দেশীয় এয়ারলাইনসের বিকাশে বাধা সরকারি নীতি, জ্বালানির দাম

দেশের অভ্যন্তরে আকাশপথে যাত্রীসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে সরকারি নীতি ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, আশানুরূপ বিকাশ হচ্ছে না বেসরকারি খাতের বিমান সংস্থাগুলোর।

এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ কর এবং বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সারচার্জ এবং রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে ‘অস্বাভাবিক’ প্রতিযোগিতা—মূলত এই চার কারণে বেসরকারি খাতের বিকাশ হচ্ছে না।

দেশে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিলে ১০টি বিমানবন্দর আছে। এর মধ্যে ৮টি বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং বেসরকারি সংস্থা ইউএস–বাংলা, নভোএয়ার এবং এয়ার এস্ট্র্যা। এর মধ্যে এয়ার এস্ট্র্যায় গত ২৪ নভেম্বর থেকে যাত্রীসেবা শুরু করেছে।

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশসহ চারটি সংস্থা প্রতিদিন গড়ে ১৪০টি (যাওয়া-আসা মিলে) ফ্লাইট পরিচালনা করে। এর মধ্যে নভোএয়ার ৩৮টি (বরিশাল ছাড়া অন্যান্য রুটে), ইউএস–বাংলার ৫৬ টি, এয়ার এস্ট্র্যার ১৬টি (কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম) এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৩০টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
বেসরকারি সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে ২০১৩ সালে যাত্রীসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৫ হাজার। এরপর প্রতিবছরই তা বাড়তে থাকে। করোনার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে অভ্যন্তরীণ পথে যাত্রীসংখ্যা ২৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৫০-এ পৌঁছায়। পরের দুই বছর করোনার কারণে যাত্রীসংখ্যা কিছুটা কমে।

গত বছর করোনার আতঙ্কের মধ্যেও ২৪ লাখ ৫২ হাজার ১৩২ জন যাত্রী আকাশপথে ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ভ্রমণ করেন বেসরকারি সংস্থার ফ্লাইটে। বাকি ২০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করেছে বিমান বাংলাদেশ।

বেসরকারি সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন  বলেন, বাংলাদেশে আকাশপথে যাত্রী পরিবহন খুবই সম্ভাবনাময় একটি খাত। তবে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্যসহ নানা প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে এই সম্ভাবনাকে আশানুরূপভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা সম্ভব হলে আরও অনেক মানুষ আকাশপথে যাতায়াত করতেন। যাত্রীসেবার মান আরও ভালো হতো। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ‘এভিয়েশন হাবে’ পরিণত হতে পারত।

এমনই প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল দিবস। ১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেওয়া সিদ্ধান্তে অনুযায়ী প্রতিবছর ৭ ডিসেম্বর এই দিবসটি পালিত হয়।

দুই বছরে জ্বালানির দাম বেড়েছে ১৭২ শতাংশ
এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয়ের ৪০-৪৬ শতাংশই যায় জ্বালানি তেলের (জেট ফুয়েল) পেছনে। বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের একমাত্র সরবরাহকারী পদ্মা অয়েল কোম্পানি। এই কোম্পানি আবার একই জ্বালানি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য দুই রকম দামে বিক্রি করে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য এক লিটার জেট ফুয়েল কিনতে ১২৫ টাকা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য এক লিটার ফুয়েল কিনতে শূন্য দশমিক ৯৬ মার্কিন ডলার (প্রায় ১০০ টাকা) গুনতে হয়। একই জ্বালানি দুই ধরনের দামে বিক্রি করাকে বৈষম্যমূলক হিসেবে দেখছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা।

এ ছাড়া গত দুই বছরে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে হু হু করে। ২০২০ সালের অক্টোবরে এক লিটার জেট ফুয়েলের (অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য) দাম ছিল ৪৬ টাকা। ২০২১ সালের অক্টোবর নাগাদ এটি বেড়ে হয় ৭০ টাকা। গত অক্টোবরে ছিল ১৩০ টাকা। এখন ৫ টাকা কমে হয়েছে ১২৫ টাকা।

নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের দাম বেশি। জ্বালানি তেলের এমন উচ্চমূল্যের কারণে তাঁদের ফ্লাইট পরিচালনা করতে গিয়ে বড় অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারণ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যাত্রীভাড়া সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। ২০১৯ সালে যাত্রীভাড়া যেমন ছিল, এখনো তেমনই রাখা হয়েছে।

কিন্তু লোকসান থেকে বাঁচতে যাত্রীভাড়া অন্তত ১০০ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।
যাত্রীভাড়া কেন সমন্বয় করা হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে নভোএয়ারের এমডি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ভাড়া না বাড়ানোর কারণে তারাও পূর্বের ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর আশঙ্কা, এমন অবস্থা চলতে থাকলে এভিয়েশন খাত সামনে এগোতে পারবে না।

 

 

যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ কর

বেসরকারিভাবে এয়ারলাইনসের বিকাশের ক্ষেত্রে আরেকটি অন্যতম বাধা হচ্ছে উচ্চ কর হার। উড়োজাহাজ সচল রাখতে নিয়মিত এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়।

রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তবে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানি ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। আবার কোনো যন্ত্রাংশ মেরামতের প্রয়োজন হলে সেটিও দেশের বাইরে পাঠাতে হয়। মেরামত শেষে একই যন্ত্র আবার দেশে ফেরত আনতেও কর দিতে হয়। এ ছাড়া কাস্টমস থেকে পণ্য ছাড় করতেও দীর্ঘ সময় লাগে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খাতটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের আমদানি নীতিতে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। আমদানির প্রক্রিয়াটি এয়ারলাইনস শিল্পের মতো অগ্রসরমাণ খাতের জন্য সহনীয় নয়।
বেবিচকের সারচার্জ বেশি
বেসরকারি খাতে উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যবহার ও সুবিধা গ্রহণের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ফি হিসেবে দিতে হয়। যথাসময়ে এই ফি পরিশোধ না করলে প্রতি মাসে ৬ শতাংশ ও বছরে ৭২ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়, যা কিনা বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বেশি।

বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভরতে বার্ষিক সারচার্জ ১২-১৮ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে মাত্র ৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১২ শতাংশ, ওমানে ১০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে মাত্র ২ শতাংশ। পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে আরোপিত সারচার্জ ৮৩ ভাগের বেশি।

সারচার্জ যৌক্তিক হারে নির্ধারণের দাবিতে গত ১২ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীকে একটি চিঠি দিয়েছে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)। যদিও এখন পর্যন্ত অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা
আকাশপথ ছাড়া অন্য পথে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে সরকার সব পরিবহনের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু আকাশপথে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা নেই। সংস্থাগুলো নিজেরাই ইচ্ছেমতো ভাড়া নির্ধারণ করে থাকে। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কারণে ভাড়া বাড়াতে পারছে না অন্য বেসরকারি সংস্থাগুলো। এওএবির দাবি, অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ভর্তুকি দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ।

এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বললেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো ভাড়া বাড়ালে যাত্রী পায় না, আবার ভাড়া কমালে লোকসানের বোঝা টানতে পারে না। ফলে একসময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় থাকে এয়ারলাইনস। উদাহরণ হিসেবে বন্ধ হওয়া জিএমজি এয়ারলাইনসের কথা বলা যায়। ২০০২-২০০৪ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম আকাশপথে বিমান বাংলাদেশের ভাড়া ছিল ২ হাজার ৮০০ টাকা। আর জিএমজির ভাড়া ছিল চার হাজার টাকা। এরপর বিমান ভাড়া কমিয়ে করে ২ হাজার ৫০০ টাকা। পরে সরকারি হস্তক্ষেপে বিমানের ভাড়া ৩ হাজার ৩০০ করা হয়। তখন জিএমজির ভাড়া নির্ধারণ করে ৩ হাজার ৯০০ টাকা।

ভর্তুকি দিয়ে যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী ভাড়া ঠিক করি, ভর্তুকি দিয়ে যাত্রী পরিবহন করি না। আমাদের গন্তব্যস্থল বেশি, ওদের (বেসরকারি সংস্থা) কম। আমরা ২৭টি গন্তব্যকে বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া ঠিক করি। তাই আমাদের ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতিই আলাদা।’

 

বন্ধ ৮ এয়ারলাইনস

দেশের বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম চালু হওয়া প্রথম এয়ারলাইনস ছিল অ্যারো বেঙ্গল। ১৯৯৭ সালে যাত্রী পরিবহন শুরু করে এই এয়ারলাইনস। পরের বছরই এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৯৮ সালে এয়ার পারাবত ও জিএমজি এয়ারলাইনস চালু হয়। জিএমজি ২০১২ সালে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়—এয়ার পারাবাতের আয়ু ছিল দুই বছর। ২০০৭ সালে চালু হওয়া রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইনস, ২০০৮ সালে চালু হওয়া বেস্ট এয়ার এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়। ২০০৭ সালে চালু হওয়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ব্যবসা করে ৯ বছর। এয়ার বাংলাদেশ নামে আরেকটি সংস্থা অনুমোদন পেয়েও যাত্রাই শুরু করতে পারেনি। সর্বশেষ বন্ধ হওয়া সংস্থাটি হচ্ছে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। ২০১০ সালে চালু হওয়া সংস্থাটি টিকে ছিল এক দশক।

এ সম্পর্কে এয়ার এস্ট্র্যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান আসিফ বলেন, বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু করার পর সেবার সার্বিক মান বজায় রাখতে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। এ জন্য দক্ষ জনশক্তি ও বিনিয়োগের প্রয়োজন। এই দুটির অভাব এবং জ্বালানি তেলের দামসহ নীতিগত অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো টিকে থাকতে পারে না। একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারির পর দেশের এভিয়েশন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

এখন সঠিক বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নীতিগত দিক দিয়ে উন্নতি করতে হবে। না হলে এভিয়েশন খাত যে জায়গায় আছে, সেখান থেকে উন্নতি হবে না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, জ্বালানি দাম অত্যধিক বেড়েছে। যন্ত্রাংশ আমদানিতেও কর বেশি। জ্বালানির দাম ও আমদানি কর কমানোর চেষ্টা চলছে। বেবিচকের সারচার্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে ফি না দিলেই এই সমস্যা হয়। ফি যথাসময়ে দিলে এ নিয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.