এয়ারক্রাফট কেনার টাকা রি-ফাইনান্সিংয়ের জন্য কঠিন শর্তে ঋণ নিচ্ছে বিমান

Biman20170128165714রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিতে কঠিন শর্তে ঋণ নিচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার টাকা পরিশোধে এ চড়া সুদের ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে সংস্থাটি। প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ দিতে রাজি হলেও পরবর্তী সময়ে সরে যায়। এরপর অন্য উৎস থেকে অর্থ নিয়ে বোয়িংয়ের অর্থ তাৎক্ষনিক পরিশোধ করা হয়। এখন ওই টাকা পুনঃঅর্থায়নের (রি-ফাইনান্স) জন্য কঠিন শর্তে ঋণ নিতে হচ্ছে। গত ১০ মার্চ ছিল ওই টাকা পরিশোধের সর্বশেষ মেয়াদ। এ ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ না থাকায় ঋণের ব্যাপারে আংশিক অনুমোদন দিয়েছে সরকারের অনমনীয় ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটি।

ঋণ গ্রহণের জন্য তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। সব কটি প্রস্তাবের শর্তই কঠিন। তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে দুটিতে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতির বাস্তবতায় একটিতে সম্মতি দিলেও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। গত ২ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কঠিন শর্তের ঋণের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব (ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা)। কমিটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেÑ সভায় অনুমোদিত ঋণের অতিরিক্ত অর্থের জরুরি প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অল্প ব্যয়ে অর্থায়ন করতে। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী এবং অনমনীয় ঋণবিষয়ক কমিটির (স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন) সভাপতি আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে ১৮তম সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিন ক্যাটাগারিতে ঋণ নেওয়ার প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিনিয়র কমার্শিয়াল লোন ফর ফার্স্ট এয়ারক্রাফট এবং জুনিয়র কমার্শিয়াল লোন ফর ফার্স্ট অ্যান্ড সেকেন্ড এয়ারক্রাফট শীর্ষক প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়েছে। অনুমোদন মিলেছে দ্য টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকের সিনিয়র এক্স-আইএম ব্যাকড ফাইন্যান্সিং ফর সেকেন্ড এয়ারক্রাফট শীর্ষক প্রস্তাবটি।

তিনটি পৃথক শর্তের ঋণের সর্বশেষ আর্থিক শর্তাবলী অনুযায়ী এবং বর্তমান তিন মাসের লাইবর (১.০৩৮৪%) বিবেচনায় গড় গ্রান্ট এলিমেন্ট হয় ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে দ্য টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকের ঋণের একক গ্রান্ট এলিমেন্ট ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। গ্রান্ট এলিমেন্ট ৩৫ শতাংশের কম হওয়ায় ঋণটি নন-কনসেশনাল (অনমনীয়) হিসেবে বিবেচিত। তাই প্রস্তাবটি এ সভায় উত্থাপন করতে হয়।

বৈঠকে প্রথমেই বিমানের জন্য বোয়িং থেকে দুটি এয়ারক্রাফট কেনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, কানাডার মারিয়ানা (প্রাইভেট) লিমিটেডের ঋণ দিতে দিয়ে অপারগতার বিষয়টি। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিমানের স্বাক্ষরিত টার্মশিট বাতিল করা হয় বিমান পরিচালনা পর্ষদের ১৭১তম বোর্ড সভায়। এর আগেই বোয়িংকে ওই টাকা পরিশোধ করতে হয় সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়ে। আর সোনালী ব্যাংকের ৫২ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার ফেরতের বাধ্যবাধকতা ছিল এ বছরের ১০ মার্চ। ২০১৪ সালের ১০ মার্চ নেওয়া ওই টাকা পরিশোধে এর আগে সময় বাড়ানো হয় দুই দফা। তাই সোনালী ব্যাংকের ৫২ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার ও অন্যান্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ৯ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার ঋণ ফেরত প্রদান, বিমানের নিজস্ব ফান্ড থেকে দেওয়া ৪০ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলার অর্থের সংস্থান এবং এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের জন্য এককালীন ফিসহ ১১২ মিলিয়ন ডলার রি-ফাইনানন্সিংয়ে গত বছরের ২১ এপ্রিল আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) ইস্যু করে বিমান। এরপর দরপত্র মূল্যায়নে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এবং কানাডার দ্য টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয় গত ২ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিমানের ১৭১তম বোর্ডসভায়। এরপর ঋণের প্রস্তাবিত শর্ত শিথিল করতে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটি গত ১১ ও ১৯ জানুয়ারি বৈঠক করে। দর কষাকষির পর নতুন টার্মশিট দেওয়া হয়। এরপর তা সরকারের অনমনীয় ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভায় উত্থাপিত হয়।

