পরাস্ত হলে ফল মানবেন না ট্রাম্প?

65355f3cf8b97e457731459103231556-untitled-22বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় বিতর্কে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী না হলে সে ফলাফল তিনি না-ও মেনে নিতে পারেন। এ ব্যাপারে তাঁকে দ্বিতীয়বার সরাসরি প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাদের রহস্যের মধ্যে রাখব।’
বিতর্কের পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার ওহাইও অঙ্গরাজ্যে এক সমাবেশেও ট্রাম্প কিছুটা ঘুরিয়ে প্রায় একই কথা বলেছেন। সেখানে তিনি বলেন, ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে ‘বিজয়ী হলে’ তিনি ফলাফল মেনে নেবেন। ফলাফল যদি ‘সুস্পষ্ট’ হয় তাহলে এ নিয়ে আপত্তি করবেন না। তবে ফল প্রশ্নবিদ্ধ হলে তা চ্যালেঞ্জ করার অধিকার তাঁর আছে।
লাসভেগাসে ইউনিভার্সিটি অব নেভাডায় গত বুধবার অনুষ্ঠিত দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর মধ্যে তৃতীয় বিতর্কের সঞ্চালক ফক্স নিউজের ক্রিস ওয়ালেস শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বর্ণনা করেন। ফল মেনে নেওয়া বিষয়ে ট্রাম্পের জবাবে তিনি এতটা বিস্মিত হয়েছিলেন যে তাঁকে ভুল শোধরানোর সুযোগ দিতে দ্বিতীয়বার একই প্রশ্ন করেন।

জাতীয় পর্যায়ে জনমত জরিপে ক্রমেই পিছিয়ে পড়া ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ ধরে দাবি করে আসছেন, মার্কিন নির্বাচনব্যবস্থা পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত। বলছেন, ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে কারচুপির মাধ্যমে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য দেশটির তথ্যমাধ্যম ও বৃহৎ পুঁজি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

এই তৃতীয় বিতর্ক ট্রাম্পের জন্য ছিল নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকার শেষ সুযোগ। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন, তাঁর সে মেজাজ বা টেম্পারামেন্ট নেই—প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন এই কথা বারবার বলে আসছেন। ট্রাম্পের রিপাবলিকান সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, শেষ বিতর্কে ভালো করে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন ও নির্বাচনী লড়াইয়ে ফিরে আসবেন। বস্তুত বিতর্কের প্রথম ২০-২৫ মিনিট তিনি হিলারির সঙ্গে সমানে সমান পা মিলিয়ে চলছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার কথা বলে শেষ মুহূর্তে সব গুবলেট করে ফেলেন।

আগের দুটি বিতর্কের মতো এটিও ছিল অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে পূর্ণ। বিতর্কের প্রথম মুহূর্ত থেকেই দুই প্রার্থী আক্রমণে নেমে পড়েন। ট্রাম্প হিলারিকে মিথ্যাবাদী, অসৎ ও প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য বলে চিহ্নিত করেন। হিলারি বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বারবার বাধা দেন ও ‘ভুল’ বলে ফোড়ন কাটেন। হিলারি অভিজ্ঞ—এ কথা মেনে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, অভিজ্ঞ হলে কী হবে, তাঁর সব কাজ ছিল ভুলে ভরা। একপর্যায়ে তিনি হিলারির কথার মাঝে বলে ওঠেন, ‘কী জঘন্য মহিলা’!

আর হিলারি শুরু থেকেই সব রকম উত্তেজনা এড়াতে সতর্কভাবে অগ্রসর হন। দৃশ্যত তাঁর লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প যে প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য, সে কথা প্রতিষ্ঠিত করা। নারীঘটিত কেলেঙ্কারির জন্য তাঁকে খোঁচা দিয়ে তিরস্কারের ভঙ্গিতে হিলারি বলেন, ‘ডোনাল্ডের ধারণা, নারীদের ছোট করতে পারলে তিনি নিজে খুব বড় হয়ে যাবেন। আমরা জানি তিনি নারীদের বিষয়ে কী ভাবেন এবং নারীদের প্রতি কী আচরণ করেন। এটাই তাঁর চরিত্র।’

