এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা এয়ারক্রাফটের যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দায়ী মূল ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এ কারণে তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাইলট জরুরি ভিত্তিতে এয়ারক্রাফট অবতরণ করতে বাধ্য হন। ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দায়দায়িত্ব নিরূপণের জন্য পরদিনই তদন্ত কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এরপর কমিটি প্রায় প্রতিদিনই বৈঠকে বসেছে। এয়ারক্রাফট পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কাজও শেষ করে গত রবিবার তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনে কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী করা হয়েছে কি না তা প্রকাশ করা হয়নি। এভাবে অতীতের কোনো বড় ঘটনার ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষে কাউকে দায়ী করার নজির নেই।
কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, কমিটি বিমানের কাছে তাদের বিভিন্ন এয়ারক্রাফটের পাঁচটি দুর্ঘটনা উল্লেখ করে এসবের তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছে। এসব দুর্ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি এবারের দুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব নিরূপণ করবে। যেসব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধাতব বস্তুর তদন্ত। গত ৭ জুন সৌদি আরব সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিজি ০৩৬ এয়ারক্রাফটি নির্ধারিত সময়ের ২০ মিনিট পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটি অবতরণের আগে পাইলট রানওয়েতে ধাতব বস্তু দেখতে পেয়ে অবতরণ না করে ট্রাফিক কন্ট্রোলে যোগাযোগ করেন। ধাতব বস্তু সরানোর পর বিমান অবতরণ করে। এ ছাড়া একই দিনে বিজি ০৪৯ ফ্লাইট উড্ডয়নের আগেই দুই নম্বর ইঞ্জিন গরম হয়ে বিকল হয়ে যায়। গত ৩ মার্চ সৌদি আরবগামী বিজি ০৩৫ ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়ের শেষ প্রান্তের ব্যারিয়ার ভেঙে উড্ডয়ন করে। এয়ারক্রাফটের মোট ওজনের সঙ্গে ইঞ্জিনের শক্তির সমন্বয় না থাকায় পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
গত বছরের ১৫ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পথে দ্বিতীয় ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। তার আগের মাসে দুবাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এসব ঘটনায় কিভাবে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছিল তা জানতে চেয়েছে তদন্ত কমিটি।
বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পারেনি বিমান। এমনকি শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য গঠিত তদন্ত কমিটি দোষীদের চিহ্নিত করতে পারেনি। ২০০২ সালে কার্গো ফ্লাইট চালু হওয়ার পর কার্গোর পরিমাণ বাড়তে থাকে। বিমান কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এই কার্গো ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি করে। এসব কার্গো খোলা আকাশের নিচে রাখা হতো। এ কারণে কিছু মালামাল চুরি হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দিতে বিমান বাধ্য থাকলেও তা পরিশোধ করা হতো না। বৃষ্টিতে ভিজে মালামালের প্যাকেটের ট্যাগ ছিঁড়ে যাওয়ায় মালামালের মালিকানাই চিহ্নিত করা যেত না। তিন দিনের মধ্যে মালামাল সরবরাহের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিমান তিন মাসেও তা পারত না। এ অবস্থায় লন্ডনে সরাসরি কার্গো পরিবহন নিষিদ্ধ করে যুক্তরাজ্য। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কার্গো এলাকার পরিবেশ উন্নতির কাজে নামেন সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। তিনি দফায় দফায় কার্গো কমপ্লেক্স পরিদর্শন করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটান। শেষ পর্যন্ত অনিয়ম সৃষ্টিকারীদের খুঁজে বের করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির মূল কাজ ছিল যারা এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তাদের দায়ী করে শাস্তি দেওয়া। গত মাসে তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিয়েছে। কমিটি কার্গো এলাকার অব্যবস্থাপনার জন্য কাউকে দায়ী করতে পারেনি। কমিটি যে সুপারিশ করেছে তাও দায়সারা গোছের।
কার্গো কমপ্লেক্সের একজন কর্মকর্তা জানান, কার্গো চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি দেওয়া হয় না। বিমানের গত পাঁচ বছরের কার্গো প্রতিবেদন অনুযায়ী কাজে অবহেলার জন্য পণ্য হারিয়ে যাওয়ার পরও কারো কাছ থেকে মূল্য আদায় করার কোনো নজির নেই। কার্গো হারিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের অব্যাহতির প্রক্রিয়া ঠিক ছিল না। তাদের শুধু সতর্কীকরণের মাধ্যমে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা আদালতে গিয়ে ফের চাকরি ফিরে পায়।
গত বছর ২৯ ফেব্রুয়ারি বিমানের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে একটি এয়ারক্রাফট থেকে ৬১ কেজি সোনা উদ্ধারের তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ ঘটনা তদন্ত করার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয় তদন্ত করার নির্দেশ দেয় বিমানকে। বিমান এ ঘটনা তদন্ত করার দায়িত্ব দেয় তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক আতিক সোবহানকে। অথচ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই তদন্তে দায়ীদের চিহ্নিত করা হয়নি। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁকেই কেন তদন্ত কমিটির প্রধান করা হলো? মন্ত্রণালয় তিন কার্যদিবসের মধ্যে এর জবাব চেয়েছিল। বিমান জবাবে জানিয়েছিল, তদন্তকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। এ নিয়ে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে অভিযোগকারীর নাম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পরও কেন তারা অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারল না?
বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর বিমানের সাবেক চেয়ারম্যানের কথিত পালকপুত্রের প্রভাব বিস্তার এবং সোনা চোরাচালানে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই সময় এসব বিষয় নিয়ে সংসদেও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ পায়নি তদন্তদল। এর আগে তদন্ত করা হয় বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) খাবারের মান নিয়ে। মান খারাপ হয়ে যাওয়ায় এ সংস্থার খাবার বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো বর্জন করে। কেন এবং কাদের গাফিলতিতে খাবারের মান খারাপ হয়েছে তা খুঁজে বের করার জন্য গঠিত তদন্ত কমিটিও সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করতে পারেনি।
বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান ইচ্ছা করে এসব ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে না। কারণ বিমানের টপ ম্যানেজমেন্টের হাতে গোনা কয়েকজন এসব ঘটনার তদন্ত করেন। টপ ম্যানেজমেন্টের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এসব অনিয়ম হতে পারে না। অথচ তাঁদেরই এসব ঘটনার তদন্ত করতে দেওয়া হয়। সবাই মিলেমিশে ভাগযোগ করে লুটপাট করার জন্যই তদন্তে কাউকে দায়ী করা হয় না।
করপোরেশনকালীন বিমান বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘যত্নশীলভাবে তদন্ত করলে অবশ্যই দোষীদের চিহ্নিত করা যাবে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো দোষীদের চিহ্নিত করা যাবে না, সেটা বিরল ঘটনা। আর প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী এয়ারক্রাফটের থরো চেকআপ (পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা) করা বাধ্যতামূলক। তাই কারা এখানে গাফিলতি করেছে সেটা খুঁজে বের করা কোনো কঠিন কাজ নয়। তাদের চিহ্নিত করা না গেলে প্রশ্ন উঠবেই। ’
সূত্রঃ দৈনিক কালেরকন্ঠ