যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও কি কারচুপি হয়?

352fb754d70a2251dbce9e21002ad39d-untitled-2যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, সম্ভাব্য ভোট কারচুপির অভিযোগ ততই বাড়ছে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, তাঁকে পরাজিত করার ষড়যন্ত্র হিসেবেই ভোট কারচুপির আয়োজন চলছে। ভোটের ফলাফল সম্বন্ধে তিনি এতটাই নিশ্চিত যে নিজে জয়ী না হলে ফল মানবেন না।
রোববার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে ট্রাম্প নতুন করে কারচুপির অভিযোগ তুললেন। কয়েক হাজার উল্লসিত কর্মী-সমর্থকের দিকে তাকিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, শুধু কারচুপির মাধ্যমেই তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব। উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার ফ্লোরিডায় আগাম ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে।
নির্বাচনে যে ভোট কারচুপি হবেই, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ট্রাম্প দেখাতে পারেননি। তিনি বারবার পিউ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চলতি ভোটার তালিকায় প্রায় ১৮ লাখ মৃত মানুষের নাম রয়েছে। হিলারি ক্লিনটন ও ডেমোক্রেটিক পার্টি এসব মৃত মানুষের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ভোট দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।

ভোটার তালিকায় যে মৃত মানুষের নাম রয়েছে সে কথা মিথ্যা নয়। কিন্তু এসব মানুষের নাম ব্যবহার করে জাল ভোট দেওয়া হয়েছে, পিউ রিসার্চ তার গবেষণায় কখনো সে কথা বলেনি। বস্তুত তাদের এই গবেষণার মূল উপসংহার ছিল দেশের অঙ্গরাজ্যগুলোর উচিত হবে ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার ব্যাপারে আরও মনোযোগ দেওয়া।

লয়োলা ল স্কুলের জাস্টিন লেভিট ভোট কারচুপির প্রশ্নে তাঁর এক নতুন গবেষণায় বলেছেন, ২০০০ ও ২০১৪ সালের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে যে লাখ লাখ ভোট পড়ে, তার মধ্যে মাত্র ৩১টি জাল ভোটের প্রমাণ মিলেছে।

একই উপসংহারে পৌঁছেছে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেনন সেন্টার। তারা জানিয়েছে ভোট কারচুপি নয়, বরং ভোটার তালিকায় নাম না ওঠায় ভোট দিতে না পারা দেশটির নির্বাচনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ত্রুটি। ভোটার তালিকার অনেকের মৃত্যু বা ঠিকানা বদল হয়েছে। সময়মতো সংশোধন না হওয়ায় তাঁদের নাম এলাকার তালিকায় রয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এ বিষয়ে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক স্টিভেন রোমালেভস্কির সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিনিধির কথা হয়েছে। রোমালেভস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ভোট কারচুপি হয় না, সে কথা তিনি জোর দিয়ে বলতে পারেন না, কিন্তু সত্যি সত্যি কারচুপি হয়েছে, এমন প্রমাণও কার্যত নেই। ভুল নামে ভোট দেওয়া হতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ অন্য নামে ভোট দিয়েছেন, তার প্রমাণ নেই। পেনসিলভানিয়ায় এ নিয়ে রিপাবলিকান পার্টি দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু এক হাতের আঙুলে গোনা যায় মাত্র এমন কয়েকটি ভুল ভোটের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তা-ও সেগুলো ভোট চুরির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে, সে কথা প্রমাণিত হয়নি।

অধ্যাপক রোমালেভস্কি বলেন, ভোট কারচুপি যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতি ভোটকেন্দ্রে তিনজন পরিদর্শক নিয়োগ করতে পারে। তাদের নজর এড়িয়ে জাল ভোট দেওয়া খুব সহজ নয়।

অধ্যাপক রোমালেভস্কি উল্লেখ করেন, তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যেসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান পার্টি ও ট্রাম্প কারচুপির ভয় করছেন, তার অধিকাংশই রিপাবলিকান দলের নিয়ন্ত্রণে। রাজ্য সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট সত্যায়িত না করা পর্যন্ত ভোটের ফলাফল চূড়ান্ত হয় না। তিনি বলেন, নিজেদের প্রার্থীর বিরুদ্ধে রিপাবলিকানরা নিজেরাই কাজ করবে, এমন অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়।

এ কথা জানা সত্ত্বেও রিপাবলিকান পার্টি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলছেন? নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা জানিয়েছে, নির্বাচনী কৌশল হিসেবে রিপাবলিকান পার্টি অনেক আগে থেকেই এই অভিযোগ করে আসছে। ১৯৯৩ সালে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি সহজ করার জন্য কথিত মোটর ভোটার আইন পাস করা হয়। এই আইন অনুসারে, যেকোনো ব্যক্তি নিজের পরিচয় প্রমাণের মাধ্যমে যানবাহন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রেও নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। তখন থেকেই রিপাবলিকান পার্টি এই আইনের সমালোচনায় বলে আসছে, ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়া এত সহজ যে অনায়াসেই কারচুপি করা সম্ভব।

পিউ রিসার্চের ডেভিড বেকার (যাঁর গবেষণা ব্যবহার করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোট কারচুপির অভিযোগ এনেছেন) বলেছেন, ভোট প্রদানে কারচুপি নয়, ভোটার তালিকার নবায়ন প্রক্রিয়া ও ভোটের সময় ব্যবহৃত মেশিনে ত্রুটিই আসল সমস্যা। বেকার জানান, যে গবেষণাটি উদ্ধৃত করে ট্রাম্প কারচুপির অভিযোগ এনেছেন, সেটি ২০১২ সালের উপাত্তের ভিত্তিতে করা।

ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা মনে করেন, রিপাবলিকানদের ভোট কারচুপির অভিযোগের লক্ষ্য দেশের দরিদ্র ভোটারদের কাছ থেকে তাদের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়া। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব দরিদ্র ভোটার ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সরকারের উদ্যোগে ভোটার আইডি তৈরি ও বিলি করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সে দায়িত্ব নাগরিকের নিজের। দেশের ১৬টি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত আইনসভা গত দুই দশকে ছবিসহ ভোটার পরিচয়পত্র বহন ধরনের এমন সব আইন প্রণয়ন করেছে, যা নিম্ন আয়ের ভোটারদের অনেককে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। বৃদ্ধ, গ্রামাঞ্চলে বাস করেন অথবা দরিদ্র, এমন অনেক নাগরিক সময়মতো ‘ফটো আইডি’ সংগ্রহ করতে পারেন না।

ডেমোক্র্যাটদের এ অভিযোগ সমর্থন করে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লোরেইন মিনিট নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘ভোট কারচুপি নয়, ভোটাধিকার হরণচেষ্টাই আমাদের প্রধান সমস্যা।’

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.