৫০ বছরে বিমানের অর্জন ২১টি আধুনিক উড়োজাহাজ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইন বিমানেরও ৫০ বছর পার হলো। লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে আধুনিক করতে সরকারের ছিল নানা প্রচেষ্টা। বহরে যোগ হয়েছে অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ, কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটও বেড়েছে। সব মিলে বিমান বহরে এখন রয়েছে ২১টি অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফট। বর্তমানে বহরে ৪টি ৭৭৭-৩০০ ইআর, ৬টি বোয়িঙ ৭৩৭-৮০০, ৬টি বোয়িঙ ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবঙ ৫টি ড্যাস ৮ কিউ ৪০০সহ মোট ২১টি উড়োজাহাজ। ২০১১ সাল থেকে বিমান বহরে যোগ হতে থাকে নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ।

১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি বিমান বাহিনীর একটি ডিসি-৩ উড়োজাহাজ দিয়ে শুরু হয় বিমানের যাত্রা। পুরো নাম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স হলেও বিমান নামেই পরিচিত হয় সবার কাছে।

যাত্রা শুরুর তিন মাসের মাথায় ৪ মার্চ ১৭৯ জন যাত্রী নিয়ে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরা ছিল বিমানের প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। ৭ মার্চ চট্টগ্রাম ও সিলেটে এবং ৯ মার্চ যশোরে ফ্লাইট চালু করে অভ্যন্তরীণ পথে যাত্রা শুরু হয়। ধারাবাহিক লোকসান থেকে উত্তরণের জন্য ২০০৭ সালে বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বিমানকে লাভজনক আর যাত্রীবান্ধব করতে সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও বিমান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কতিপয় কর্তারা হেঁটেছেন উল্টো পথে। দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে চাকরি হারিয়েছেন অনেকেই। কাউকে চাকরি শেষেও ছুটতে হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের দরজায়।

সোনা চোরাচালানে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সটির উড়োজাহাজগুলোকে এত বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যে, কাস্টমস কর্মকর্তাদের নজরদারিও এই এয়ারলাইনের ওপর বেশি। চোরাচালানে অন্যদের তুলনায় বিমানের কর্মীদের বিরুদ্ধেই মামলার সংখ্যা বেশি।

নিজস্ব জনবল দিয়ে পরিবর্তন না আসায় সরকার ফের বিমান পরিচালনার দায়িত্বে আনে আমলাদের। বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা ঘাড়ে রেখে কাগজে-কলমে মুনাফা দেখালেও সুনাম বাড়েনি প্রতিষ্ঠানটির।

২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার যাত্রীর মতামত নিয়েছে বেসরকারি অনলাইন নিউজ এজেন্সি বাংলা ট্রিবিউন। বিমান নিয়ে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা জানতে চাওয়া হয়। কয়েকজন ইতিবাচক মন্তব্য করলেও বেশিরভাগের অভিযোগ ছিল সেবার মান নিয়ে।

অভিযোগের তালিকায় আছে—কেবিন ক্রুদের খারাপ আচরণ, ফ্লাইট শিডিউল ঠিক না থাকা, খাবারের মান, লাগেজ লেফট বিহাইন্ড হওয়া, অনলাইনে টিকিট কাটার ব্যবস্থা না থাকা প্রভৃতি।

অনেকে অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে বিমানে আর ভ্রমণই করবেন না বলে ঠিক করেছেন। তাদের একজন কুয়েত প্রবাসী গাজী মিজান। তিনি জানালেন, ১৯৯১ সাল থেকে প্রবাস জীবনযাপন করছি। দেশে আসতে বিমানে ভ্রমণ সুখকর হয়নি।

মো. রাশেদ বলেন, বিমানে ভ্রমণের তেমন আগ্রহ ছিল না, যারা চড়েন তারা ভালো কথা তো বলেন না। তারপরও ২০১৯ সালের আগস্টে শখ করে নিজের দেশের এয়ারলাইনের টিকিট কিনেছিলাম। টিকিটে লেখা ছিল ননস্টপ। কিন্তু চট্টগ্রাম গিয়ে ৪৫ মিনিট দেরি করলো। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম বিমানে আর না।

