বিমান চালাবে টাস্কফোর্স

বিমানের সব কাজ নিবিড়ভাবে তদারক করবে টাস্কফোর্স। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ টাস্কফোর্স গঠন করবে। এ ছাড়া বিমানে কর্মরত প্রত্যেকের বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সংস্থাটির সব শ্রেণির চাকরি অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। বিমানের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার আশায় এসব প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বৃহস্পতিবার এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে নির্দেশ দিয়ে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিইও এ এম মুসাদ্দিক আহমেদ গতকাল বলেন, ‘চিঠিটি আমি এখনো পড়িনি। ’ তবে এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এসব প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে প্রধানমন্ত্রীকে বিমানে কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টাস্কফোর্স গঠন ও এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণার বিষয়টিও রয়েছে। ’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী গত ২৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় সফরে হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে তাঁকে বহনকারী এয়ারক্রাফটটিতে যে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় তা বাংলাদেশ বিমানের অনেক সমস্যা সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে। কারণ বিমানকে এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণা বা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দীর্ঘদিন থেকে আলোচনা হচ্ছিল। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিল না। এবার এই দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সবাই নড়েচড়ে বসায় সমস্যা সমাধানের পথ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ত্রুটি মনুষ্যসৃষ্ট—তিনটি তদন্ত প্রতিবেদনেই বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মতামতের আলোকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চার দফা সুপারিশ করে। সব সুপারিশই প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—বিমানের সব কাজ নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে টাস্কফোর্স গঠন; বিমানের সব শ্রেণির চাকরি অত্যাবশ্যকীয় বা এসেনশিয়াল সার্ভিস হিসেবে ঘোষণা করা; বিমানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করা এবং বিমানের সংস্কার ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা।

বর্তমানে বিমানের ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী পুলিশি রিমান্ডে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট ঘিরে চলমান মামলার পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিমানের সব শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হবে। বিমানের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিমানে চাকরি করে নানা অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অসাধু কর্মচারীরা। বিমানে এমন কর্মকর্তা-কর্মচারী পাওয়া মুশকিল যাঁদের রাজধানীতে বা বড় শহরগুলোতে অঢেল সম্পত্তি নেই। আর কর্মকর্তাদের প্রায় সবারই বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে থেকে পড়ালেখা করে। তাঁদের সম্পদ নিয়ে কখনো তদন্ত হয় না। বিভিন্ন ঘটনা ঘটলে কেবল সেসব ঘটনার তদন্ত হয়। এসব তদন্ত প্রতিবেদনে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার খুব বেশি উপাদান রাখা হয় না। এবার সবার গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হলে সবার থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। তবে সংশ্লিষ্টদের মত, এখানে একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে, এসব গোয়েন্দা প্রতিবেদন যেন নিরপেক্ষভাবে করা হয়। তা না হলে হয়রানির অভিযোগ উঠবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিমানে আগে কখনোই নেওয়া হয়নি। এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো একটি বিষয় চিহ্নিত করা দরকার, তা হচ্ছে বিমানে আত্মীয় না থাকলে কারো চাকরি হয় না। সংস্থাটির পাইলট থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবারই আত্মীয়স্বজন রয়েছে। এ কারণে সংস্থাটিতে কখনোই কোনো শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করা যায় না।

বিমানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে বিমানের ওপর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এর পরও মন্ত্রণালয়কে বিমানের জন্য সর্বত্র জবাবদিহি করতে হয়। টাস্কফোর্স গঠন করা হলে মন্ত্রণালয়ের হাতে বিমানের নিয়ন্ত্রণ আবার কিছুটা ফিরে আসবে। টাস্কফোর্সের পরও ঝামেলা থেকেই যাবে যদি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীকে বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা না হয়। তিনি আরো বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিলের হাতে বিমানের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পরে তাঁর হাতে বিমানের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। এর পরই মাহবুব জামিল বিমানের জন্য অত্যাধুনিক ১০টি এয়ারক্রাফট কেনার জন্য বোয়িং কম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে পেরেছেন। বিমানের এয়ারক্রাফট কেনার ক্ষেত্রে এই চুক্তিই একমাত্র চুক্তি যা কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারেনি।

অত্যাবশ্যকীয় সার্ভিস ঘোষণা করলে বিমানে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সংস্থাটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এখন অনেকেই ওভারটাইম না করেও বিল নিয়ে যাচ্ছে। অফিসে না থেকেও হাজিরা দিয়ে চলেছে। কথায় কথায় ধর্মঘট ডেকে বিমানবন্দর অচল করে দেয়। এসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আসবে। বিমানের দৈনন্দিন কাজে যে অব্যবস্থাপনা তা দূর করার জন্য এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণা করা হচ্ছে। তা ছাড়া সোনা চোরাচালানের সঙ্গে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা, সিবিএ নেতারাসহ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নেতিবাচক কর্মকাণ্ড—এসব বিষয় বিবেচনা করেই এসেনশিয়াল সার্ভিস ঘোষণা করা হচ্ছে।

বিমানকে ঢেলে সাজানোর জন্য নানা সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন বিমানকে কম্পানি করা হয়েছিল তখনো তত্কালীন সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদনের আলোকেই বিমানে সংস্কার করা হয়। জনবল প্রায় ছয় হাজার থেকে নামিয়ে আনা হয় তিন হাজার ৪০০ জনে। এবারও বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি বিমানে সংস্কারের জন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। সেই প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করা হবে। অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে কারা থাকবেন জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত সারসংক্ষেপেই রয়েছে কাদের সমন্বয়ে এ কমিটি করা হবে। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মহাপরিচালক থাকবেন, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই, এনএসআই, কাস্টমস (শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর), বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।

বিমান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে গত ২৭ নভেম্বর থেকে। সেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিমানের একটি ফ্লাইট হাঙ্গেরি যাচ্ছিল। কিন্তু এয়ারক্রাফটটি দুই ঘণ্টা ২৮ মিনিট ওড়ার পর পাইলট ও ক্যাপ্টেন খেয়াল করেন এয়ারক্রাফটটির বাঁ পাশের ইঞ্জিনে তেলের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। প্রায় ৩০ মিনিট পর ইঞ্জিনের অয়েল প্রেসারও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। এর ফলে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই এয়ারক্রাফটটি তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। এর পর থেকে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে। বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি মনুষ্যসৃষ্ট বলে চিহ্নিত করা হয়। তাদের সুপারিশের আলোকে কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন।

Comments (0)
Add Comment