শাহ আমানত বিমানবন্দরে কাগজপত্র ছাড়াই বিপুল আমদানি পণ্য পাচার

শাহ আমানত বিমানবন্দরে কাগজপত্র ছাড়াই বিপুল আমদানি পণ্য পাচার।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিয়ে কোনো শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমদানীকৃত বিপুল পণ্য নিয়ে গেছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ওয়াটারওয়েজ শিপিং লিমিটেড। চট্টগ্রাম কাস্টমসের অনলাইন সিস্টেম এড়িয়ে অভিনব কায়দায় এগুলো বিমানবন্দরের কার্গো শাখা থেকে গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাচার করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ৯টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে সৌদি আরব থেকে আনা এসব চালানে বাস্তবে কী পণ্য ছিল।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কাছে অভিযোগ আসার পর বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে চলতি বছরের মার্চে কাগজপত্র ছাড়া বিপুল পণ্য খালাসের বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর কাস্টমসের নিজস্ব প্রাথমিক তদন্তে গত মে মাসে চোরাচালানের বিষয়টি উদ্ঘাটিত হয়। কিন্তু কিভাবে এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটল তার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি কাস্টমস। শুধু তা-ই নয়, এসব চালানে আমদানি নিষিদ্ধ সোনা বা মাদক ছিল কি না তাও নিশ্চিত হতে পারেনি কাস্টম কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ৯ জুন রবিবার আমি এখানে যোগদান করেছি। প্রথমে আপনার কাছ থেকেই বিষয়টি শুনলাম। বিষয়টি ভালোভাবে জেনে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’

জানা গেছে, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে একাধিক যাত্রী চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব পণ্য নিয়ে আসে। বিমানে এসব পণ্য আসার পর যাত্রী ঘোষণা দিয়ে এসব পণ্য ছাড়ের জন্য কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি জমা দেয়। যাত্রীর পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এই চালান ছাড়ের দায়িত্ব পায়। নিয়ম অনুযায়ী সেই বিল অব এন্ট্রি দাখিলের পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের শুল্কায়ন করে। শুল্ক পরিশোধের পরই বিমানবন্দরের কার্গো শাখা থেকে পণ্য ছাড়ের অনুমতি মেলে। কিন্তু কোনো কাগজপত্র জমা না দিয়ে, শুল্কায়ন না করে এবং শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই এই ৯টি চালানের পণ্য ছাড় করে নেয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ওয়াটারওয়েজ শিপিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক নাম ‘এম কোড’।

এদিকে ডিসেম্বরে পণ্য পাচার হয়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে কাস্টমস কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের দপ্তরে এ বিষয়ে অভিযোগ আসে। তিনি বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার নুরউদ্দিন মিলনকে মৌখিকভাবে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন। বিমানবন্দরে কর্মরত ডেপুটি কমিশনার, সহকারী কমিশনার ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের পর তিনি গত ২২ মে কাস্টমস কমিশনার দপ্তরে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা আছে, কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম বিশ্লেষণ করে ৯টি বিল অব এন্ট্রির পণ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এতে প্রমাণিত হয়, ওই চালানগুলোতে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি ওয়াটারওয়েজ শিপিং লিমিটেড জালিয়াতির মাধ্যমে প্রযোজ্য কর ফাঁকি দিয়ে পণ্য খালাস করে নিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে জালিয়াতির মাধ্যমে বিমানবন্দরের কার্গো শাখা থেকে পণ্য ছাড় করায় ওই সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধির বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার নুরউদ্দিন মিলন বলেন, ‘মূলত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে গিয়ে দেখা যায় কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে কোনো বিল অব এন্ট্রি জমা পড়েনি। পরে কার্গো শাখায় গিয়ে দেখা যায়, উল্লিখিত চালানের পণ্য উধাও।’ তিনি বলেন, ‘আমদানিকারক ঘোষণা দিয়েছে ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী আনার। কিন্তু বাস্তবে চালানে কী ছিল তা আমরা জানি না। তা আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যও হতে পারে। এ জন্য আরো বড় পরিসরে তদন্ত দরকার।’

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর বা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আসা যেকোনো পণ্য ছাড় করতে অনলাইনে বা অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে পণ্যের ঘোষণা বা বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে হয়। এর ব্যত্যয় হওয়া মানেই চোরাচালান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াটারওয়েজ শিপিং লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মঞ্জুর আলম বলেন, ‘বিমানবন্দরে কর্মরত একটি চক্র ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাদের ফাঁসিয়েছে। কারণ ইদানীং আমরা বেশ ভালো কিছু কাজ পাচ্ছিলাম। কারণ ৯টি বিল অব এন্ট্রিতে কোনো ধরনের শুল্কযোগ্য পণ্য ছিল না। আর শুল্ক দেওয়ার জন্য আমাদের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকাও ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি ও শুল্কায়ন করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কাস্টমসের ফাইল থেকে উধাও করেছে সেই চক্র, যাতে বিমানবন্দরে আমরা এ ধরনের কাজ করতে না পারি।’

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সোনাদিয়া দ্বীপ ও দ্বীপসংলগ্ন এলাকা, বনভূমিতে ১৯ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির শামুক, ঝিনুক, বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া, কাছিমসহ প্রায় ৮০ প্রজাতির সাদা মাছ পাওয়া যায়। এ ছাড়া এখানে বিপন্নপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। আর অন্তত তিন প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের মধ্যে কোরাল, বোল, বাটা, তাইল্লা, দাতিনা, কাউন ছাড়াও প্যারাবন এলাকার অন্যান্য জাতের প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.