ভোগান্তির নাম পাসপোর্ট?

rabভিড় জটলা সামলে যে কাউন্টারে যেতে বলা হয় তার নম্বর-১০৫। সাদা কাগজে কাউন্টারের নাম লেখা ‘তথ্য কেন্দ্র’। কিন্তু পাসপোর্টের কাজে যারা এখানে আসছেন তাদের কেউই এই নাম মানতে নারাজ। তাদের মতে, ভোগান্তি শুরু হয় এখান থেকেই।

এই যেমন– শিরিন আক্তার ২০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে ঠেলা-ধাক্কা সামলে ১০৫ নম্বর কাউন্টারে উঁকি দিয়ে বললেন, পাসপোর্টের ফরম নিতে চাই।

তখন তার উত্তরে বলা হলো, দুঃখিত ফরম শেষ হয়ে গেছে।

তার মানে কী? পাসপোর্ট অফিসেই নেই পাসপোর্ট ফরম! তাহলে কোথায় আছে?

ওই নারী অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে একটি মাত্র ফরম পেতে চেয়েছিলেন সেই ফরমসহ ‘অনেক সুবিধার অফার’ আধঘণ্টা আগেই দিয়েছিলেন এক লোক। পাসপোর্ট অফিসের প্রবেশের রাস্তায় তাকে টেনে সেই লোক বলেছিলেন, ‘টাকা দেন আমরা ফরম দিয়ে দেবো, ফিলাপ করেও দেবো লাইনও লাগবে না। আর সব করে দিলে আমাদের প্যাকেজ ব্যবস্থা আছে’।

অপরিচিত মানুষের কথায় ওই নারী ভয় পেয়ে পরে তথ্যকেন্দ্রের দারস্থ হন। কিন্তু তথ্যকেন্দ্র সমাধান দিতে পারলো না।

অবশেষে বাইরের দালালদের কাছেই ছুটতে হয় তাকে!

শুধু এই একটি ঘটনা নয়, পাসপোর্ট অফিসে দিনে যত লোকই আসেন তাদের সবাই সেবা নয় হয়রানির মুখোমুখি হন হরহামেশা। কখনও পাসপোর্ট অফিসের ছয়তলায়, কখনও তৃতীয় তলায়, কখনও পঞ্চম, কখনও নিচতলায় যে কতবার চক্কর দিতে হয় তার হিসেব থাকে না।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভোগান্তি-বিরক্তি-হয়রানির নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে সিঁড়িগুলো। পায়ের চাপে সিঁড়ির টাইলস ফেটে ভেঙে পড়ছে, তবু দিনশেষে পাসপোর্ট অফিসে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট- এমন একজনকে পাওয়া গেলো না।

এই যেমন আরেকজন ইমরোজ আরেফিন। রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে এসেছেন তার হারানো পাসপোর্ট তুলতে। আগারগাঁও সোনালী ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে অনলাইনে বাসা থেকে ফিলাপ করেই প্রিন্ট কপি স্বাক্ষর ও সত্যায়িত করে ব্যাংক রশিদসহ ঢোকেন পাসপোর্ট অফিসে।
নিয়ম অনুযায়ী জমা দেওয়ার উদ্দেশ্য তার। কিন্তু পাসপোর্ট অফিসে কোথায় কীভাবে জমা দেবেন তার কোনো দিক নির্দেশনা পাচ্ছিলেন না। একজন সিকিউরিটি গার্ড বললেন যান ১০৫-এ। ১০৫ থেকে আরেকটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়- এটি ফিলাপ করে আরেকটি কাউন্টারে জমা দেন।

কিন্তু ইমরোজকে যে কাগজটি ফিলাপের জন্য দেওয়া হলো, সেটি তথ্য পরিবর্তন ও সংশোধন ফরম। কিন্তু তিনি কোনো তথ্য পরিবর্তন সংশোধনের জন্য আসেননি। এসেছেন হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্ট তুলতে।

আর এই কাগজে যে বিষয়গুলো ফিলাপ করতে হবে তার সবগুলো অনলাইনে ফিলাপ করেছেন তাহলে কেন আবার এনালগ পদ্ধতির এই কাগজে লিখতে হবে- এটি একেবারে অহেতুক মনে হলো তার কাছে। কিন্ত উপায় নেই তাই করতে হলো।

বাহিনীর একজন সদস্য পাসপোর্ট আবেদনের সিল দিয়ে থাকেন। সেই সিলের লাইনে দাঁড়ালেন ইমরোজ। কিন্তু সে সদস্য বললেন, ‘একি আপনার ফরমে পাসপোর্ট কেন্দ্র ‘উত্তরা’ লেখা। এটি হবে না, নতুন করে আগারগাঁও লিখে ফিলাপ করে নিয়ে আসেন’।

পড়লেন বিপদে। আবার সত্যায়িত করা, ছবি লাগানো, আটা দিয়ে লাগানো রশিদ খোলা- সব মিলিয়ে আজ আর হচ্ছে না এমন অবস্থা। তখন আরেকজন বললেন, জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে যান দেখেন জমা নেয় কিনা। ওটা হাত দিয়ে কেটে শুধু ওদের বলে দিলেই তো হয়ে যায়!

