ট্রাম্পের বাজেটের খাঁড়ার ঘা গরিবের ওপরেই

1207a2c0b4124c3f689d8f5cac9f002e-58c9a897c05b0যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ২০১৮ সালের বাজেটের একটি রূপরেখা প্রকাশ করেছেন। এটি চূড়ান্ত বাজেট নয়, একটি নীলনকশা মাত্র। কংগ্রেসে আলাপ-আলোচনার পরেই আগামী বছরের ব্যয় বরাদ্দ চূড়ান্ত হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোন কোন বিষয়কে তাঁর অগ্রাধিকার বিবেচনা করেন, এই রূপরেখা থেকে তার একটা মোদ্দা চেহারা মেলে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বাজেটে তিনটি ছাড়া প্রায় সব খাতেই কমবেশি কাটছাঁট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কাটা গেছে পরিবেশ সংরক্ষণ খাত, যা নিয়ে বিজ্ঞানী মহল, পরিবেশবাদী ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য শিকারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বারাক ওবামার সময়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতাবৃদ্ধি রোধের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। সেই খাতের ওপরেই ট্রাম্প প্রশাসনের কোপদৃষ্টি পড়েছে সবচেয়ে বেশি। তারপরেই পররাষ্ট্র দপ্তর। এ দপ্তরের বাজেট থেকেই জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় চাঁদা, অনুদান অথবা বৈদেশিক অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া হয়ে থাকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, এমনকি গৃহায়ণ খাতের ব্যয় কমছে। এসব করে যে অর্থ বাঁচবে, তার সবচেয়ে বড় অংশ যাবে সামরিক খাত ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে। ট্রাম্প এক সামরিক খাতেই অতিরিক্ত ৫৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বরাদ্দ প্রস্তাব করেছেন। চলতি সামরিক বাজেটের তুলনায় তা ৯ শতাংশ বেশি।
এই বাজেটে সবচেয়ে ক্ষতি হবে তাঁদের, যাঁদের ভোটে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ দরিদ্র, বয়স্ক অথবা গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা। গৃহহীনদের সমস্যা দেখার আন্তএজেন্সি বাতিল করার প্রস্তাব করেছেন ট্রাম্প। নিম্নবিত্তদের সাহায্য করার ব্লক গ্র্যান্ট কর্মসূচিও পুরো বাতিল হচ্ছে। থাকছে না বিত্তহীন তরুণ ও যুবকদের প্রশিক্ষণের ‘জব কোর’ কর্মসূচি। আরও বাদ যাবে প্রসূতি ও শিশুদের পুষ্টি সাহায্য কর্মসূচি। যদিও এগুলোর কোনোটাই খুব বড় খরচ নয়।
হোয়াইট হাউসের বাজেট-বিষয়ক পরিচালক মিক মুলভানির দাবি, এটি ‘হার্ড-পাওয়ার বাজেট’। তিনি বলেছেন, কম অগ্রাধিকারের কর্মসূচি বাদ দিয়ে বা ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে আর্থিকভাবে অধিক দায়িত্বসম্পন্ন একটি বাজেট উপহার দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।
তবে হোয়াইট হাউসের এই মূল্যায়নের সঙ্গে সবাই একমত হবে বলে মনে হয় না। সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের উপপ্রধান অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজেট প্রস্তাবে ঠিক উল্টোটি করেছেন।
তবে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পররাষ্ট্র দপ্তরের বাজেট কাটছাঁট নিয়ে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প পরিবেশ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত চলতি বিধিনিষেধ বাদ দেওয়ার নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশ্নে গত বছরে সম্পাদিত প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত পর্যন্ত ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র দপ্তরের বাজেট প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাটা পড়ায় জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে ও শান্তিরক্ষা বাজেটে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যে অর্থনৈতিক সাহায্য যুক্তরাষ্ট্র এত দিন দিয়ে আসছে, তাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হবে। এর ফলে খুব বড় কোনো সংকট দেখা না দিলেও পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হয়তো হ্রাস পাবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন এই বাজেট হ্রাসের প্রস্তাব সমর্থন করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এত দিন অনেক করেছে, এখন সময় এসেছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানো। তিনি দৃশ্যত ভুলে গেছেন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তাদাতা হিসেবে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান এখন ২৭তম।
কংগ্রেসের বিরোধী ডেমোক্রেটিক সদস্যরা তো বটেই, কোনো কোনো রিপাবলিকান সদস্যও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই বাজেট প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, চাকরি, শিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণার মতো খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে কোটি কোটি ডলার সামরিক খাতে ঢালার ফলে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরও দুর্বল হবে।
এই বাজেট থেকে (পাস হোক আর না-ই হোক) একটা বিষয় স্পষ্ট। ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন যে নেতৃত্বের দাবিদার ছিল, ট্রাম্প সেখান থেকে সত্যিই সরে আসছেন। অভিষেকের দিন ভাষণেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষা, সারা বিশ্বের দেখভাল করা নয়।
যুক্তরাষ্ট্র যদি তৃতীয় বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরানো বন্ধ করে, অথবা দুর্নীতিবাজ ও অগণতান্ত্রিক দেশের ওপর ছাতা ধরে রাখার নীতি বদলায়, তা সুখবর বলেই বিবেচিত হবে। তবে ট্রাম্প সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করেছেন, তার জবাবে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীন প্রায় নিশ্চিতভাবেই এ খাতে সমপরিমাণ বা বেশি অর্থ বরাদ্দ করবে। এর ফলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়বে।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.