হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরজুড়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ কার্গো বিপর্যয়। হদিস পাওয়া যাচ্ছে না ১৫০০ টনের বেশি এক্সক্লুসিভ কার্গো পণ্যের। প্রতিদিনই এর সংখ্যা বাড়ছে। কাগজে-কলমে এসব পণ্য ঢাকায় পৌঁছলেও সেগুলো নেই কার্গো গোডাউনে। এমনকি হ্যান্ডেলিং এজেন্ট বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সও বলতে পারছে না পণ্যগুলোর বর্তমান অবস্থান। অতি গুরুত্বপূর্ণ এসব পণ্যের খোঁজে বিভিন্ন গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি, ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির মালিক ও তাদের মনোনীত সিএন্ডএফ এজেন্টরা গলদঘর্ম হচ্ছেন। গত ১৫ দিন ধরে তারা বিমান, কাস্টম, সিভিল এভিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট সব ঘাটে ঘাটে ধরনা দিয়েও পণ্যের হদিস পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট মালিক ও সিএন্ডএফ এজেন্ট সূত্রে জানা গেছে, হদিসবিহীন এসব কার্গো পণ্যের মূল্য হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। পণ্য বুঝে না পাওয়ায় অনেক গার্মেন্ট কারখানার রফতানির আদেশ বাতিল হয়েছে। আবার অনেকে যথাসময়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য রফতানি করতে পারবেন না। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা।
জানা গেছে, সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধিরা মালামাল ঢাকায় পৌঁছার এয়ারঅ্যারো বিলের কপি নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিমানের ইমপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্সের বারান্দায় ঘুরলেও পণ্যের হদিস পাচ্ছেন না। তাদের বক্তব্য গত ২০ বছরেও এ ধরনের অবস্থা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বিকালে সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ছুটে গেছেন বিমানের কার্গো শাখার জেনারেল ম্যানেজার আলী আহসান বাবুর কক্ষে। তারা বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি উইং কমান্ডার আসাদুজ্জামান, সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরী ও কাস্টমস কমিশনার লুৎফুর রহমানকে জানিয়েছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পণ্য খুঁজে বের করা ও ডেলিভারি প্রদানের আলটিমেটাম দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আজ সিভিল এভিয়েশন, বিমান ও ঢাকা কাস্টম হাউসের শীর্ষ পর্যায়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। কার্গো কমপ্লেক্সের ভয়াবহ এই দৃশ্য সরেজমিন দেখতে সকালে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বিমানবন্দরে আসার কথা রয়েছে।
এদিকে কার্গো বহনকারী বিভিন্ন এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা গেছে, হদিসবিহীন সব পণ্যই শাহজালালের রানওয়ে সংলগ্ন ‘বে’ এরিয়াতে পড়ে আছে। শাহজালালের এই এলাকাটি রেড জোন হওয়ায় সেখানে বিমানের কার্গো শাখার কেউ প্রবেশ করতে পারছে না। যার কারণে গত ১৫ দিন ধরে পণ্যগুলো খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে পুড়ছে। যেহেতু ‘বে’ এরিয়া পণ্য রাখার স্থান নয়, তাই সেখানে রাখা পণ্য দেখভালের জন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এতে সেখান থেকে অবাধে চুরি হচ্ছে গার্মেন্ট আইটেম, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক্সসহ মূল্যবান পণ্যসামগ্রী। শাহজালালে কর্মরত খোদ সিভিল এভিয়েশনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই কার্গো পণ্য চুরির সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ আছে সন্ধ্যার পর এই সিন্ডিকেট গাড়ি নিয়ে শাহজালালে প্রবেশ করে। এরপর ৮ নম্বর হ্যাঙ্গার গেট দিয়ে অবাধে মালামাল নিয়ে বের হয়ে যায়।
১৫শ’ টন পণ্যের হদিস না পাওয়া প্রসঙ্গে বিমানের কার্গো শাখার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পণ্যগুলো রানওয়ে সংলগ্ন বে এলাকায় পড়ে থাকায় তারা সেখান থেকে আনতে পারছে না। ওই এলাকায় প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই তাদের। জিইসি (গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট) নামে বিমানের অপর একটি শাখা এ পণ্যগুলো বে এলাকা থেকে কার্গো গোডাউনে পৌঁছে দেয়ার কথা। জিইসি বলছে, বে এলাকা থেকে কোনো পণ্য নিতে হলে বেসিামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অনুমতি লাগে। বিভিন্ন কোম্পানির অনুরোধে ও বৃষ্টিতে পণ্য নষ্ট হওয়ায় ১৫ দিন ধরে তারা নানা চেষ্টা-তদবির করেও সিভিল এভিয়েশন থেকে অনুমতি পায়নি। অপরদিকে সিভিল এভিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে কার্গো ক্যানোপিসহ সবগুলো গোডাউন ২২০০ টন থেকে ২৫০০ টনের বেশি ব্যাগেজ পণ্যে (কমার্শিয়াল) ভর্তি। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য রয়েছে ওই এলাকায়। এটা নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বেবিচক বলছে, আগে এসব ব্যাগেজ পণ্য সরাতে হবে। তারপর রানওয়ে থেকে কার্গো পণ্য আনার অনুমতি দেবে তারা।
এদিকে ঢাকা কাস্টমস হাউসের ক্লিয়ারেন্স না থাকায় বিমান কর্তৃপক্ষ গোডাউন থেকে এসব ব্যাগেজ পণ্য খালাস করতে পারছে না। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গোডাউনে রক্ষিত সব ব্যাগেজ পণ্য অবৈধভাবে ঢাকায় এসেছে। এগুলোর কোনো মালিকানাও নেই। এ অবস্থায় পণ্যগুলো কোথায় যাবে, কিভাবে যাবে, সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। গত তিন মাস ধরে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে গোডাউনে এখন আর জায়গা নেই।
বিমান বলছে, নিয়ম অনুযায়ী মালিকানাবিহীন কোনো পণ্য ২১ দিনের বেশি থাকলে কাস্টম কর্তৃপক্ষ সেগুলো নিলামে বিক্রি করে দিবে। কিংবা তাদের নিজস্ব গোডাউনে নিয়ে যাবে। কিন্তু ঢাকা কাস্টমস হাউস সেটাও করছে না। যার খেসারত দিতে হচ্ছে গার্মেন্টস সেক্টরসহ বিভিন্ন কোম্পানিকে।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কাস্টমস বিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, ৩টি সংস্থার সমন্বয়হীনতা, একগুঁয়েমি, চুরি, দুর্নীতি আর খামখেয়ালির কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের আমদানি খাত। এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। তিনি অবিলম্বে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ অবস্থার নিরসন দাবি করেছেন।
বিমানের কার্গো শাখা সূত্রে জানা গেছে, কার্গো কমপ্লেসসহ পুরো এলাকার মালিক সিভিল এভিয়েশন (বেবিচক)। আগে কার্গো আউট ইয়র্ডের আয়তন ছিল ১ হাজার ৭শ’ ফুট। বেবিচক কর্তৃপক্ষ এখান থেকে ১ হাজার ফুট নিয়ে গেছে। এখন কার্গো রাখার জন্য আউট ইয়ার্ডে মাত্র ৭০০ ফুট জায়গা আছে বিমানের। এ কারণে ২-৩টা ফ্লাইট নামলেই ভয়াবহ কার্গো জট দেখা দেয়।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএমএ খায়ের জানান, নিয়ম অনুযায়ী কোনো এয়ারলাইন্স অবতরণ করার ৬ ঘণ্টার মধ্যে ওই ফ্লাইটের মালামাল কার্গো গোডাউন, ওয়ার হাউস কিংবা ক্যানোপি এলাকায় পৌঁছাতে হবে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টের কাছে মালামালের এয়ার-অ্যারো বিল দিতে হবে। সিএন্ডএফ কতৃপক্ষ এ বিলের কপি নিয়ে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিমানের কার্গো কর্তৃপক্ষকে দিলে তারা মালামাল ডেলিভারি দিবে। কিন্তু এটি অনুসরণ কারা হচ্ছে না। এখানে সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। গত ২ বছরেও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কার্গো মেইন ওয়্যার হাউস ১ ও ২ এবং কার্গো এক্সপোর্ট ভিলেজের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেনি। গোডাউনগুলোতে মালামাল রাখার র্যাক থাকলেও ওই র্যাকে কোনো প্লেট নেই। বিমান থেকে খাচাগুলোতে প্লেট বসানোর জন্য সিভিল এভিয়েশনকে এ পর্যন্ত ১০০টির বেশি চিঠি দিয়েছে। কিন্তু নির্বিকার বেবিচক। অভিযোগ- সিভিল এভিয়েশনের একটি সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের কোম্পানি খুঁজে না পাওয়ায় খাঁচাগুলোতে প্লেট সরবরাহ করছে না। জানা গেছে এ কাজে ওই সিন্ডিকেট কমপক্ষে ২ কোটি টাকার বেশি কমিশন চাচ্ছে।
