হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনে সরাসরি কার্গো সার্ভিসে নিষেধাজ্ঞা জারির পর এখন দেশের সব বিমানবন্দরে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। শাহজালালের নিরাপত্তার দায়িত্ব ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা রেড লাইনকে দেওয়ার পর পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের এক ধরনের চাহিদা ছিল সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল তৈরির ব্যাপারে। শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এমন প্রোফাইল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি সিভিল এভিয়েশন ও বিমানকে অবহিত করা হয়েছে। ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা রেড লাইনও যাচাই-বাছাই করবে প্রোফাইলের তথ্যগুলো। তারা তাদের দেশের কর্তৃপক্ষকেও এ ব্যাপারে অবহিত করবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির তথ্যের পাশাপাশি তাদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা, অপরাধ, মামলা-মোকদ্দমার তথ্য থাকবে ওই প্রোফাইলে। সিএএবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘বিশেষ প্রশিক্ষণ’ দেওয়ার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য।
সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, প্রোফাইল তৈরি হলে এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সহজেই চিহ্নিত করা যাবে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বাংলাদেশের সব বিমানবন্দরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। তার পরও যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তার পর থেকেই আমরা হার্ডলাইনে গিয়েছি। দেশের স্বার্থে যে কারোরই প্রোফাইল সংগ্রহ করা যায়।’
একই কথা বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। তিনি বলেন, ‘শাহজালালের নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। তার পরও অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আমরা কঠোর অবস্থানে গিয়েছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অস্ট্রেলিয়ার পর গত ৮ মার্চ যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো সার্ভিস নিষিদ্ধ করার পরপর সরকারের হাইকমান্ড দফায় দফায় বৈঠক করেন। তাঁরা সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। শাহজালালে কোন কোন স্থানে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে তা অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে নির্দেশনা পেয়ে কয়েক ধাপ নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। যেসব স্ক্যানিং মেশিনে সমস্যা আছে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নতমানের মেশিনসহ প্রায় ৯০ কোটি টাকার নিরাপত্তা সরঞ্জাম আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁরা সোনা ও মানবপাচারের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এমনকি তাঁরা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করে থাকেন। তাঁরা রাজনৈতিক ব্যানারে থেকেও অপরাধ করেন। তোষামোদি করে দিন পার করে দেন। ইতিমধ্যে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ব্রিটিশ সরকারও জানতে পেরেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রশ্ন ওঠায় বাংলাদেশ সরকারও আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, সপ্তাহখানেক ধরে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সিএএবি ও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রোফাইল সংগ্রহ করছে। অফিসসহ তারা বাসাবাড়িতে গিয়েও তথ্য নিচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা সমর্থক, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি না, তাঁরা কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত আছেন কি না, নিয়মিত অফিস করেন কি না সেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘তথ্যগুলো বিমানবন্দরে নিরাপত্তায় থাকা রেড লাইন যাচাই-বাছাই করবে বলে আমরা জেনেছি।’
সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চার দিন আগে আমার আশকোনার বাসায় একটি গোয়েন্দা সংস্থার তিন সদস্য যান। তাঁরা পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলেন। নোট লিখে নিয়ে যান। এতে দোষের কিছু নেই। আমাদের অনেক সহকর্মী সোনা ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত আছেন, তা সত্য। তাঁদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলে আমি মনে করি।’
সূত্রঃকালের কণ্ঠ