হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যমাত্রা আগামী ১৬ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হলেও এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। আধুনিক এই টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব নিতে জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া চারটি শর্তকে কেন্দ্র করে আলোচনা জটিল হয়ে উঠেছে। অবকাঠামো নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে অচলাবস্থা দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার পরও পরিচালনার চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
থার্ড টার্মিনালের মতো একটি বৃহৎ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে এর পরিচালনব্যবস্থা, আর্থিক কাঠামো এবং চুক্তির শর্তের ওপর। তাই দ্রুত উদ্বোধনের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজস্ব ভাগাভাগি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের বাণিজ্যিক ঝুঁকি বণ্টন, আইনি দায়মুক্তি এবং নির্মাণকাজের ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে যেসব মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলোর গ্রহণযোগ্য সমাধান জরুরি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কার্যক্রমের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের রাজস্বের অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব এবং প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে বিশেষ সুবিধা চাওয়ার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব শর্ত দেশের আর্থিক স্বার্থ ও আইনি কর্তৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে চুক্তির প্রতিটি ধারা সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি ও বিমান চলাচল খাতে পড়তে পারে।
আমরা মনে করি, বিজয় দিবসে টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায্য বাণিজ্যিক শর্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, সম্ভাব্য আয় এবং দায়িত্বের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে দরকষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
এ কারণে বিকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে এবং দেশের স্বার্থের অনুকূলে চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ বাড়বে।
যেহেতু চুক্তির বিষয়টি আইন ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও আইনি মূল্যায়ন অপরিহার্য। প্রতিটি শর্তের সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করে এমন একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা দেশের রাজস্ব, আইনি কর্তৃত্ব এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখবে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই উদ্বোধনের তারিখ রক্ষার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও বিশ্বমানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, কঠোর পর্যালোচনা এবং স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে দ্রুত টার্মিনালটি চালু করা এখন সময়ের দাবি।