যদিও এমিরেটস এয়ারলাইনস, কাতার এয়ারওয়েজ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের মতো রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা নিয়ন্ত্রকদের নীতিসহায়তা নিয়ে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেছে। নিজ নিজ দেশের ব্র্যান্ডিংয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এসব এয়ারলাইনস। অথচ রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনস হয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশেই ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। এতে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংও।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্লাইট পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানি বাবদ। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে এখনো অনেক বেশি দামে জেট ফুয়েল কিনতে হচ্ছে বিমানকে। সরকারের কাছ থেকে প্রতি গ্যালন জেট ফুয়েল কিনতে বিমানকে খরচ করতে হচ্ছে ২ ডলার ৫৮ সেন্ট। যদিও বিশ্বব্যাপী, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এর প্রায় অর্ধেক দামে জেট ফুয়েল বিক্রি হচ্ছে। দিল্লিতে বর্তমানে প্রতি গ্যালন জেট ফুয়েল বিক্রি হচ্ছে ১ ডলার ৪২ সেন্টে। একই জেট ফুয়েল বেইজিংয়ে পাওয়া যাচ্ছে ১ ডলার ৩৩ সেন্ট ও কুয়ালালামপুরে আরো কমে ৯৫ সেন্টে। অর্থাত্ প্রতি গ্যালন জেট ফুয়েলের মূল্য বাবদই বিমানকে ১ ডলার করে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। একটি ফ্লাইটে ৪০ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল লাগলে শুধু জ্বালানি বাবদই বিমানকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। এতে প্রতিযোগী বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে বিমান।
জেট ফুয়েলের এ মূল্যবৈষম্য শুধু বিমানের নয়, দেশের এভিয়েশন শিল্পের উন্নয়নেই প্রধান প্রতিবন্ধক বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি এয়ারলাইনস সংস্থা নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটের ক্ষেত্রে বেশি দামে জেট ফুয়েল কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাটও পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদেরও বেশি দামে টিকিট কিনতে হচ্ছে।
বিমানের বহরে যুক্ত করার জন্য ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আনা হয় চারটি বোয়িং-৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে বিমানের বহরে যুক্ত হয়েছে দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর। নতুন প্রজন্মের এসব উড়োজাহাজ আনার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বড় দূরত্বে ফ্লাইট পরিচালনা করা। যদিও বড় দূরত্বে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে ঢাকা-লন্ডন রুটেই এখন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ বিমান।
বড় দূরত্বে বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারার মূলে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে না পারা। কারণ বেবিচক ক্যাটাগরি-২-এ থাকায় সংস্থাটি থেকে অনুমোদন নেয়া উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশকিছু দেশে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পাচ্ছে না। একই কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া কোনো উড়োজাহাজেরই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি নেই। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বহুল প্রতীক্ষিত বিমানের নিউইয়র্ক রুটটিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে এখনো ট্রানজিট যাত্রীবান্ধব করতে পারেনি সরকার। এ কারণে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাত্রী পরিবহনের ব্যবসা হারাচ্ছে বিমান। বিমান বলছে, অন্যান্য দেশে বিনামূল্যে ট্রানজিট ভিসা মিললেও ঢাকায় একজন যাত্রীকে এজন্য ২১ ডলার খরচ করতে হয়। আবার ট্রানজিট ভিসা না নিয়ে একজন যাত্রীর পক্ষে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসে থাকাও সম্ভব নয়। ফলে ট্রানজিটের জন্য অন্য দেশের এয়ারলাইনসকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন যাত্রীরা।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বিমানের আয়ের অন্যতম প্রধান খাত কার্গো পরিবহন। কিন্তু বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সরকারের পদক্ষেপের ঘাটতির কারণ দেখিয়ে গত বছর মার্চে ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে যুক্তরাজ্য। একই বছরের জুনে বন্ধ হয়ে যায় জার্মানিতে কার্গো পরিবহন। এর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট নিষিদ্ধ করে।