সরেজমিন শাহজালালের কার্গো কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেছে, সবগুলো গোডাউন জুড়ে পড়ে আছে কমার্শিয়াল ব্যাগেজ। গত ৬ মাস ধরে অহেতুক এসব পণ্য দিয়ে গোডাউন বোঝাই করে রাখা হয়েছে। অপরদিকে বিমানবন্দরের রানওয়ে সংলগ্ন বে এরিয়াতে পড়ে আছে মূল্যবান কার্গো পণ্য। মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে অধিকাংশ পণ্য ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। কার্টন ছিঁড়ে গেছে। গার্মেন্টের কাপড়গুলোতে বৃষ্টির কাদায় একাকার। এসব পণ্য দেখার কেউ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হযতর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই বে এলাকাটি এখন চুরি আর লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। একই সঙ্গে অরক্ষিত পুরো টার্মিনাল। গার্মেন্ট এক্সেসরিস, মোবাইল ফোন, কেমিক্যাল থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই এখান থেকে চুরি আর লুট হচ্ছে না। এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যথাও নেই কর্তৃপক্ষের। সিভিল এভিয়েশন, বিমান, কার্গো টার্মিনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, থানা পুলিশ, সিকিউরিট, কাস্টমসসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে গড়া একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। চোরাই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ব্যবহার করছে সবগুলো গেট। প্রকাশ্যে তারা গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন গেট দিয়ে ভিতরে যাচ্ছে আবার নির্বিঘ্নে বেরিয়ে আসছে। শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীই নয়, যে কেউ ঢুকে যেতে পারে অ্যাপ্রোনসহ স্পর্শকাতর এলাকায়। ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট এসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা চুরির অভিযোগ সিভিল এভিয়েশন, এয়ারফ্রেইট ও বিমানের মহাব্যবস্থাপকের (কার্গো) টেবিলে ফাইল বন্দি হয়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে এসব অভিযোগ পড়ে থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছর ২ হাজার ৩২৫ কেজি পণ্য চুরি হয় বিমানবন্দরের বে এরিয়া থেকে। ওই পণ্যের (অ্যারো বিল নং ১৫৭-৬৯৬৬-৬৯৮৪) আমদানিকারক ছিল মতিন স্পিনিং মিলস নামে একটি কোম্পানি। এর সিএন্ডএফ এজেন্ট ছিল খান অ্যান্ড কোম্পানি। পুরো পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের কতিপয় ড্রাইভার, বিমান, কাস্টমস, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সিএন্ডএফ এজেন্টের যোগসাজশ ছিল।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এসএম এ খায়ের জানান, আমদানিকারকদের মালামাল বের করার জন্য একটি মাত্র গেট খোলা থাকায় মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। সব মালামাল একত্র করলেও সময় মতো লোডার, ট্রলি, ফর্কলিফট না থাকায় সেসব মাল বের করা যায় না। তিনি বলেন, ৩ নম্বর গেটটি খুলে দিলে আরও দ্রুত মালামাল ডেলিভারি দেয়া সম্ভব হতো। এতে কার্গো পণ্যের জট হতো না।
গত বছরের ৩ জুন গোডাউন থেকে কবির এন্টারপ্রাইজের প্রায় ৫ কোটি টাকা দামের এলসি করা ৩০ বেল্ট গার্মেন্ট কাপড়ের পুরোটাই চুরি হয়ে যায়। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক মাকসুদুর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। ওই বছর এপ্রিল মাসে প্রকাশ্যে টার্মিনাল এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে করে প্রায় ১০ কোটি টাকার কেমিক্যাল চুরি করে নিয়ে যায় ওই চক্রটি। সম্প্রতি কার্গো গোডাউন থেকে ৭০ পিস স্যামসাং এস-৭ মোবাইল ফোন ও ২শ’ সিমফোনি হ্যান্ড সেট চুরি হয়েছে।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের শেষ দিকে গাজীপুর এলাকার একজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর দুই কার্টন মূল্যবান বোতাম চুরি করে ও কার্টনে ঘাষ ঢুকিয়ে রাখা হয়। রাজধানীর মোতালেব প্লাজার একজন ব্যবসায়ী জানান, তার ১০টি কার্টন খুলে কে বা কারা মূল্যবান ৬ হাজার মোবাইল সেট নিয়ে গেছে। কার্টনগুলো খুলে দেখা গেছে, সেখানে ৫শ’ খেলনা মোবাইল সেট রয়েছে।
সূত্রঃ যুগান্তর