তারপর নিচতলার যে লাইনে দাঁড়ালেন সেখানে তার সামনে প্রায় ২০ জন। আধঘণ্টার বেশি সময় শেষে তিনি যেতে পারলেন কাউন্টারের কাছে। তখন বলা হলো- আপনার হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্ট তুলবেন তাহলে যান ৩০৫-এ।

অথচ পাসপোর্ট অফিসের কোথায় লেখা নেই হারিয়ে যাওয়া পাসপোর্ট তুলতে হলে পূরণ করা ফরম জমা দেওয়ার স্থান ৩০৫-এ। শুধু এই তথ্য জানার জন্য তাকে আধঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় নষ্ট করতে হয়েছে একটি লাইনে।

এবার ৩০৫–এ ইমরোজ। কিন্তু ৩০৫ এতোই ব্যস্ত যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেতে হলো আরও ঘণ্টা খানেকের মতো। দুপুর গড়িয়ে বেলা শেষের দিকে। কাউন্টারের ঠিক সামনে যখন গেলেন তখন প্রথমে ‘জাহিদ’ নামের আনসার সদস্যের হাতে গেলো ফরমটি। তিনি ফরম পেয়েই বললেন, ‘সাজিয়ে ঠিক করে দিলেন না কেন?
কিন্তু পাসপোর্ট অফিসের এই কাউন্টারে এটা বলা নেই, ফরম কীভাবে সাজাতে হবে বা কোন কাগজের পরে কোন কাগজ সন্নিবেশ করতে হবে।

আনসার সদস্যের প্রশ্ন আরও বাড়লো। তিনি বললেন, ‘আপনার পাসপোর্ট ইস্যু স্থান সিলেট, তাহলে এখানে কেন? হারিয়েছে ঢাকায় এবং বর্তমান ঠিকানা ঢাকা বলার পরও আনসার সদস্যের বিরক্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো।

ঢাকায় কেন? ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি করেছেন—ইত্যাদি।

এসব অহেতুক প্রশ্ন পার করে যখন পাসপোর্ট আবেদনটি অফিসের এক নারী কর্মকর্তা হাতে নিলেন তখন জানা গেলো- এটি হবে না। পাসপোর্ট অফিসের নামের জায়গায় ‘উত্তরা’।

উপায় নেই এখন ফিরে আসতে হবে আগারগাঁও অফিস থেকে। এদিন যে শুধু কাজ হচ্ছে না তা নয় পুরো আবেদন আর সোনালী ব্যাংকে জমা দেওয়া ৩ হাজার ৩৬৩ টাকাও বরবাদ সঙ্গে!

এমন অবস্থায় পাসপোর্ট অফিসের ছয়তলায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস পরিচালকের কক্ষে। তার কক্ষে প্রবেশে আনসার সদস্যের কড়াকড়ি।

সেই কড়াকড়ি পেরিয়ে তার কাছে গেলে তিনি বললেন, ‘আপনি শুধু চতুর্থ তলায় গিয়ে ব্যাংক ড্রাফট গ্রহণ সিল নিয়ে উত্তরায় জমা দিলেই হবে। নতুন করে ফরম পূরণ আর টাকা জমা দেওয়ার দরকার নেই। যেহেতু ভাটারা বর্তমান ঠিকানা; তাই আপনার পাসপোর্ট অফিস উত্তরায়’।

এই সহজ সমাধান যখন পাওয়া গেলো তখন বিকেল। অর্থাৎ পুরো দিনটাই গেলো এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে। সমাধান যেমন পারেনি প্রথম ১০৫ তথ্য সেবাকেন্দ্র, তেমনি ৩০৫ নম্বর কাউন্টারও।

দিনশেষে এসব কাউন্টারকে সেবা নয় ভোগান্তি সেন্টার বললেও ভুল নয় ইমরোজদের। ক্ষোভে তিনি বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে আর কেউ এলে বলবেন- টিফিন বাটিতে করে খাবার নিয়ে আসতে’।

আরও খবর
আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.