গত ১৪ মার্চ লন্ডনের পার্ক-লেইনস্থ হিলটন হোটেলে ওয়েলস বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ইউকে’র নেতৃবৃন্দ সৌজন্য সাক্ষাতের সময় প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের কাছে ব্রিটেন প্রবাসীদের ১০ দফা দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি প্রদান করেন। তাতে অন্যতম দাবি ছিল ভারত থেকে বাংলাদেশে ব্রিটিশ ভিসা অফিস ফিরিয়ে আনা।
প্রসঙ্গত, কমনওয়েলথ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে ব্রিটেনের আলাদা মর্যাদার সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ অর্থনীতিতে প্রতিবছর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা ১২ বিলিয়ন পাউন্ড অর্জন করে। ব্রিটেন হচ্ছে বাংলাদেশে ৩য় বৃহত্তর বিনিয়োগকারী দেশ। বাংলাদেশে প্রায় ২ বিলিয়ন পাউন্ডের ব্যবসা পরিচালনা করে ব্রিটেন। সমপরিমাণ আমদানি হচ্ছে ব্রিটেনেও। ৭০টি বড় মাপের ব্রিটিশ কোম্পানি রয়েছে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশও কয়েকশ মিলিয়ন পাউন্ডের আমাদানি করে ব্রিটেন থেকে। দাতা হিসেবেও ব্রিটেন প্রথম কাতারে। বছরে দেড়শ থেকে ২শ’ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান দেয়া হচ্ছে ইউকেএইডের মাধ্যমে। আর ব্রিটিশ বাংলাদেশিরাও ব্রিটেনের অর্থনীতির সহায়ক। একটি মাত্র ইন্ডাস্ট্রি-রেস্টুরেন্ট সেক্টরেই বছরে টার্নওভার প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন পাউন্ড। সেই সূত্রে বিজনেস ভিসা, চিকিৎসা ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা, ভিজিটর ভিসা, ফ্যামেলি ভিসা, এন্টারটেইনম্যান্ট ভিসা ইত্যাদি নানা ধরনের ভিসায় নিয়মিতই বাংলাদেশের মানুষের ব্রিটেন যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একইভাবে ব্রিটেন প্রবাসীদের বিশাল ব্যবসা বাণিজ্য ও সম্পদ রয়েছে সিলেট তথা বাংলাদেশে। বিশেষ করে ব্রিটেনে নানা ধরনের ব্যবসায়িক সূত্রতা রয়েছে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ভিসা জটিলতা এ ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ২১ হাজার ব্রিটিশ ভিসা দেয়া হয়। এরপরও দিন দিন নানা কারণে ব্রিটিশ ভিসার চাহিদা বাড়ছে।
সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী কয়েসও এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি গতকাল রাতে মুঠোফোনে বলেন, যুক্তরাজ্যে ভারতীয়দের চেয়ে বাংলাদেশিদের বসবাস বেশি। এছাড়া সেখানকার অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও বাংলাদেশিদের অবদান বেশি।
ব্রিটিশ অর্থনীতিতে প্রতিবছর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা ১২ বিলিয়ন পাউন্ড অর্জন করে। তাই এ ভিসাকেন্দ্র বাংলাদেশেই পূর্ণাঙ্গভাবে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তিনজন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারা বিরোধী দলের হলেও এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক। বিষয়টি নিয়ে আমি তাদের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা এ ব্যাপারে নতুন উদ্যোগ নেব। কারণ, বিষয়টি আমাদের সম্মানের সাথে জড়িত।
মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী আরো বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে যখন প্রথম কথাবার্তা শুরু হয় তখন আমি ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাথে যোগাযোগ করি। তখন তারা বলেছিলেন খরচ কমানোর জন্য তারা এটি করছেন। তখন আমি তাকে বলেছিলাম, যদি তাই হয় তহলে তো ব্রিটেনে বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের সংখ্যা বিচারে দিল্লীর কেন্দ্রটিই বরং ঢাকায় স্থানান্তর হতে পারে। কিন্তু এখন দিল্লী থেকে বাংলাদেশিদের ভিসার সিদ্ধান্ত আসাটা হতাশাজনক।
