তবে বিমানের জ্বালানির চাপ কমে যাওয়ার খবর উড়িয়ে দিয়েছেন বিমানের প্রকৌশলীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, ইঞ্জিনের একটি অংশে নাট ঢিলে হয়ে যাওয়ার কারণে মবিল পড়েছিল। তেলের ট্যাংকে তেল ঠিকই ছিল।
হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে আনতে বিশেষ বিমান (আকাশ প্রদীপ) আজ হাঙ্গেরি যাচ্ছে। এ বিমানে কোনো ধরনের ত্রুটি আছে কি না তা কয়েক দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীরাও সেটি পরীক্ষা করেছেন।
জানা গেছে, আগামী বছরের মধ্যেই ভিভিআইপিদের জন্য বিশেষ নতুন বিমানটি কেনা হচ্ছে। এ বিমান দিয়ে শুধু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দেশ-বিদেশে সফরে আনা-নেওয়ার কাজ করা হবে।
বিমান বিকল হওয়া প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন গত সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি আকস্মিকভাবে অন্য একটি দেশে অবতরণ করায় বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। কোনো ধরনের সাবোটাজ ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তাদের রিপোর্টে যা আসবে তা আমলে নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়িত্বে অবহেলার সঙ্গে প্রকৌশলী, পাইলট বা বিমানের কোনো লোকজন জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রবিবার বুদাপেস্টে পানি সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে (বোয়িং ৭৭৭ ফ্লাইট-রাঙ্গা প্রভাত) করে রওনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রানওয়ে ছেড়ে যাওয়ার পর টানা চার ঘণ্টা স্বাভাবিক গতিতে চলার পর আফগানিস্তানের আকাশসীমায় পৌঁছায় বিমানটি। হঠাৎ মধ্য আকাশে বিমানের ইঞ্জিনে ত্রুটি ধরা পড়ে। পাইলটরা দেখতে পান ককপিটে লালবাতির সংকেত যার রিডিং ছিল ইঞ্জিনে তেলের প্রবাহ কমে গেছে। এ অবস্থায় উড্ডয়ন ঝুঁকিপূর্ণ। তাত্ক্ষণিক ঘোষণা দেওয়া হয়, জরুরি অবতরণ করতে হবে। পরে বাংলাদেশ সময় দুপুর আড়াইটায় তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করা হয়। এরপর বিমানটি বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই প্রকৌশলীরা যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করেন। এই ঘটনার পর দেশ-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়। ওই দিন রাতেই বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশেষ বৈঠক করেন। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠক করেছেন। মন্ত্রী, সচিবসহ অন্যরা আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকগুলোতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা একটি বিমান কেনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ভিভিআইপিদের জন্য একটি উন্নতমানের বিমান কিনতে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে বিমান কেনা হবে। এই জন্য মন্ত্রিসভার আগামী বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। একটি বিমান কিনতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লাগে। আর রবিবারের ফ্লাইটটি আকাশে উড়াল দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আরো জোরালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। তাহলে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটত না। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
গতকাল সকালে বিমানের ফ্লাইট অপারেশনে দেখা যায়, আশখাবাদে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট জরুরি অবতরণের জন্য প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিনের একটি নাট ঢিলা হওয়াকেই দায়ী করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ইসমাইল রাঙ্গা মেইনটেন্যান্স লগ বুকে লিখেছেন, ইঞ্জিনে অয়েল প্রেসার কমে যাওয়ার দরুন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। আশখাবাদে সেটা মেরামতের সময় দেখা যায়, একটি নাট ঢিলা অবস্থায় রয়েছে। এ কারণেই অয়েল (মোবিল) পড়ে যাওয়ায় চাপ কমে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানের বাঁ দিকের ইঞ্জিনের ‘ইঞ্জিন অয়েল’ কমে যাওয়ায় ওই ঘটনা ঘটে। পাইলটরা বেশ কিছুক্ষণ আগে বিষয়টি ধরতে পারেন। ককপিটের মনিটরে তা ইন্ডিকেট করছিল। পরে কেবল কয়েকটা নাট-বোল্ট টাইট দেওয়াতেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে এমন ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অন্তত হাফ ডজন পাইলট ও প্রকৌশলী ফেঁসে যেতে পারেন। তাঁদের সাময়িক বহিষ্কার করা হতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, জরুরি অবতরণকারী ফ্লাইটটি মেরামতের পর ক্যাপ্টেন ইসমাইল লগ বুকে যা লিখেছেন তা সত্যি হলে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগের। একটি নাট লুজ হওয়ার মানে হয় সেটা সাবোটাজ, না হয় গাফিলতি। ভিভিআইপি ফ্লাইট টেক অফ করার ২৪ ঘণ্টা আগে বুঝিয়ে দিতে হয় এসএসএফকে। তার আগেই সেটার সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় একাধিকবার।
বিমানের কয়েকজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি যখন দেশের বাইরে সফরে যান তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে তাঁরা কোন বিমানে যাবেন তা চূড়ান্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিমান কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তারক্ষীরা সব কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বিমানটিতে কেন ত্রুটি ধরা পড়ল তা গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। আর না হয় এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে বিমান কর্তৃপক্ষের কিছু না কিছু গাফিলতি আছে বলে মনে হচ্ছে।
বিমান সূত্র জানায়, বিমানে ত্রুটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপর কমিটি করা হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমার সরকারের নেতৃত্বে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কারো গাফিলতি থাকার প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুসাদ্দিক আহমেদ।
সূত্র জানায়, পর পর চার দফায় গোয়েন্দা ক্লিয়ারেন্স না পাওয়া এক পাইলটকে এবার প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে বিমান ম্যানেজমেন্ট। অভিযোগ আছে, নানা তদবির করে তাঁর জন্য গোয়েন্দা ক্লিয়ারেন্স জোগাড় করেছে বিমান এবং ক্লিয়ারেন্স পেতে বিমানের একজন জেনারেল ম্যানেজার ও একজন বোর্ড মেম্বারকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সূত্র মতে, যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়া সেই উড়োজাহাজ রাঙ্গা প্রভাত তদন্তের জন্য এক দিন হ্যাঙ্গারে জব্দ রাখার পর মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছে। তদন্তকারীরা রাঙ্গা প্রভাত থেকে ডিএফডিআর (ভয়েস রেকর্ডিং যন্ত্র) খুলে নিয়ে রেকর্ড করা ককপিটের সব কথোপকথন কপি করেছেন। ভয়েস রেকর্ডিংয়ে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে ফুয়েল প্রেসার লো হওয়ার কারণেই রাঙ্গা প্রভাতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়।
বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন গতকাল মঙ্গলবারও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। বিষয়টি তিনি নিজেই তদারকি করছেন যাতে এবার অতীতের মতো আইনের ফাঁকফোকরে দায়ী ব্যক্তিরা পার পেয়ে না যান। এ জন্য তিনি গতকাল সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরীর সঙ্গে নিজ অফিসে ডেকে কথা বলেছেন। এর আগে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েতে ধাতব বস্তু পড়ে থাকার ঘটনায় তদন্ত রিপোর্টের বিষয়বস্তু ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাও তিনি জানতে চান।
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