বৈঠকে প্রস্তাবিত ঋণের উচ্চহারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প সহজ শর্তে আর কোনো উৎস থেকে ঋণ নেওয়া যায় কিনাÑ তা খতিয়ে দেখার কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এ সময় বিমানের এমডি জানান, বোয়িং থেকে ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ দুটির অর্থায়নের জন্য কানাডার মারিয়ানা লিমিটেড টাকা দেয়নি। তাই তাদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত টার্মশিট বাতিল হওয়ার পর বিকল্প ব্যবস্থায় অর্থায়ন করে উড়োজাহাজ দুটি নেওয়া হয়। আর বোয়িংকে বিকল্প ব্যবস্থায় পরিশোধিত রি-ফাইনান্সিংয়ের জন্য এ ঋণ নেওয়া হচ্ছে। ১০ মার্চের মধ্যে ওই অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি তুলে ধরেন বিমানের এমডি। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও অতিরিক্ত সচিব (ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা) বলেন, ঋণের শর্ত অনেক কঠিন। এ সুদের হার ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। এ ধরনের উচ্চহারের ঋণ গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা উচিত বলেও তারা মত দেন।

বৈঠকে এ নিয়ে জোর আপত্তি এলে বিমান সচিব ঋণটির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বলেন, ৩টি পৃথক ঋণ প্রস্তাবের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অর্থায়ন প্রস্তাব দুটির শর্ত কঠিন হলেও টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ৪৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলারের সিনিয়র এক্স-আইএম ব্যাক্ড্ ফাইনান্সিং প্রস্তাবটির শর্ত তুলনামূলক সহনীয়। তাই কমিটির কাছে সম্পূর্ণ ঋণ প্রস্তাবটি উচ্চহারের শর্তের কারণে অনুমোদনযোগ্য মনে না হলে কেবল আংশিকভাবে টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকের ৪৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবটি অনুমোদন করতে অনুরোধ করেন বিমান সচিব। প্রস্তাবিত ঋণটি আংশিক অনুমোদনে জটিলতা আছে কিনা তখন জানতে চান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এ সময় বিমানের এমডি বলেন, ৩টি পৃথক ঋণের জন্য আরএফপি ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে ২টি ঋণের অর্থায়ন করবে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এবং সিনিয়র এক্স-আইএম ব্যাকড ফাইনানন্সিংয়ের জন্য ৪৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার দেবে টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংক। ফলে প্রস্তাবের আংশিক ঋণ গ্রহণে কোনো সমস্যা হবে না। এরপর বর্তমান প্রয়োজন বিবেচনা করে শুধু টরোন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকের সিনিয়র এক্স-আইএম ব্যাকড ফাইনানন্সিং ৪৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন দেয় কমিটি। আর স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিনিয়র কমার্শিয়াল লোন ৪৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং জুনিয়র কমার্শিয়াল লোন ২১ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন দেয়নি কমিটি। এজন্য জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লো কস্টে অর্থায়নের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিমানের এমডি এএম মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, এয়ারক্রাফট কেনার টাকা রি-ফাইনান্সিংয়ের জন্য বৈঠকে উত্থাপন করা হয়। সেখানে ঋণ নেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্রঃ আমাদের সময়

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.