দেশের ভেতর ১২টি রুটে এবং ১৯টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। সব মিলিয়ে সপ্তাহে ২৭২টি ফ্লাইট। ২১টি উড়োজাহাজ দিয়ে ২৭২টি ফ্লাইট পরিচালনা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রায় ছয় হাজার জনবল আছে বিমানের।

এত জনবল সত্ত্বেও ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হলে, বা কোনও সমস্যা হলে কাউকেই খুঁজে পান না যাত্রীরা। কল সেন্টার, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডের হটলাইন; এসব জায়গায় কাউকে পাওয়া মানে সৌভাগ্যের বিষয়—মন্তব্য যাত্রীদের।

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, প্রবাসীরা নিজের দেশে বিমানে চড়তে পছন্দ করেন। কিন্তু প্রতিদানে খারাপ ব্যবহার, বাজে সেবা ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না। টাইম শিডিউলের কথা তো সবারই জানা।

আলাউদ্দিন আরও বলেন, বিমানের হটলাইনে কল করেছি, কেউ ফোন রিসিভ করেন না। কখনও বিজি পাওয়া যায়। ইমেইল করেও কোনও উত্তর পাইনি।

গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর বিমানে ভ্রমণ করেছেন সুমন সিদ্দিক। তিনি বলেন, সিটের সামনের মনিটরগুলো কাজ করছিল না। বেশ ঠান্ডাও লাগছিল। কেবিন ক্রুকে বললাম শীত লাগছে, চাদর দিন। তারা করোনার কথা বলে চাদর দিলো না।

মোয়াজ্জেম প্রধান হৃদয় বলেন, কোনও কারণে একবার খারাপ অভিজ্ঞতা হতেই পারে। আগামীতে ভালো পাবো এই আশায় অনেকবার বিমানে ভ্রমণ করেছি। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। সময় মতো ফ্লাইট ছাড়ে না, দেরির কারণও জানায় না।

মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. মোবারক প্রধান বলেন, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় আসার জন্য বিমান বাংলাদেশের টিকিট কেটেছিলাম। ফ্লাইটটি এক ঘণ্টা লেটে ছাড়ে। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় ফেরার দিন তিন ঘণ্টা লেট করে। আমরা প্রবাসীরা সবসময়ই চাই দেশের বিমানে যেতে। কিন্তু একই ঘটনা বারবার ঘটছে।

মামুনুর রশীদ বলেন, বিমানবন্দরে আসার পর বিমান জানাচ্ছে ফ্লাইট চার ঘণ্টা পর ছাড়বে। এটা বিরক্তিকর। দেশে আসার পর বলছে, আমার একটা লাগেজ নাকি দুবাই থেকে আসেনি। ২০ দিন পর সেই লাগেজ পেলাম।

কাতার প্রবাসী বদরুল হাদি সিরাজী বলেন, ক্রুরা এমন আচরণ করেন, মনে হয় আমরা যাত্রী নই, কারাবন্দি। ২০১৯ সালে প্রথম বিমানে ভ্রমণ করি। এরপর তওবা করেছি আর যেন বিমানে উঠতে না হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক গ্যারান্টি নিয়ে উড়োজাহাজ কেনে বিমান। বিমানের গ্রাউন্ড, ফ্লাইট সার্ভিস ও কারিগরি বিভাগের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে রয়েছে নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সাভারের গণকবাড়ি এলাকার প্রায় ৭৫ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে বিমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্স। দিনে সাড়ে আট হাজার মিল তৈরির সক্ষমতা আছে বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি)। রয়েছে নিজস্ব যানবাহন মেরামত কেন্দ্র ও ছাপাখানা। করোনা মহামারির সময় সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় হাজার কোটি টাকা ঋণ সুবিধাও পেয়েছে বিমান।

যারা সম্প্রতি ভ্রমণ করেছেন তাদের অনেকে অবশ্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন। কুয়েত প্রবাসী কামাল আহমেদ বলেন, বিমানে কুয়েত থেকে চট্টগ্রাম গিয়েছি। ঢাকা হয়ে কুয়েত ফিরে এসেছি। আগের চেয়ে ভালো মনে হলো। তবে খাবারের মান আরেকটু ভালো করা দরকার।

বিমানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সালেহ মোস্তফা কামাল  বলেন, যাত্রীদের অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। এগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। আমাদের কাজ দিয়ে যাত্রীদের আস্থা অর্জন করতে হবে।

তথ্য সুত্র-বাংলাটিব্রিউন

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.