বিপর্যয়ের মুখে পাসপোর্ট

mrp-passport-toiry-koraযন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রকল্পের দরপত্র সিডিউলে বড় ধরনের দুটি ভুল করায় এখন সরকারকে চরম খেসারত দিতে হচ্ছে। সফটওয়্যারের ক্যাপাসিটি অনেক কম রাখা এবং সোর্স কোডের স্বত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বে ছেড়ে দেয়ায় গুনতে হচ্ছে বড় অংকের অর্থদণ্ড। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ভয়াবহ এ অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। বিপদের এখানেই শেষ নয়, পাসপোর্ট অধিদফতর থেকে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, শিগগিরই সফটওয়্যারটি আপগ্রেডেশন করা না হলে পাসপোর্ট প্রিন্টিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এর সমাধানও সহসা হবে না। এর ফলে দেশে- বিদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা সোর্স কোড কিনতে হলে সরকারকে ৭শ’ কোটি টাকা গুনতে হবে। এ অবস্থায় সংকট নিরসনের উপায় খুঁজতে সম্প্রতি একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি করার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা  বলেন, ভয়াবহ বিপর্যয়মুখী এ চুক্তির দায় তৎকালীন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এড়াতে পারেন না।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমরা আশা করছি খারাপ কিছু হওয়ার আগেই সমস্যার সমাধান করা যাবে। এজন্য সাময়িকভাবে বিদ্যমান সফটওয়্যার আপগ্রেড করে কাজ চালিয়ে নেয়া হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কিছুদিন পর ই-পাসপোর্ট প্রকল্প শুরু হবে। তখন সম্পূর্ণ নতুন সফটওয়্যার কেনা হবে। অর্থায়ন থেকে শুরু করে কোথাও কোনো বিদেশীনির্ভরতা রাখা হবে না। একই সঙ্গে বর্তমান চুক্তির ক্ষেত্রে যেসব ত্র“টি-বিচ্যুতি ছিল তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করব।’ এদিকে সূত্র বলছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এখন যে সেবা নেয়া হচ্ছে সেজন্য বাড়তি মোটা অংকের টাকা দিতে হচ্ছে বা হবে। যদিও সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ বিষয়ে  তথ্য দিতে চাননি। কিন্তু বাস্তবতা হল, গত বছর জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রায় এক সপ্তাহ পাসপোর্ট নবায়ন, নতুন পাসপোর্ট প্রদান ও ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মূলত তখনই সবার টনক নড়ে। দেখা যায়, ইচ্ছা করলেও পাসপোর্ট অধিদফতর তার কার্যক্রম চালাতে পারছে না। কেননা, সার্ভারের সব ব্যাকআপ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইরিশ জেভির হাতে। এরপর চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটির বিষয়গুলো ধরা পড়ে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে সরকার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় যায়।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট ও ভিসা (এমআরপি ও এমআরভি) প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য আইরিশ জেভি নামের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। ২০১০ সলের ১৭ ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত চুক্তির আওতায় আইরিশের কাছ থেকে আবেদনকারীর আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণের জন্য এফিস (অটোমেটিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম) সফটওয়্যার কেনা হয়। একই ব্যক্তি যাতে একাধিক পাসপোর্ট নিতে না পারেন সেজন্য ‘চেকব্যাক ব্যবস্থা’ হিসেবে এ স্বয়ংক্রিয় আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ সিস্টেমটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু চুক্তির গোড়ায় বড় ধরনের গলদ থেকে যায়। কারণ চুক্তিটি করা হয় মাত্র এক কোটি তথ্য প্রসেসের জন্য। ফলে এক কোটির বেশি তথ্য আপলোড হওয়ার পর সিস্টেমটি আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। বর্তমানে সফটওয়্যারটিতে প্রায় দেড় কোটি তথ্য আপলোড করা হয়েছে, যা তার ক্যাপাসিটির বাইরে। দুটি বড় ত্রুটির মধ্যে এটি একটি। অবশ্য বিষয়টি নজরে আসে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। কেননা আপগ্রেডেশন ছাড়া এর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়। আর আপগ্রেডেশন করতে হলে মোটা অংকের টাকা গুনতে হবে।

