যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জীবনের গান

USAঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটা। অনুষ্ঠানস্থল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস রাজ্যের উইচিটা শহরের ইসলামিক সোসাইটি মসজিদ অডিটোরিয়াম। ৮ ফেব্রুয়ারি রোববার। অডিটোরিয়ামে অভিভাবক ও আয়োজকদের অপেক্ষা। হুট করে একঝাঁক তরুণ-তরুণী এসে ঢুকলেন অডিটোরিয়ামে। এঁরা সবাই উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। সবার চোখে-মুখে বিজয়ের হাসি। কেউ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শেষ করতে যাচ্ছেন, কেউবা মাস্টার্স শেষ করে শেষ হাসির অপেক্ষায়। উপস্থিত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর সবাই প্রকৌশলী হতে বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছেন।
এস এম ওয়ালিয়ুল ইসলাম মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সব শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানান। ক্যানসাস রাজ্যের উইচিটা শহরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই প্রথম অনুষ্ঠান। এখানে কোনো পদের ব্যাপার ছিল না। আয়োজকদের অনেকেই চেনেন না। ফেসবুকে নিমন্ত্রণ। সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল কথা বলা। প্রথমে পরিচয় পর্ব। একেক করে সবার পরিচয় শেষ হলো। এরপর অভিভাবকদের পক্ষ থেকে মুনির খান বলেন, ‘আমরা এখানে ২০-২৫ বছর পরিবার পরিজন নিয়ে আছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা পারিবারিক বন্ধনে বেড়ে উঠছে নিজেদের মতো করে। আমরা চাই বাংলার ঐতিহ্য বুকে নিয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বেড়ে উঠুক। বিদেশের মাটিতে ছেলেমেয়েদের একে অপরকে চেনা-জানা, ভাবের আদান-প্রদান বড় বিষয়। পড়ালেখা শেষ করে ব্যস্ত কর্মজীবনে পরিবার ও সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার জন্যই এ আয়োজন। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ছাত্র সমিতির সভাপতি মিরু গ্রেনভাড বললেন, আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স মিলে উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৫ জন। এঁদের অধিকাংশ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্রছাত্রী। মিরু ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে এসে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছেন। বর্তমানে গ্র্যাজুয়েশনের অপেক্ষায়। তিনি জানান, পড়ালেখা শেষে চাকরির সুযোগ থাকায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশ ছাত্র আসেন। উইচটা হলো ক্যানসাস রাজ্যের সাতটি সিটির একটি। আমেরিকার ৪৯ টি বড় শহরের মধ্যে উইচিটা একটি ছোট্ট শহর। এ শহরকে বলা হয় পৃথিবীর উড়োজাহাজের রাজধানী ৷ এ শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক উড়োজাহাজ তৈরির কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সেসনা, লিয়ারজেড, স্পিরিট অ্যারোসিস্টেম, বিচ ক্রাফট, টেক্সট্রোরন এভিয়েশন অন্যতম কোম্পানি। পড়ালেখা শেষে এসব কোম্পানিতে ইন্টার্নি করার সুযোগ রয়েছে। গবেষণা করারও যথেষ্ট সুযোগ আছে। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল দেশীয় আদলে ঝাল গরুর মাংসসহ মজাদার খাবার। নেপথ্যে থেকে এ আয়োজনে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন তাঁরা হলেন মাহবুব-উর-রহমান, তাজউদ্দিন ভুইয়া, রাশেদুল বারী সরকার, নাজমূল কবির, ওবায়দুর রহমান, মুস্তাফিজুর রহমান, ফাহিম উদ্দিন। এঁরা সবাই চান বিদেশের মাটিতে পড়ালেখা করে ছেলেমেয়েরা যেন নৈতিক মানে উত্তীর্ণ একজন মানুষ হতে পারেন।উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ শিক্ষার্থীরা
আমেরিকায় ৫০ টি রাজ্য (স্টেট)। একেক রাজ্যের বৈশিষ্ট্য একেক রকম। এটা যেকোনো পর্যটককে আকর্ষণ করে। ক্যানসাস তার মধ্যে অন্যতম। এ রাজ্যের ছোট্ট এ শহরে রয়েছে পৃথিবীর প্রথম পিৎজা হাট রেস্তোরাঁ। ১৮৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এর অবস্থান উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির সবুজ ক্যাম্পাসের এক কোনায়। শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে ঠিক আগের অবয়বে দাঁড়িয়ে রয়েছে পিৎজা হাট। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে এ রেস্টুরেন্ট। এ শহরের পশ্চিমে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম চিড়িয়াখানা। এখানে বেশ আরাম আয়াসে রয়েছে বাংলার রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এ শহরটি আয়তনে ঢাকার দ্বিগুণ। লোকসংখ্যা মাত্র চার লাখ। শান্ত-শুভ্র শহরটি বছরের তিন মাস (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) বরফে ঢাকা থাকে। এ সময় প্রকৃতি অন্য রূপ ধারণ করে। সাদা বরফের মেঘ যেন আকাশ ছাড়ে না।USA-2
শহরের বুক চিড়ে আরাকানসাস নদী বয়ে গেছে। বছরের নয় মাস এ নদীতে পানি থাকে না। কোনো কোনো জায়গায় কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ ধরে রাখা।
শহরের মেরুদণ্ডে আমার বসবাস। বাসা থেকে এক কিলোমিটার দূরে উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটি। প্রতিবছর ভারত-বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিতে আসেন। বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ বুয়েটের ছাত্র। যাঁরাই আসেন আর দেশে ফিরে যান না। এরা জীবনকে মানিয়ে নেন বাস্তবতার মোড়কে। এঁরা সবাই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণশক্তি নিয়ে যার পর নেই কষ্ট করে যাচ্ছেন। রাত জেগে পড়ালেখা, দিনে ক্লাস। সপ্তাহে ২ – ৩ দিন ক্লাসের ফাঁকে সেমিস্টার খরচ জোগাতে হাড়ভাঙা শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। বছর শেষে এ অর্থ কোর্স ফি হিসেবে কাজে লাগে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়ের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে এ পন্থা বেছে নেন বলে জানান একাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে আপন মননে ক্যাম্পাস গড়ে তুলছে বাংলাদেশ তরুণ-তরুণীরা। বিকেলে দেশ-কারি রেস্টুরেন্টে কিছুক্ষণের জন্য হলেও চায়ের কাপে ঝড় তুলে জম্পেশ আড্ডায় মেতে ওঠেন সবাই। পাশে এশিয়ান গ্রোসারি শপ। এশিয়া বাজার। নিত্যদিনের বাজার সারতে সপ্তাহে শনি ও রোববার এই দুই গ্রোসারি শপে বাংলাদেশসহ এশিয়ান লোকজন ভিড় জমান৷

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.