বৈধ কলের সংখ্যা কমায় দেড় বছরে সরকারের ক্ষতি দুই হাজার কোটি টাকা

1491847228বিদেশ থেকে আসা বৈধ কলের সংখ্যা কমেই চলেছে। পাশাপাশি কমছে সরকারের রাজস্বও। অথচ যারা বিদেশ থেকে এই কল আনছেন তাদের আয় কমছে না। গত দেড় বছরে সরকার অন্তত দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে বিদেশ থেকে কল আনছে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে বা আইজিডাব্লিউ কোম্পানিগুলো। কিন্তু সেই বেশি টাকার রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। কোম্পানিগুলো নিজেরাই অতিরিক্ত টাকা লুটে নিচ্ছে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের দেওয়া এক হিসেবে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। বিদেশ থেকে আনা কলের রেট সরকার দেড় সেন্ট (এক টাকা ২০ পয়সা) নির্ধারণ করে দিলেও অপারেটররা আনছে দুই সেন্ট (এক টাকা ৬০ পয়সা) করে। কিন্তু অতিরিক্ত যে টাকা আইজিডাব্লিউ কোম্পানিগুলো আয় করছে তার রাজস্বও পাচ্ছে না সরকার। সবার চোখের সামনে এই অনিয়ম দিনের পর দিন চললেও কেউ এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

অ্যামটবের এক হিসেবে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু এ খাতে সরকারের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা। আর কলসংখ্যা কমে যাওয়া এবং আয়ের ভাগ না পাওয়ায় আরও দেড় হাজার কোটি টাকা আয়ের সুযোগ হারিয়েছে সরকার। সব মিলিয়ে এ খাত থেকে গত দেড় বছরে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

আন্তর্জাতিক কল রেট পুনর্নির্ধারণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অ্যামটবের দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি বৈধ পথে আন্তর্জাতিক কলসংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। ফলে অবৈধ পথে কলসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ কয়েকদিন আগে আলাপকালে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক কল রেট পুনর্নির্ধারণে বিটিআরসি কাজ করছে। সেটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা এমন একটা প্রস্তাব তৈরি করছি সেটা বাস্তবায়ন হলে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না।’

অ্যামটব হিসেব করে দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক কল ব্যবসা থেকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির জন্য দায়ী প্রধানত দু’টি বিষয়। একটি হলো কল টার্মিনেশন রেট দেড় সেন্ট থেকে বাড়িয়ে দুই সেন্ট করায় বৈধ পথে কলসংখ্যা ৪৬ শতাংশ কমে যাওয়া। অ্যামটবের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত দেশে বৈধ পথে আসা দৈনিক কলের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৩৬ লাখ মিনিট। তখন কল টার্মিনেশন রেট ছিল দেড় সেন্ট। কল রেট বাড়িয়ে দুই সেন্ট করার পর বৈধ পথে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে কল এসেছে ৬ কোটি ৬৩ লাখ কোটি মিনিট।

এই হিসেবেই দেখা যাচ্ছে কলের পরিমান অর্ধেকে নেমে এসেছে। কলসংখ্যা কমায় প্রতি মাসে ৫২ কোটি টাকা হিসাবে ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেড় বছরে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা।

সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আরেকটি কারণ হলো, কল রেট দশমিক ৫ সেন্ট বৃদ্ধির ফলে যে বাড়তি আয় হয়েছে, তার ভাগ না পাওয়া। নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আসা প্রতি এক মিনিট কল থেকে যে আয় হয়, তার ৪০ শতাংশ সরকার, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ আইসিএক্স (ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ), ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মোবাইল ফোন অপারেটর আর বাকি ২০ শতাংশ আইজিডব্লিউ কোম্পানিগুলো পেয়ে থাকে। প্রতি মিনিটে ৪০ পয়সা হিসাবে ১৮ মাসে কমপক্ষে দেড় হাজার কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার। সব মিলিয়ে সরকারের ক্ষতি দুই হাজার কোটি টাকার বেশি।

সরকারের বিপুল এ রাজস্ব ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দু’টি সুপারিশও করেছে অ্যামটব। একটি হলো কল টার্মিনেশন রেট দুই সেন্ট থেকে কমিয়ে দেড় সেন্ট নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়টি হলো যে দরে কল আসবে, সে দরেই আয় ভাগাভাগির বিষয়টি নিশ্চিত করা। কল রেট নির্ধারণের সর্বোচ্চ সীমা (সিলিং রেট) সাড়ে তিন সেন্ট থেকে সর্বনিম্ন সীমা (ফ্লোর রেট) কমিয়ে দেড় সেন্ট করার সুপারিশ করেছে অ্যামটব। ইতিমধ্যে বিটিআরসি একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। সেখানে বিদেশ থেকে আসা কল রেট দেড় সেন্ট থেকে সর্বোচ্চ এক দশমিক ৬০ সেন্ট করা প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এই প্রস্তাব এখন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। বছর দেড়েক আগে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকেই একই ধরনের প্রস্তাব তৈরি করে পাঠানো হয়েছিল।

আইজিডাব্লিউ অপারেটরদের সংগঠন আইওএফের সভাপতি শামসুদ্দোহা বলেন, ‘আমরা যেটা করছি সেটা বিটিআরসির অনুমোদন নিয়েই করছি। অবৈধ পথে কল আসা বন্ধ না করে দাম কমানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা ঠিক নয়। দাম আরো বাড়ানো উচিত্। পাশাপাশি অবৈধ ভিওআইপি বন্ধ করার ব্যবস্থা করা উচিত্।’ দুই সেন্টে কল আনলেও সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছেন দেড় সেন্টের- এটা অন্যায় কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদেরও অনেক খরচ আছে। সেটা এই টাকার মধ্য থেকে খরচ করা হয়। ফলে আমরা যা করছি তা অন্যায় নয়।’

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.