পামির মালভূমিতে চালু হলো নতুন বিমানবন্দর

এই শীত্কালে পামির মালভূমিতে চালু হয়েছে নতুন একটি বিমানবন্দর। গত ২৩ ডিসেম্বর চালু হয়েছে সিনচিয়াং ট্যাক্সকোরগান হংকিরাব বিমানবন্দর। এটা চীনের সবচেয়ে পশ্চিমের বিমানবন্দর। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি মোট ৩২৫৮ মিটার উঁচু মালভূমিতে অবস্থিত। ধারাবাহিক তুষার পর্বত এবং গিরিখাতে অবস্থিত বলে এর নির্মাণ অনেক কঠিন ছিল। ট্যাক্সকোরগান জেলা আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও তাজিখস্তান এ তিনটি দেশের সীমান্তে অবস্থিত যা প্রাচীন রেশম পথের গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসায়ী করিডোর। ফলে এ বিমানবন্দর বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে।

 

ডিসেম্বর মাসে পামির মালভূমি হয়ে উঠে তুষার ও বরফের দুনিয়া। পাহাড়ের মধ্যে ট্যাক্সকোরগান বিমানবন্দরকে দেখতে ঈগলের মতো লাগে। ট্যাক্সকোরগান জেলার পিল্য গ্রামের বাসিন্দা শওদয় জঙ্গীবিক জানিয়েছেন, তাজিখ ভাষায় পিল্য মানে কাঠের বাটি কারণ গ্রাম থেকে দেখলে চারপাশের পাহাড়কে বাটির মতো লাগে। পাহাড় যেন গ্রামকে ঘিরে রেখেছে। আগে তারা কখনও ভাবেন নি যে তাদের বাসার কাছাকাছি বিমানবন্দর হবে। চীনের একমাত্র তাজিখ স্বায়ত্তশাসিত জেলা হিসেবে ট্যাক্সকোরগানে ৩০ হাজারের বেশি তাজিখ জাতির মানুষেরা খুনলুন পাহাড়ের নীচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। ঈগল তাদের পোষ্য। তবে, হাজার হাজার বছর ধরে তারা একের পর এক পাহাড়ের জালে আটকে পড়ে আছে, যা আরোহণ করতে পারে না।

 

চব্বিশ বছর বয়সী শওদয় জঙ্গীবিক জানিয়েছেন, ছোট বেলায় জেলায় স্কুলে যেতে তার নদী ও ক্লিফ অতিক্রম করে তিন-চার দিন লেগে যেতো। তখন তার একমাত্র প্রত্যাশা ছিল স্কুলে যেতে একটি ভাল রাস্তা হবে। এক সময় ইয়াক, উট ছিল স্থানীয়দের মূল পরিবহন যন্ত্র। তবে, দারিদ্রবিমোচন কার্যক্রম এ অবস্থাকে পরিবর্তন করেছে। সিপিসির অষ্টাদশ জাতীয় কংগ্রেসের পর সরকার যথাক্রমে ১০০ কোটি ইউয়ান বিনিয়োগ করে স্থানীয় অঞ্চলে রাস্তা নির্মাণ শুরু করে। ২০১৩ সালে পিল্য গ্রামে চালু হয় ডামার রাস্তা এবং ২০১৮ সালে পাহাড়ের ধারা অনুযায়ী নির্মিত রাস্তা বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়। ইউ আকারের এ রাস্তার সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন জায়গার মধ্যে উচ্চতার পার্থক্য ১০০০ মিটারের বেশি এবং ৩০ কিলোমিটারের এ রাস্তায় রয়েছে ৬০০টি এস আকারের বাঁক। ত্রয়োদশতম পাচঁসালা পরিকল্পনা চলাকালে ট্যাক্সকোরগান জেলায় নতুন করে নির্মিত হয় ১৫২৭ কিলোমিটার রাস্তা এবং ১২টি উপজেলার ৪৫টি গ্রামে চালু হয়েছে ডামার রাস্তা।

 

এবার বিমানবন্দরও চালু হয়েছে। মোট ১৭০০ কিলোমিটার দূরে উরুমুছি এমনকি বেইজিং ও শাংহাই স্থানীয়দের জন্য আর এত দূর হবে না।

 

ট্যাক্সকোরগান উইগুর ভাষায় মানে পাথরের নগর। ছোট বা বড় অংসখ্যা পাথরের মধ্যে একটি বিমানবন্দর নির্মাণ কোনভাবেই সহজ কাজ না।

 

২০২০ সালে শুরু হয় বিমানবন্দরের নির্মাণ কাজ। এটা সিনচিয়াংয়ের সবচেয়ে উঁচু একটি বিমানবন্দর। চার হাজার মিটার গড় উচ্চতার মালভূমিতে বিমানবন্দর নির্মাণ অনেক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তা ছাড়া, স্থানীয় আবাহাওয়ার কারণে প্রতিবছর মাত্র ৬ মাস নির্মাণ কাজ করা যায়। প্রচুর ঠাণ্ডা ও অক্সিজেনের অভাব ছাড়া, বাতাসেরও সমস্যা রয়েছে। তীব্র বাতাসে পাথর উড়িয়ে দেওয়া যায়। কাশগর শহর থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ট্যাক্সকোরগান জেলা। কাশগর থেকে যন্ত্র, ব্যক্তি, গাড়ি ট্যাক্সকোরগান জেলায় নিতে হয়। তাই নির্মাণ দলকে অনেক আগ থেকে পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়, নির্মাণ সময়ের আগে সবকিছু ট্যাক্সকোরগানে পৌঁছাতে হয়।

বিমানবন্দর নির্মাণ স্থলে মাঝে মাঝে স্থানীয়দের দেখা যায়। ২০২০ সালের শরত কালে নির্মাণ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দায়িত্বশীল ব্যক্তি শতাধিক কর্মী নিয়ে নির্মাণ স্থল পরিদর্শন করতে যান। তবে, এক ঘণ্টার মধ্যে সবার উচ্চতা অসুস্থতার কারণে জ্বর বা বমি হয়। তারা যদি স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারেন তাহলে কীভাবে বিমানবন্দর নির্মাণ করবেন? এ সময়ে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা কাছে এসে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ম্যান্ডারিন দিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। জানতে চান, আপনারা কী করছেন? তখন বিমানবন্দর নির্মাণের কথা শুনে স্থানীয়রা তাদেরকে সাহায্য করতে চান। কেউ কেউ তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন, কেউ কেউ উচ্চতা অসুস্থা মোকাবিলার উপায় শিখিয়ে দেন এমনকি কেউ কেউ সরাসরি কংক্রিট পরিবহনের কাজ করেন। স্থানীয়দের উদ্দীপনা আমাদের দেখায় যে তারা এই বিমানবন্দরের জন্য কতটা উন্মুখ ছিলেন।

দু’বছরে ১৬০ কোটি ইউয়ান ব্যয়ে এবং ৪০০০ জন নির্মাণ কর্মী দিয়ে ২০২২ সালে বিমানবন্দরের নির্মাণ সময় মতো শেষ হয়। সিনচিয়াংয়ে নির্মিত হয় চীনের বৃহত্তম আওতার ও সবচেয়ে বেশি শাখা রুটের বিমানবন্দর নেটওয়ার্ক। বিমানবন্দরের সংখ্যা ২০১২ সালের ১৭টি থেকে বেড়ে ২০২২ সালের ২৫টিতে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক ১ লাখ বর্গকিলোমিটারে ১.৫টি বিমানবন্দর রয়েছে সেখানে।

ট্যাক্সকোরগান বিমানবন্দর স্থানীয় পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সাহায়তা প্রদান করে এবং গাড়ি ভাড়াসহ নানা ব্যবসাও দ্রুত প্রসার হচ্ছে। বিয়াল্লিশ বছর বয়সী সেনবি লিবিক ২০১৯ সালে সরকারের উদ্যগে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর পারিবারিক হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। চলতি বছরের জুলাই ও অগাস্ট এ দু’মাসে তার আয় ছিল ৩০ হাজার ইউয়ান। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ট্যাক্সকোরগান জেলায় ভ্রমণ করতে আসে ৬ লাখ ৯৮ হাজারের বেশি মানুষ এবং পর্যটন আয় হয় ৩৭.২ কোটি ইউয়ান।

পাশাপাশি, ট্যাক্সকোরগান একটি সীমান্ত জেলা। পঁচিশ হাজার বর্গকিলোমটার এ ভূমিতে রয়েছে দুটি জাতীয় প্রথম শ্রেণীর বৈদেশিক উন্মুক্তকরণ বন্দর এবং কারাসু বন্দর হল চীন ও তাজিখস্তানের মধ্যে একমাত্র স্থল বন্দর। বিমানবন্দর এ স্থল বন্দরের উন্নয়নে নতুন প্রাণশক্তি যোগায়। ট্যাক্সকোরগান জেলা হল রেশমপথ অর্থনৈতিক এলাকা ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এবং চীন-মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি সংযোগস্থল।

ব্যক্তি, পণ্য, তথ্য আরও দ্রুত ও সুবিধাজনকভাবে আদান-প্রদান করা হচ্ছে এখানে এবং পাহাড়ের গ্রামে বিশাল পরিবর্তন ঘটছে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.