.জবাবে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘নারীদের প্রতি আমার চেয়ে বেশি সম্মান কেউ করে না।’
ট্রাম্পের ওই কথায় বিতর্কের নিয়ম ভেঙে উপস্থিত দর্শকেরা সরবে হেসে ওঠেন। এই দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন। সুপ্রিম কোর্টে কী ধরনের বিচারপতির মনোনয়ন তাঁরা দেবেন, সে প্রশ্নে হিলারি স্পষ্টভাবে জানান, তিনি চান দেশের এই সর্বোচ্চ আদালত আমেরিকার মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে, নারীর গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করবে ও নির্বাচনে অবাধ অর্থের প্রবাহ ঠেকাবে।
হিলারি নারীর গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করে বলেন, গর্ভপাত করা না-করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নারী ও তাঁর পরিবারের নিজস্ব সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেন, তিনি এমন বিচারপতিদের মনোনয়ন দেবেন, যাঁরা দেশের শাসনতন্ত্র কঠোরভাবে মেনে চলবেন। ট্রাম্প নিজেকে গর্ভপাতবিরোধী হিসেবে বর্ণনা করে অভিযোগ করেন, হিলারি গর্ভধারণের নয় মাস পরও শিশুকে মায়ের পেট কেটে বের করে আনতে রাজি আছেন। ট্রাম্প মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, প্রতিটি নাগরিকের অস্ত্র বহনের অধিকারকে তিনি দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। একই প্রশ্নে হিলারি বলেন, অস্ত্র বহনের যে অধিকার দ্বিতীয় সংশোধনীতে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা রক্ষায় তিনিও বদ্ধপরিকর। কিন্তু এ কথাও বিশ্বাস করেন, আগ্নেয়াস্ত্রে ব্যাপক প্রাণহানি ঠেকাতে অস্ত্র আইন সংশোধন করা দরকার।
আগের দুটি বিতর্কের মতো এবারও অভিবাসন প্রশ্নে তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণান। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হিলারি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত চিহ্ন তুলে দিয়ে লাখ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে আশ্রয় দিতে চান। কিন্তু তিনি অবৈধ অভিবাসীদের দেশছাড়া করবেন।
পক্ষান্তরে হিলারি বলেন, তিনি ব্যাপক বহিষ্কার সমর্থন করেন না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণে উদ্যোগী হবেন।
ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গ উঠলে হিলারি বলেন, এই ফাউন্ডেশনের তোলা সব অর্থের ৯০ শতাংশ এইডস ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে ব্যয় করা হয়। অন্যদিকে, ট্রাম্প ফাউন্ডেশন সেবার নাম করে যে অর্থ তুলেছে, ট্রাম্প তা দিয়ে নিজের ছয় ফুট লম্বা ছবি বানিয়েছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বিতর্কের বিষয় না হলেও তিনি একাধিকবার হিলারি-ট্রাম্পের বাগ্‌যুদ্ধের কেন্দ্রে চলে আসেন। মস্কো মার্কিন নির্বাচনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের লক্ষ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিরুদ্ধে সাইবার আক্রমণে লিপ্ত—এই অভিযোগ তুলে হিলারি বলেন, রুশ একনায়ক পুতিন চান ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হোন, কারণ ট্রাম্প হবেন মস্কোর হাতের একটি পুতুল। সে কথায় ফোড়ন কেটে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি নই, হিলারিই হবেন পুতুল।’
বিতর্কে কে জিতলেন?
বিতর্কের পরপর সিএনএনের নেওয়া এক জরিপে ৫২ শতাংশ দর্শক হিলারি বিজয়ী বলে মত দেন। ৩৯ শতাংশ দর্শকের চোখে ট্রাম্প বিজয়ী। দেশের তিন প্রধান দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস হিলারিকেই জয়ী ঘোষণা করে। ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, এটি ছিল ট্রাম্পের সেরা বিতর্ক। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল মানবেন না, তাঁর এই ঘোষণা ছিল ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক। নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে ট্রাম্পের বক্তব্য ‘গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ’ বলে মন্তব্য করা হয়।

অনেক রক্ষণশীল ভাষ্যকারও হিলারিকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ন্যাশনাল রিভিউর অন্যতম সম্পাদক মিশেল মালকিন দুঃখ করে লেখেন, পরপর তিনটি বিতর্কে রক্ষণশীলদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একজন প্রার্থী হিলারির হাতে পরাস্ত হলেন। এটি খুবই হৃদয়বিদারক।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.