মালয়েশিয়ায় প্রফেশনাল ভিসায় গিয়ে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন

malaysia-visaমালয়েশিয়ায় প্রফেশনাল ভিসায় (ডিপি-১০) পাড়ি জমানো কর্মীদের মধ্যে অনেকেই এখন নানা সমস্যার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে পাসপোর্ট জটিলতার কারণে অনেকেই লুকিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ পুলিশি হয়রানি সহ্য করতে না পেরে হাইকমিশন থেকে ‘স্পেশাল পাস’ নিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরছেন। তারপরও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে দক্ষ শ্রমিকের নাম ব্যবহার করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘অদক্ষ’ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিনিময়ে দুই দেশে থাকা দালালচক্র এটিকে পুঁজি করেই হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার বাসিন্দা ইয়াসিন শেখ দালালের খপ্পরে পড়ে জমি জমা বিক্রি করে প্রফেশনাল ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়েই বিপদে পড়েন। ভালোভাবে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে গেলেও ইয়াসিনের সেই স্বপ্ন অল্প কয়েক দিনের মধ্যে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। অবশেষে দালালের কাছ থেকে পাসপোর্ট উদ্ধার করতে না পেরে ইয়াসিন পুলিশি গ্রেফতার এড়াতে বাধ্য হয়ে গত ১৭ আগস্ট স্পেশাল পাস নিয়ে দেশে ফেরত আসেন।
শুধু ইয়াসিন শেখ প্রফেশনাল ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে বিপদে পড়েছেন তা কিন্তু নয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়ার পরও এখনো অনেকে দেশটিতে গিয়ে কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।
১০ মাস আগে ফকিরাপুল পানির ট্যাংকিসংলগ্ন একটি রিক্রুটিং এজেন্সির দালাল পারভেজের মাধ্যমে চার লাখ টাকার বিনিময়ে প্রফেশনাল ভিসায় পাড়ি জমান খুলনা ডুমুরিয়া এলাকার বাসিন্দা কৃষক ফারুক হোসেন। বর্তমানে তিনি জহুরবারুর একটি মার্কেটে প্রতিদিন ৪০ রিংগিট বেতনে কাজ করছেন। প্রতিদিন তাকে পুলিশি আতঙ্ক নিয়ে ওই শপিং সেন্টারে কাজ করতে হচ্ছে বলে তিনি গতকাল রাতে বলেন, এই ভিসা নিয়ে যারাই এ দেশে আসছেন, তাদের অনেকেই কমবেশি পাসপোর্টসহ নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন।
ফারুকের ভাষ্যমতে, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি দালালের কাছ থেকে তিনি তার ভিসার স্টিকার লাগানো পাসপোর্টটি উদ্ধার করতে পারেননি। বারবার মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশী দালালের কাছে পাসপোর্টের জন্য ফোন করলেও দালাল তাকে ঘুরিয়ে অবশেষে বলে দিয়েছে ১০ হাজার রিংগিট দিলেই তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হবে। নতুবা আর টেলিফোন করার দরকার নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ফারুক বলেন, পাসপোর্ট সমস্যা থেকে উদ্ধার হতে আমি জহুরবারু থেকে ৩০ রিংগিট খরচ করে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়েছিলাম; কিন্তু সেখানকার কর্মকর্তারা রাগারাগি করে আমাকে বলেন, তুমি এই ভিসায় আসছো কেন? তাদের কাছ থেকে কোনো সমাধান না পেয়ে জহুরবারু চলে আসি। এখন একটি শপিং সেন্টারে প্রতিদিন ৪০ রিংগিট বেতনে কাজ করছি। পাসপোর্ট না থাকার কারণে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশি আতঙ্কের মধ্যে আমার প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে। ধরা পড়লে পুলিশকে এক হাজার রিংগিট দিয়েই ছাড়া পেতে হয়। তাই ভয়ে থাকি কখন না ধরা পড়ে যাই? খুলনায় কী কাজ করতেন জানতে চাইলে ফারুক হোসেন বলেন, ক্ষেতখামারের কাজ করতাম; কিন্তু চার লাখ টাকা খরচ করে এসেছি। তাই কষ্ট হলেও এখানে এসে পড়ে আছি। তার দাবি, প্রফেশনাল ভিসার নামে যারাই এসেছে তাদের মধ্যে অনেকেই কমবেশি নানা সমস্যার মধ্যে আছে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, এখন নতুন করে যারা আসতে চাইছেন তারা যেন খোঁজখবর নিয়ে তারপরে আসেন।
এদিকে মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে জনশক্তি রফতানি বন্ধ থাকলেও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ৩০ হাজার ৩২১ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় যেতে বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে চলতি মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত গিয়েছে তিন হাজার ৬৭১ জন।
গতকাল জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার একাধিক সদস্য নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, মালয়েশিয়ার ডিপি-১০ ভিসায় যারা যাচ্ছে তাদের সবাই যে খারাপ আছে তা কিন্তু বলা যাবে না। যেসব কোম্পানির নাম-নিশানা নেই, ওই সব ভিসার কর্মীরাই মালয়েশিয়ায় বিপদের মধ্যে আছে। কাজ পাচ্ছে না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। দালালেরা কর্মীর হাতে পাসপোর্ট না দিয়েই পালিয়ে যাচ্ছে। এমন অভিযোগ এনে অনেক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনে অভিযোগও করেছেন।
বায়রার সদস্যদের মধ্যে আবার কেউ কেউ বলছেন, প্রফেশনাল ভিসা হচ্ছে ডাক্তার, নার্স, প্রকৌশলীসহ দক্ষ শ্রমিকদের জন্য। তারা বলেন, কিন্তু আসলে প্রফেশনাল ভিসায় কারা যাচ্ছে সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত মন্ত্রণালয়ের গঠিত টাস্কফোর্সের। তারপরও যদি এই ভিসার নামে অদক্ষ কর্মীরা দেশটিতে যেতে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া সরকার দক্ষ কর্মীদের জন্য চালু করা প্রফেশনাল (ডিপি-১০) ভিসাও বন্ধ করে দিতে পারে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.