সব পরিবারের ওপর কর বসানোর চিন্তাভাবনা

indexmzl১৬ কোটি মানুষের এ দেশে কর দেয় মাত্র ১২ লাখ। রাজস্ব আদায়ের হার গত ছয় বছর ধরে জিডিপির ১০ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্নে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, বাংলাদেশের জন্য এটি লজ্জাজনক। প্রতিবছর বাজেটে আয়কর, মূসক ও শুল্ক আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তা কখনো অর্জিত হয় না। বছরের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে তা সংশোধন করা হয়। রাজস্ব আদায়ের হার নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরাও চিন্তিত। এ অবস্থায় আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়াতে কয়েকটি নতুন খাত ও কৌশল চিহ্নিত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। সংস্থাটি বলছে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে সরকারি-বেসরকারিসহ সব চাকরিজীবীর বেতন-ভাতার ওপর কর বসানো যেতে পারে। যা বিশ্বের অনেক দেশেই চালু আছে। এ ছাড়া শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও বিড়ি ও সিগারেটের ওপর শুল্ক বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পোশাকশিল্পের ওপর করের হার বাড়ানো, ক্ষতিকর কেমিক্যালের ওপর কর বসানো, সঠিক সম্পত্তি কর পদ্ধতি চালু, সব ধরনের মূলধনি যন্ত্রপাতির লাভের ওপর কর এবং নতুন ভ্যাট আইনের আলোকে সম্পূরক শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার পরামর্শ দিয়েছে পিআরআই।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীতে সংস্থার নিজস্ব কার্যালয়ে ‘সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব পরিকল্পনা’ শীর্ষক ওই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পিআরআইর চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তারের সঞ্চালনায় সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, এমসিসিআইর প্রেসিডেন্ট নাসিম মঞ্জুর, এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনিস এ খান প্রমুখ বক্তব্য দেন। সেমিনারে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে রাজস্ব আদায়ের কৌশল নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। আর সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার ও কৌশল নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ।
সেমিনারে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি মতামত ও পরামর্শ উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত যেসব লোকসানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া; বাংলাদেশ ব্যাংকে যে রিজার্ভ রয়েছে, তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা; মিষ্টি, ফার্মেসি, জুয়েলারি, এখনইডটকম- এ ধরনের পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ করা। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো।
পিআরআই আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্য কাউকে উপস্থিত না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানে এনবিআরের নীতিনির্ধারকদের উপস্থিত থাকা জরুরি। মুহিত বলেন, বাংলাদেশে এখন ১৬ কোটি মানুষ। আর কর দেয় মাত্র ১২ লাখ মানুষ। একটি জাতির জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক, অবিশ্বাস্য ও অযৌক্তিক। তিনি বলেন, সবার ওপর নূ্যনতম করারোপ করা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। যদিও এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। দেশের সব পরিবারকে করের আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
রাষ্ট্রায়ত্ত যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে অনবরত লোকসান দিয়ে আসছে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, যদিও এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আদমজী কারখানা বন্ধ করার পর সারা দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে বিদ্যুতের সমস্যা মোটামুটি কেটে গেছে। এ সময়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে তেমন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে আগামী বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন করে আর কোনো ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হবে না। যা অনুমোদন হয়েছে, তা যথেষ্ট। বছরের পর বছর ধরে পাইপলাইনে পড়ে থাকা বৈদেশিক ঋণের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখনো ২০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পড়ে আছে। অথচ তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে দুষলেন অর্থমন্ত্রী। দ্বিতীয় দফায় ভারত যে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে, সেখানে অবকাঠামোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
আহসান এইচ মনসুর তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বিড়ি ও সিগারেটের ওপর উচ্চ কর বসানো যেতে পারে। এখানে শুল্কহার বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, গত ছয় বছরের ব্যবধানে বাজারে সিগারেটের শেয়ার বেড়ে ৬৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিড়ির নিচের দিকে যেসব স্ল্যাব রয়েছে, সেগুলোতে উচ্চ হারে শুল্কহার আরোপের পরামর্শ দেন তিনি। এতে একদিকে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.