হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে লাগেজ পেতে বিলম্ব, ট্রলির সংকট ও যাত্রীসেবার নানা অনিয়ম নিয়ে বিতর্ক চলছে। এসব সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা ও প্রতিবাদও জোরালো হয়েছে। তবে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেশের অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা উপেক্ষা করা কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিমানবন্দরকে প্রায়ই একটি দেশের দর্পণ বলা হয়। বিদেশি যাত্রীদের কাছে দেশের পরিচিতি ও ব্যবস্থাপনার প্রথম ধারণা তৈরিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরে সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
ঢাকার সড়কে যানজট, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার দৃশ্য নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকাশ করে। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসাসেবায় অবহেলার অভিযোগ, আদালত ও ভূমি অফিসের জটিলতা এবং সরকারি সেবা পেতে হয়রানি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। এসব প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বিমানবন্দরের সমস্যার সমাধান করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সঠিকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিজস্ব ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি চুক্তির ভিত্তিতে অন্যান্য এয়ারলাইনসকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেয়। ফলে লাগেজ ওঠানো-নামানো ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বিবেচনা করেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া লাগেজ চুরি বা অনিয়মের ভিডিও নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কিছু ভিডিও প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে পারে, আবার কিছু বিভ্রান্তিকর বা সম্পাদিত হতে পারে। তাই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। একই সঙ্গে প্রকৃত অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ট্রলি বাড়ানো কিংবা কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং ধারাবাহিক তদারকি। রাজনৈতিক নেতাদেরও প্রতিবাদের ক্ষেত্রে শালীনতা ও সংযম বজায় রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার বাইরে নয়। সড়ক, হাসপাতাল, আদালত ও সরকারি অফিসের দুর্বলতা রেখে শুধু বিমানবন্দরকে আদর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
বিমানবন্দরকে দক্ষ করতে হলে দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও দক্ষ করে তুলতে হবে। কারণ দর্পণ শুধু প্রতিচ্ছবি দেখায়; বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হলে পরিবর্তন আনতে হবে পুরো ব্যবস্থায়।