করোনাভাইরাস তান্ডবে লকডাউনের আগে ঢাকায় আসত দৈনিক ১০০ থেকে ১২০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। তখন ঢাকায় অপারেট করত বিশ্বের শীর্ষ প্রায় ২৫ এয়ারলাইন্স। এখন সেটা করছে মাত্র ৬ এয়ারলাইন্স। একইভাবে আগে দেশের অভ্যন্তরে চলত দৈনিক শতাধিক ফ্লাইট। এখন সেখানে চলছে ৬০ থেকে ৬৮টি। করোনা্য এভিয়েশনে বড় ধরনের বিপর্যের পর গত ১৬ জুন থেকে দেশে চালু হয়েছে আন্তার্জাতিক ফ্লাইট। গত এক মাস ধরে লকডাউন না থাকলেও ফ্লাইট চলাচল আগের অবস্থায় পুনরোদ্যমে এখনও ফেরেনি। নতুন স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে দেশী-বিদেশী ফ্লাইট চালু করা হলেও দিন দিনই বাড়ছে যাত্রীর চাহিদা ও ফ্লাইটের সংখ্যা।
কয়েকটি রুটে বিমান সিডিউল ফ্লাইট চালু করার পাশাপাশি স্পেশাল ফ্লাইটও অপারেট করা হচ্ছে।
সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেছেন, ‘এখন থেকে ফ্লাইট বাড়তে থাকবে। গত একমাসে ৫টি এয়ারলাইন্সকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আরও অন্তত তিনটি এয়ারের আবেদন বিবেচনায় রয়েছে। এভাবেই ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশের অবস্থা দেখলে চলবে না।
পৃথিবীর অনেক দেশেই এখনও করোনার ছোবল ভয়ঙ্কর অবস্থায়্। ওরা যখন নিরাপদ মনে করবে তখনই চলাচল বাড়াবে।
সিভিল এভিয়েশনের ফ্লাইট সেফটির পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরি জিয়াউল কবীর জানিয়েছেন, লকডাউনের আগে গত মার্চের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক বছরে ফ্লাইট অপারেট করা হয়েছে মোট ৫৭ হাজার ১৬৪টি। যার যাত্রী সংখ্যা ছিল ৮৩ লাখ ৩০ হাজার ৯৯টি। অভ্যন্তরীণেও ছিল রেকর্ডসংখ্যক।
গত ২৫ মার্চ দেশে লকডাউন ঘোষণা করার পর থেকেই সেটা কমতে থাকে যা একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়।
বাণিজ্যিক সিডিউল ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিরানভূমিতে পরিণত হয়। কিন্তু বিশ্ব বাস্তবতায় এভিযেশন রুট কখনই বন্ধ হওয়ার নয়। বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ন্যূনতম পর্যায়ে স্বাভাবিক রাখতে নন-সিডিউল বিশেষ ফ্লাইট ও কার্গো ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
এ সময়ে দেশ থেকে দেশান্তরে পণ্য পরিবহনে বিশেষ করে করোনা চিকিৎসা সামগ্রী আদান-প্রদানের প্রয়োজনে ঢাকায় গড় পড়তায় প্রতিদিনই কার্গো ও স্পেশাল প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট চলাচল অব্যাহত থাকে। এক পর্যায়ে সেটা আরও ব্যাপকতা পায়। তবে ঢাকা থেকে সব আন্তর্জাতিক রুট বন্ধ থাকলেও শুধূু বাকি ছিল চীন।
করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের সঙ্গে ঢাকা থেকে বেসরকারী ইউএস বাংলার কার্গো ও সিডিউল ফ্লাইট নিয়মিত অপারেট করা হয়। বিগত এপ্রিল ও মে মাস পুরোটাই ছিল স্পেশাল ফ্লাইটের ওঠানামা। এ সময়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজসহ বিশ্বের সব নামীদামী এয়ারল্ইান্সের স্পেশাল ফ্লাই্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাতায়াত করে। ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিক ও অন্য নাগরিকরা তাদের নিজ দেশের এয়ারলাইন্স ব্যবহার করে গন্তব্যে ফিরে যায়। এমনকি সুদূর রাশিয়ার বিখ্যাত এরোফ্ল্যাট এয়ারের ফ্লাইটও ঢাকায় এনে রূপুপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে কর্মরত প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা দলবেঁধে বাংলাদেশ ছেড়ে যান। আসে কোরিয়া ও জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটও। এভাবে করোনা ক্রান্তিকালে এভিযেশনের চাকা স্বাভাবিক রাখার মতো দৃশ্য চোখে পড়ে। এ অবস্থায় গত ১ জুন থেকে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ প্রথমে অভ্যন্তরীণ রুট এবং ১৬ জুন থেকে আন্তর্জাতিক রুট খুলে দেয়।
বেবিচকের মতে, বাংলাদেশে লকডাউনের দীর্ঘ ছুটি থাকলেও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে আইকাও গাইড লাইন অনুযায়ী সীমিতকারে ফ্লাইট চালু করা হয়। এ জন্য গত মে মাসে ঢাকায় হয়ে গেছে আইকাও-এর সঙ্গে যুক্ত ব্রিফিং। এতে করোনা পরিস্থিতির মাঝে পুনরায় বিমান চলাচলের বিষয়ে আলোচনা করেছেন এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সিভিল এভিয়েশন খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা। দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী অনলাইনে এই সভায় করোনা পরিস্থিতিতে নেয়া পদক্ষেপ, মোকাবেলা পদ্ধতি ও পরিস্থিতির উত্তরণ নিয়ে আলোচনা হয়। এরপরই ১৬ জুন থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হয় যা এখন ক্রমেই উর্ধমুখী। ফ্লাইটের ক্রমবর্ধমান চিত্র যথেষ্ট আশাব্যনঞ্জক দাবি করে বেবিচক পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরি জিয়াউল কবির দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আশা করছি এটা দিন দিনই বাড়বে। আগামী শীতে তা স্বাভাবিক হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
সর্বশেষ রবিবার পর্যন্ত জানা যায়, বর্তমানে বিমান, ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ারের ফ্লাইট প্রতিদিন চলাচল করছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আসন ফাকা রেখে বর্তমানে চলছে অভ্যন্তরীণ রুট। প্রতিদিন গড়-পড়তায় এখন প্রায় তিনটে এয়ারলাইন্সে কমপক্ষে ৬৪ থেকে ৭০ ফ্লাইট চলাচল করছে। এর মধ্যে ইউএস-বাংলা একাই অপারেট করছে দৈনিক ৩৬টির বেশি ফ্লাইট। অভ্যন্তরীণ রুটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কক্সবাজার বিমানবন্দর চালু হলে এ সংখ্যা উন্নীত হবে এক শ’র কাছাকাছি। বেবিচক জানিয়েছে’ পবিত্র ঈদ-উল-আজহার পর কক্সবাজার চালু হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।