এসবের প্রভাব পড়েছে বিমানের কার্গো পরিবহন খাতের আয়ে। গত অর্থবছর এ খাত থেকে এয়ারলাইনসটির আয় কমেছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ডের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন থেকে বিমান আয় করেছে ৩১৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর এ খাত থেকে এয়ারলাইনসটির আয় হয়েছিল ৩৯২ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ.এম. মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) সব শর্ত পরিপালন করে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বিমান। রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনস হিসেবে বিমান সব সময়ই দেশের স্বার্থ আগে দেখে; অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসাকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। বিভিন্ন দেশে অনেক বাংলাদেশী রয়েছেন। কোনো কারণে তাদের মৃত্যু হলে খরচ ছাড়াই বিমান তাদের দেশে নিয়ে আসে। পাশাপাশি হজ মৌসুমে বাণিজ্যিক সব ফ্লাইটের ঊর্ধ্বে রাখা হয় হজ ফ্লাইট।
তিনি আরো বলেন, বোয়িং থেকে যেসব উড়োজাহাজ কেনা হয়েছে, তার বিপরীতে ২০১১ সাল থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছে বিমান। আর এ অর্থ বিমান নিজেই আয় করেছে।
দেশের বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো দুর্বলতাও বিমানের পিছিয়ে পড়ার আরেকটি কারণ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতি বছর যাত্রী পরিবহন বাড়লেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি এখনো সর্বাধুনিক করতে পারেনি সরকার। পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় বোর্ডিং ব্রিজের স্বল্পতা ও ইমিগ্রেশনের অদক্ষতায় সময়ক্ষেপণ হচ্ছে যাত্রীদের। বিমানবন্দরের পাঁচটি লাগেজ ডিপারচার বেল্টের মধ্যে দু-একটি প্রায়ই নষ্ট থাকে। এতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না যাত্রীসেবার মানে।
অবকাঠামো দুর্বলতা রয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও। রানওয়ের শক্তি না থাকায় চাহিদা সত্ত্বেও পূর্ণ জ্বালানি ও যাত্রী নিয়ে বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজ বিমানবন্দরটি থেকে উড্ডয়ন করতে পারছে না। ফলে লন্ডনগামী যাত্রীর অধিকাংশই সিলেটের হলেও তাদের যেতে হচ্ছে ঢাকা থেকে।
বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, সিলেট বিমানবন্দরে রাতের অপারেশন নেই। সারা রাত বোয়িং-৭৭৭-এর মতো বড় উড়োজাহাজ সিলেটে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বিমানের।
ভবিষ্যতে বিমানের আরো ভালো করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ মোমেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিমান আরো ভালো করবে, তবে এজন্য প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। পাশাপাশি বিমানের অভ্যন্তরীণ জনবলকেও আরো দক্ষ করে তুলতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমান পরিচালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে সরকারের। বিমানের পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো এখনো করতে পারেনি সরকার। ফলে অদক্ষ জনবল নিয়েই অনেক সময় কাজ চালিয়ে যেতে হয় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ সংস্থাটিকে। লাইসেন্স না থাকা টেকনিশিয়ান দিয়ে বিমানের ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিদর্শনের মতো ঘটনাও ঘটেছে সম্প্রতি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দীর্ঘদিন এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ নিষেধাজ্ঞা থাকায় দীর্ঘসময় বিমানে কোনো জনবল নিয়োগ না হওয়া। আবার অনেক সময় সরকার জোর করে নানা সিদ্ধান্ত বিমানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, যার অনেকগুলো ব্যবসাবান্ধব না হওয়ায় বিমানের লোকসান বেড়েছে।
বিমানের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার আগ পর্যন্ত বিমানের লোকসান ছিল ১ হাজার ১৮২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার পর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৫ কোটি ১৯ লাখ ও ২০০৮-০৯-এ ১৫ কোটি টাকা মুনাফা করে সংস্থাটি। তবে ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে আবারো লোকসান শুরু হয়। ওই অর্থবছর ৮০ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৯১ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছর ৬০০ কোটি ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২১৪ কোটি টাকা লোকসান দেয় বিমান। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিমানের লোকসান হয় ১৯৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে গত দুই অর্থবছর লাভ করতে সমর্থ হয় বিমান। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩২৪ কোটি ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭৬ কোটি টাকা মুনাফা করে বিমান।
সূত্রঃ বণিকবার্তা