রাজধানী ঢাকা থেকে সকল প্রকার ব্রিটিশ ভিসা ইস্যু করা হয়েছে সেই সুদূর পাকিস্তান আমল থেকেই। স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকায় পূর্ণাঙ্গ ব্রিটিশ হাইকমিশন চালু হবার পর এখান থেকেই বাংলাদেশি নাগরিকরা সকল প্রকার ব্রিটিশ ভিসা লাভ করেছেন বিগত ৪২ বছর। কিন্তু গত বছর থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্রিটিশ ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লীর ব্রিটিশ হাইকমিশন থেকে। অথচ বর্তমানে যেখানে নানা ক্ষেত্রে দিন দিন বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের প্রসার ঘটছে সেখানে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটিশ ভিসার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দিল্লীতে চলে যাওয়া হতাশাজনক এবং স্বাভাবিক নয়। এর ফলে ইতিপূর্বে কয়েকবার যুক্তরাজ্য ভ্রমণকারীদেরও নতুন ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। অথচ ঢাকা থেকে দিল্লীতে ইউকে ভিসা প্রসেসিং স্থানান্তরের পূর্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছিলেন পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি আবেদনকারীরা নয়াদিল্লী ভিসা অফিস থেকে ব্রিটিশ ভিসা লাভ করবেন। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে এর বিপরীত।
ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বারের (বিবিসিসি) প্রেসিডেন্ট মাহতাব চৌধুরী জানান, ভিসা জটিলতার কারণে আমাদের এফবিসিসিআই’র মতো বড় বিজনেস ডেলিগেশনের অনেকের ভিসা হয়নি। আমরা মনে করি ভিসা অফিস স্থানান্তরের মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, ব্রিটেনও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে। যোগ্য মানুষেরা ব্রিটেনে ভ্রমণের আগ্রহ কম দেখাবে। প্রয়োজনে আমরা ভিসা ফি কিছুটা বেশি দিতেও রাজি আছি-কিন্তু স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের জন্য ভিসা ইস্যু হবে-ভিন্ন দেশে এটা মেনে নেয়া যায় না।
সোসাইটি অব বাংলাদেশি সলিসিটার্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সলিসিটার আবুল কালাম জানান, আমাদের বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাছ থেকেই আমরা জেনেছি, বর্তমানে ভিসা পেতে জটিলতা বেড়েছে এবং যথাসময়ে ভিসা না পাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। ভিন্ন দেশে অফিস স্থানান্তরই-এর প্রধান কারণ বলে আমরা মনে করি।
ব্রিটিশ কারী এওয়ার্ডের ফাউন্ডার এনাম আলী এমবিই’র মতে, ব্রিটিশ ভিসা অফিস ঢাকা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরের বিষয়টি আমার জন্য খুবই দুঃখজনক এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশ এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য অবমনাকর। এনাম আলী বলেন, বাংলাদেশে বছরে ২১ হাজারের বেশি ব্রিটিশ ভিসা ইস্যু হয় এবং সমপরিমাণ মানুষ নানা কারণে প্রতিবছর ব্রিটেন আসছেন। কিন্তু গত বছর থেকে বাংলাদেশে আর ব্রিটিশ ভিসার সিদ্ধান্ত হচ্ছে না, তা আসছে ভারতের দিল্লী থেকে। এ কারণে যথার্থ কাগজপত্র থাকার পরও ভিসা রিজেক্টের পরিমাণ বেড়েছে এবং ভিসা বিলম্বের জন্য ভুক্তভোগির সংখ্যাও বেড়েছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের ব্রিটিশ কারী এওয়ার্ডের কিছু অতিথি ভিসা পেয়েছেন অনুষ্ঠানের পর। ফলে সেই ভিসা কোনো কাজে লাগেনি।
তিনি বলেন, এভাবে যথার্থ ব্যক্তিত্ব হওয়ার পরও ভিসা দেয়া হচ্ছে না। এমনকি অনেকে এদেশে এক বা একাধিক বার ঘুরে গেছেন, কিন্তু এখন ভিসা পাচ্ছেন না। মূলত লোকাল নলেজ বলে ভিসা প্রদানে যে বিষয়টি আছে- সেটি দিল্লী থেকে কীভাবে কার্যকর হবে, সেটা আমরা বুঝতে পারি না। এ কারণে একজন যোগ্য ও সুপরিচিত মানুষের ভিসাও প্রত্যাখ্যাত হতে পারে-শুধুমাত্র ভিন্ন দেশে বসে না জেনে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে। তবে ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশন বিষয়টি মানতে নারাজ। তারা বলতে চাইছে ভিসাসংক্রান্ত যোগযোগের সময়সীমা এখনো কার্যকর রয়েছে।