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রথমদিকে এফিস সফটওয়্যারের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে সার্ভারে রক্ষিত তথ্য যাচাই করা যেত। এক কোটি তথ্য যাচাই করতে সময় লাগত সর্বোচ্চ ৫ সেকেণ্ড। তখন দিনে গড়ে ২২ হাজার পাসপোর্ট প্রিন্ট করা সম্ভব হতো। কিন্তু সিস্টেমে এক কোটির বেশি তথ্য আপলোড হওয়ার পর সফটওয়্যারের তথ্য যাচাইয় ক্ষমতা ও গতি কমে যায়। বর্তমানে এ সফটওয়্যারের তথ্য যাচাই ক্ষমতা ১০০ পাসপোর্টে নেমে এসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অল্প দিনের মধ্যেই কয়েক লাখ পাসপোর্ট আবেদন পেন্ডিং পড়ে থাকবে। তখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ও অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক রুটিন কাজও করা যাচ্ছে না। আবার আইরিশের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সিস্টেমে ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নানা অনুনয়-বিনয় করে কোনোমতে কাজ চালাতে হচ্ছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা  বলেন, ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি ও সোর্স কোড না নেয়ার কারণে পাসপোর্ট অধিদফতর পুরোটাই আইরিশের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সময় এভাবে ভুল হতে পারে তা তারা চিন্তাও করতে পারছেন না। আবার প্রকাশ্যে কিছু বলতেও পারছেন না। কেননা, এটি শুধু মন্ত্রণালয় নয়, সরকারের জন্যও বিব্রতকর। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি দুদকের নজরে এলে নির্ঘাত মামলার মুখোমুখি হতে হবে।

সূত্রটি জানায়, আইরিশের সঙ্গে চুক্তির সময় দরপত্রে সোর্স কোড সংক্রান্ত শর্ত উল্লেখ ছিল না। ফলে তারা সোর্স কোড সরবরাহ করেনি। এখন সোর্স কোড কিনতে হলে অন্তত ৭শ’ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমান বস্তবতায় সেটি এখন সম্ভব নয়। তাই বর্তমানে অন্তত তিন কোটি তথ্য যাচাইয়ের উপযোগী হিসাবে বিদ্যমান সিস্টেম আপগ্রেড করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পরে যথাযথ সময়ে নতুন সফটওয়্যার কেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। উল্লিখিত টাকার অংকের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পাসপোর্ট অধিদফতরের চিঠিতে বলা আছে।

প্রকল্পটির নানা সংকট ও সমাধানের উপায় তুলে ধরে ২৮ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর একটি চিঠি আসে পাসপোর্ট অধিদফতর থেকে। অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফজলুল হক স্বাক্ষরিত চিঠিতে নানা উদ্বেগের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। এর একস্থানে বলা হয়, ‘শিগগিরই সফটওয়্যারটি আপগ্রেডেশন করা না হলে পাসপোর্ট প্রিন্টিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। যা স্বল্প সময়ে সমাধানযোগ্য নয়। এর ফলে দেশে-বিদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়বে।’

এর আগে ২৭ জুন পাঠানো পরিচালক শিহাব উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘আইরিশের সফটওয়্যার বাদ দিয়ে এখনই নতুন সফটওয়্যার স্থাপন করতে গেলে পাসপোর্ট প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকি তাদের সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের জন্য অন্য কোনো কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ আইরিশের প্রযুক্তির সঙ্গে অন্য কোম্পানির প্রযুক্তি নাও মিলতে পারে।’

এদিকে পাসপোর্ট নিয়ে এই যখন অবস্থা তখন দ্রুত সমাধানের উপায় খুঁজতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হেদায়েত উল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে ২১ সেপ্টেম্বর সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান  বলেন, পাসপোর্ট প্রিন্টিং বন্ধ হয়ে যাবে এমন ভয় পেয়ে অহেতুক সরকারি অর্থের অপচয় করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আসলে কোন সিদ্ধান্তটি যথোপযুক্ত হবে তা নির্ধারণের জন্য গঠিত কমিটি কাজ করছে। কমিটির মতামত পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ রেজোয়ান বলেন, সংকট উত্তরণের জন্য যথাসময়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত কর হয়। আমরা এখন মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত দেবে ততই মঙ্গল।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.