’।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.