কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক নেই; কিন্তু আত্মার সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যা কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। আমি তাকে ‘আপা’ সম্বোধন করি, ঠিক যেন সহদোরা। কর্মক্ষেত্রে আপার সাথে আমার প্রথম দেখা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর। কিন্তু ভালো লাগা অনেক আগে থেকেই। সেটি আপার অনবদ্য লেখার জন্য। অল্পদিনের পরিচয়েই আপারও কেন যেন আমাকে ভালো লেগে গেল।
সেলিনা হোসেন শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান থাকার কারণে প্রায়শই আমাদের দাপ্তরিক যোগাযোগ। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে পারস্পরিক ভাব বিনিময়। আমাদের চিন্তা-চেতনায় অনেক মিল। মানবকল্যাণে কিভাবে কাজ করা যায় সেটাই প্রাধান্য পেতো। বিশেষ করে শিশুদের মাঝে কীভাবে মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা যায় সে বিষয়েই বেশিরভাগ সময় আলোচনা চলতো। আপার পরামর্শেই বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে আমার প্রকাশিত প্রথম বই ‘আদর্শ মালা’।
আমি প্রথমে লিখেছিলাম ‘অ’ বর্ণের বিপরীতে- ‘অলস লোক সফল নয়’। আর ‘আ’ বর্ণে ‘আলসেমি তাই ছাড়তে হয়’। সেলিনা আপা বলেছিলেন প্রতিটি বর্ণে দুটি লাইনের ছন্দ দিয়ে লিখলে কেমন হয়, খুব কি অসুবিধা হবে? আমি বললাম চেষ্টা করে দেখি। তিনি বললেন, তাহলে খুব ভালো হবে। আপনি পারবেন। তার পরামর্শমতো শুরু করলাম যথারীতি অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত দুটি লাইনে ছন্দের মিল রেখে শিশুদের মাঝে আদর্শ তৈরির পাশাপাশি বাবা-মা এবং শিক্ষকগণও যাতে শিশুদের মাঝে মূল্যবোধ জাগানোর একটু চেষ্টা করেন, সে ধরনের একটি প্রয়াস নিলাম। যেমন- ‘অ- অনাহারী কে আহার দাও/ অসহায়ের পাশে দাঁড়াও। আ-আদর্শ নিয়ে জীবন গড়ো/ আর্তজনের সেবা করো।’
বইটি প্রকাশের পর এর দু’টি কপি আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছিলাম দেখার জন্য। তিনি বইটি হাতে নিয়ে বলেছিলেন ভালো করেছো। বাচ্চাদের জন্য এ ধরনের বইয়ের প্রয়োজন। এরপরের ১৭ ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের জন্মদিন এবং জাতীয় শিশু দিবসের অনুষ্ঠানের বইমেলা উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিশু একাডেমীর স্টল পরিদর্শনকালে ‘আদর্শ মালা’ বইটি হাতে নিয়ে তৎকালীন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে বলেছিলেন, এই বইটি অনেক ভালো হয়েছে। সেদিনের ভালোলাগা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। সেলিনা আপা আমার এই বইটি নিউইয়র্কের একটি বই মেলাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর প্রতিবারেই কলকাতার বইমেলায় ‘আদর্শ মালা’র চাহিদা বেড়েই চলেছে। আর আমি এর কৃতিত্ব সেলিনা আপাকেই দিতে চাই।
২০১৭ সালে বঙ্গমাতার জন্মদিনে ‘রেণু থেকে বঙ্গমাতা’ নামে একটি নিবন্ধ লিখলাম। সেলিনা হোসেন বললেন, ‘বঙ্গমাতাকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখেন। নিবন্ধটি যেভাবে সাজিয়েছেন সেটিকে বিশ্লেষণ করে পূর্ণাঙ্গ বই লিখলে বঙ্গমাতা সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানার সুযোগ পাবে পাঠকেরা।’ আপার কথায় জাদু আছে। আমি শুরু করলাম একসময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে পান্ডুলিপি দেখালাম। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ১০০ টি বই এর তালিকায় ‘রেণু থেকে বঙ্গমাতা’ বইটির নাম আছে জেনে সেলিনা হোসেনন অনেক খুশি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পান্ডুলিপি দেখে বললেন বইটি ভালোই হচ্ছে।
কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মতো এমন একজন মানুষের কাছ থেকে সাহচর্য পাওয়াটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার। এক সময় আমি শুধু কবিতা এবং গান লিখতাম নিবন্ধে সাচ্ছন্দ বোধ করতাম না। ডক্টর রণজিত কুমার বিশ্বাস এবং সেলিনা আপার উৎসাহেই মূলত নিবন্ধ লেখার শুরু। পত্রিকায় প্রকাশের বিষয়ে আপার উৎসাহ এবং সহযোগিতার কথা উল্লেখ না করলে অকৃতজ্ঞতা হবে। তাঁর পরের কথা হল প্রতিবছরই বইমেলাতে যাতে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন তা না হলে লেখাগুলো একসময় হারিয়ে যাবে।
কবিতা ও গান লিখতেই ভালো লাগে। সেলিনা আপার সাথে পরিচয়ের পরের জন্মদিনে তাকে একটি কবিতা উৎসর্গ করি। সেটা এখানে উল্লেখ করার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। কবিতাটির প্রথম চরণে ছিল “জন্মদিনে তোমার জন্য শুভ কামনা দীর্ঘজীবন পাও তুমি এটাই প্রার্থনা।” তার সাথে আমার একটি ছবির ফ্রেমে কবিতাটিকে বাঁধাই করে আপা জন্মদিনের উপহার দিয়েছিলাম। সেটি ড্রইংরুমে সযতনে স্থান পেয়েছে।
সেলিনা হোসেনের কন্যা ফারিয়া লারা বাংলাদেশের প্রথম প্রশিক্ষক বৈমানিক যিনি আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলেন। অকালে হারিয়ে গেলেন স্বপ্নকে অধরা রেখে। কিন্তু মা সেলিনা হোসেন থেমে থাকেননি। প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিজের সবটুকু দিয়ে।
একজন মানুষ শোককে কীভাবে শক্তিতে পরিণত করে অমিত সাহসের উপর ভর করে এগিয়ে যান সেলিনা হোসেন তার এক অনন্য উদাহরণ। এই করোনা কালেও সেলিনা হোসেন তার সীমিত সামর্থের মধ্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মানুষের মনে সাহস যোগাচ্ছেন। আমরা প্রায়শই টেলিফোনে কথা বলি। সেলিনা আপাকে অনুরোধ করি সতর্ক থাকার জন্য। বয়সের বিষয়টি মাথায় রেখে যতদূর সম্ভব করোনাকে মোকাবেলা করার অনুরোধ করি। সঙ্গত কারণেই তিনি বাসা থেকে বের হতে পারছেন না; কিন্তু তার যাদুর কলম চলছেই।
আমরা চাই, কলমের মতোই তার জীবনও স্বাচ্ছন্দ্য থাকুক। জাতি তার শততম জন্মদিন পালন করুক।
লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন