‘সেবা প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা কমেছে, দুর্নীতি বেড়েছে’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নজরুল ইসলামের গবেষণার ক্ষেত্র নগরায়ণ। তিনি বর্তমানে নগর গবেষণা কেন্দ্রের সাম্মানিক সভাপতি। ঢাকা শহরের নাগরিকদের সমস্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এই নগরবিদ।
আপনি তো একসময় ওয়াসার চেয়ারম্যান ছিলেন। ওয়াসা থেকেই শুরু করি। সম্প্রতি ওয়াসার সদর কার্যালয়ে কয়েকজন সেবাপ্রার্থী গিয়েছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ‘শতভাগ বিশুদ্ধ’ পানি খাওয়াতে। কিন্তু তিনি পানি খাননি, তাঁদের সঙ্গে দেখাও করেননি। কীভাবে দেখছেন ঘটনাটি?
নজরুল ইসলাম: ঘটনাটি দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। সেবামূলক সরকারি সংস্থার জবাবদিহি থাকতে হবে। এখানে সেই জবাবদিহি থাকল না। আপনি কিছু করতে পারেন বা না পারেন, সেবাপ্রার্থীদের কথা শুনতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিনয়ী হতে হবে। অহংকার দেখানোর সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁদের আচরণে তার প্রতিফলন দেখি না।
কিন্তু ওয়াসার এমডির এ রকম আচরণের পর সরকার বা মন্ত্রণালয় থেকেও আমরা কোনো ব্যাখ্যা পেলাম না।
নজরুল ইসলাম: এ ধরনের নীরবতা কাঙ্ক্ষিত নয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলতে পারতেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। একটা কথা বলব, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি খুব ভালো। কিন্তু সেই পানি ভোক্তার কাছে যেতে যে পাইপলাইন ব্যবহার করা হয়, নানা কারণে সেটি সব সময় পরিচ্ছন্ন থাকে না। অন্যদিকে ঢাকার ভূ-উপরিভাগের পানিতে সমস্যা আছে। আদি উৎস বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহারযোগ্য নয়। আমরা শীতলক্ষ্যার পানি আনতাম, তা-ও এখন দূষিত। এখন পদ্মা নদী থেকে পানি আনার একটি মেগাপ্রকল্প সমাপ্তির দিকে। অচিরেই হয়তো মেঘনা বা যমুনা নদী থেকে পানি আনার পরিকল্পনা করা হবে। তা ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানের ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎসের পরিবর্তে অবশ্যই ভূ-উপরিস্থিত পানির উৎসের কথা ভাবতেই হবে। ওয়াসা বোধ হয় সেভাবেই এগোচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসা সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে সম্প্রতি কথা উঠেছে এবং সেই সূত্রে আদালত ওয়াসাকে তার পানির মান পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কাজের জন্য ওয়াসা তথা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বেশ বড় অঙ্কের একটি বাজেটের কথা বলেছে। বিষয়টি বিস্ময়কর। নিজেদের সরবরাহ করা পানির মান পরীক্ষা করা ওয়াসার একটি নিয়মিত কার্যক্রম হওয়া আবশ্যক, এর জন্য নিজস্ব ল্যাবরেটরি থাকাটাও স্বাভাবিক।
যেকোনো আধুনিক নগর সুশৃঙ্খল রাখার জন্য মহাপরিকল্পনা থাকে। কিন্তু ঢাকা শহরে তো কোনো শৃঙ্খলাই নেই। অপরিকল্পিতভাবে শহর গড়ে উঠেছে।
নজরুল ইসলাম: ঢাকা যে একেবারেই পরিকল্পনাহীনভাবে গড়ে উঠেছে, এ কথা ঠিক নয়। ১৯১৭ সালে প্রথম ঢাকা শহর নিয়ে নগর-পরিকল্পনা তৈরি করেন ব্রিটিশ প্ল্যানার স্যার প্যাট্রিক গেডিস। তবে সেটি কখনো বাস্তবায়নের সুযোগ পায়নি। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫৬ সালে, ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট গঠিত হওয়ার পর ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয় ১৯৫৯ সালে। এর মেয়াদ ছিল ২০ বছর, তার অনেকটাই বাস্তবায়ন হয়েছে। ঢাকা যে এখনো মোটামুটি সচল আছে, তার প্রধান কারণ ওই পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন উদ্যোগ। আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ইত্যাদি নামে আলাদা অঞ্চল তখনই গড়ে তোলা হয়। তবে পুরোপুরি কোনো এলাকাকে বাণিজ্যিক বা আবাসিক করা ঠিক হয়নি। রাতে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা বিরান পড়ে থাকে। বাংলাদেশ আমলে তৈরি হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (বা ডিএমডিপি)। এর মেয়াদ ছিল ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এই ডেভেলপমেন্ট খুব ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হয়েছে। বরং পরিকল্পনাটি অনেকটাই অবাস্তবায়িতই থেকে গেছে। ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল মেয়াদি যে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান হওয়ার কথা, সেটির খসড়া বা ড্রাফট এখনো সরকারের অনুমোদন পায়নি। অথচ এর আওতায় ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা ‘ড্যাপ’ তৈরি হচ্ছে। প্রক্রিয়টি মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়, আগে তো স্ট্রাকচার প্ল্যান অনুমোদন দরকার।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে ঢাকা শহরকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বসবাস অযোগ্য শহর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কীভাবে দেখছেন?
নজরুল ইসলাম: নানা সময়ে দেশের ভেতরে পরিচালিত জরিপে বা গবেষণাতেও ঢাকার বসবাস যোগ্যতার নিম্নমান চিহ্নিত হয়েছে। বিষয়টি অনেকটাই বাস্তব। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের বহু নগরের বসবাসযোগ্যতায় এসব জরিপ করে, যা আমাদের জন্য অনেক সময় প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা যে শহরটিতে আছি, সেখানে নাগরিক সুবিধা কতটা মানসম্মত, শহরটি জীবন্ত কি না। তবে আমি বলব নানা সমস্যা সত্ত্বেও ঢাকা শহর এখনো জীবন্ত। যানজট মোকাবিলা করতে পারলে নাগরিক জীবন অনেকটা স্বস্তিদায়ক হতো। এখন যে মেট্রোরেল হচ্ছে, সেটি হওয়ার কথা ছিল কয়েক বছর আগেই। আমরা পরিকল্পনা নিই, কিন্তু সময়মতো জরুরি কাজগুলো হয় না। এ কারণেই নাগরিক ভোগান্তি বেড়েছে। নগর উন্নয়নে যেসব সেবা প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোতে যোগ্য ও সৎ লোকের প্রচণ্ড অভাব। আমাদের প্রশাসনের সমস্যা দ্বিমুখী। একদিকে জনগণকে সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা ও দক্ষতা কমেছে, অন্যদিকে দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ মোদ্দা কথা, সুশাসনের প্রচণ্ড ঘাটতি আছে।
ঢাকার বর্তমান ও পূর্ববর্তী মেয়রদের রেটিং দিতে বললে আপনি কাকে কত নম্বর দেবেন?
নজরুল ইসলাম: প্রশ্নটির উত্তর সহজ নয়। ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। তাঁর আন্তরিকতা ছিল। তিনি নগর পরিচালনায় সুদক্ষতা আনয়নের জন্য নগর সরকার প্রবর্তনের দাবি করেছিলেন, কিন্তু সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ সমর্থন আদায়ে সফল হননি, যদিও সরকার ছিল তাঁর নিজের দলের। মেয়র হানিফ বস্তি উন্নয়নের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রেখেছিলেন। আমার কাছে এটি খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ ছিল। তাঁর উত্তরসূরি মেয়র সাদেক হোসেন খোকা নগর পরিচালনার চেয়ে জাতীয় রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতেন। তিনিও মেয়র হানিফের মতো নগর সরকারব্যবস্থার দাবিদার ছিলেন, কিন্তু তাঁর পূর্বসূরির মতোই তাঁর নিজ দলের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের যথাযথ সমর্থন আদায় করতে পারেননি। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কাজে যথেষ্ট উদ্যম ও গতি ছিল। তিনি ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তার সূচনা করেছিলেন। কিন্তু আমরা তো তাঁকে বেশি দিন পাইনি। রেটিংয়ে তাঁর অবস্থান উঁচুতে থাকবে। বর্তমানে উত্তরের নবনিযুক্ত মেয়র আতিকুল ইসলামের বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। সেটিও দক্ষ নগর প্রশাসনের কাজে লাগে। শুরুতেই তিনি নানা চ্যালেঞ্জের সাহসী মোকাবিলা করেছেন। তুলনায় দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা শুরুতে হয়তো কম ছিল। তবে ইতিমধ্যে তা অনেকটাই অর্জন করেছেন। উত্তর–দক্ষিণ বর্তমান দুই মেয়রের উদ্যম প্রশংশনীয়। তবে এক–একটি জটিল আধুনিক নগর পরিচালনার জন্য উভয়ের জন্যই নাগরিক সম্পৃক্ততা সমৃদ্ধ নগর-পরিচালন পদ্ধতি অনুসরণ জরুরি।
মুমূর্ষু ঢাকাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় কী?
নজরুল ইসলাম: আমরা যদি একটি শহরকে আধুনিক ও বসবাস উপযোগী করতে চাই, তাহলে তার কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা খেয়াল করতে হবে। শহরের অর্থনৈতিক শক্তি, জনজীবনে গতিশীলতা, নাগরিকদের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও মানবিকতা, টেকসই পরিবেশ, সাংস্কৃতিক শক্তি ও দৃশ্যমান নান্দনিকতা এ রকম কিছু বৈশিষ্ট্য বা সূচক বিবেচ্য। একটি আধুনিক শহরে পানি, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি ব্যবস্থা যথাযথভাবে থাকতেই হবে। ঢাকায় এখন অন্যান্য বিষয় মোটামুটি থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ফলে গতিশীলতার দিক থেকে শহরটি অনেক পিছিয়ে আছে। প্রচণ্ড হয়রানির মধ্যেই আছে ঢাকার নাগরিকেরা। পরিবেশ–পরিস্থিতিও সমস্যা-সংকুল।
এর প্রতিকার কী
নজরুল ইসলাম: প্রথম কথা ঢাকার জন্য একটি উপযুক্ত পরিচালন ব্যবস্থা ও যথাযথ বিশ্বাসযোগ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এখন তো সিটি করপোরেশনের অভিভাবকত্বের কথা তেমন শোনা যায় না। আগে ঢাকার জন্য একজন মেয়র ছিলেন, এখন দুজন। অনেক দিন আগে থেকে নগর সরকারের দাবি উঠেছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি। মোহাম্মদ হানিফের সময় তাঁর চাহিদার নগর সরকারের বিকল্প হিসেবে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সমন্বয় কমিটি হয়েছিল, কাজ করেনি। পরবর্তী মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সময়েও একই পরিস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বর্তমান দ্বিখণ্ডিত (উত্তর ও দক্ষিণ) সিটি করপোরেশনের বাস্তবতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। ঢাকার নগর–পরিকল্পনার দায়িত্বে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক। এর আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত চারটি সিটি করপোরেশন-ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং সাভার পৌরসভাসহ অনেকগুলো গ্রামীণ ইউনিয়ন পরিষদ। নগর সরকার চাইলে তো সব সিটি করপোরেশনই তা চাইবে। সে ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকা তথা বৃহত্তর ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন চিন্তা কার দায়িত্ব হবে? আমি মনে করি, নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও এমন একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যে নগরের সব সেবা সংস্থাকে নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং সেটি একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর নেতৃত্বে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এই কর্তৃপক্ষ হবে মূলত একটি সমন্বয় পরিষদ, যার সদস্য থাকবেন রাজধানী ঢাকার সব মেয়র, এমপিরা, সব সেবাপ্রদানকারী সংস্থার প্রধানরা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
আপনি কি ওই সংস্থার জন্যই একজন মন্ত্রী নিয়োগ করার কথা বলছেন?
নজরুল ইসলাম: হ্যাঁ, বিষয়টি এমন নয় যে অন্য দপ্তরের কোনো মন্ত্রী এখানে এসে বৈঠক করে দায়িত্ব শেষ করবেন। এই মন্ত্রীর কাজ হবে শুধু ঢাকা শহরের সার্বিক দেখভালকারী সব সিটি করপোরেশন ও সব সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
জলাবদ্ধতা নিরসনের উপায় কী। বর্ষা এলেই ঢাকা শহর ডুবে যায়।
নজরুল ইসলাম: ঢাকা শহরের ভেতরে একসময় ৫০টির বেশি খাল ছিল। সবটা না পারলেও অন্তত ১৫টি খাল উদ্ধার করতে পারলে জলাবদ্ধতা কমানো অনেকটাই সম্ভব। পান্থপথের কংক্রিট সরিয়ে খাল বানানোর প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেসব খালের অস্তিত্ব এখনো আছে, সরকার সেগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা করুক। সংস্কার করে কার্যকর রাখুক। পাশাপাশি ‘ড্যাপ’ নির্দেশিত জলাশয়গুলো সংরক্ষণ নিশ্চিত করুক।
বায়ুদূষণ নিয়ে সম্প্রতি হাইকোর্ট দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহীকে কৈফিয়ত তলব করেছেন। তাঁরা চোরকে চোর বলতে বলেছেন। তাহলে কি এখন সিটি করপোরেশনে কোনো জবাবদিহি নেই?
নজরুল ইসলাম: জবাবদিহি থাকলে এ রকম পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। ঢাকা শহর আজ নানা রকম দূষণের শিকার। বাতাসদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ, বর্জ্য পরিষ্কার না হওয়ার দূষণ। তা ছাড়া রয়েছে দৃশ্যদূষণ। তবে এই মুহূর্তে বাতাসদূষণই সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। ঢাকায় যেসব কলকারখানা আছে, তাতে বাতাসদূষণ বেশি হচ্ছে না, দূষণ বেশি হচ্ছে যান্ত্রিক যানবাহন থেকে ও ঢাকার চারপাশে ঘিরে থাকা অসংখ্য ইটভাটা থেকে। উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার জন্য পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না। বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য অপসারণের কাজও সময়মতো ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে হবে।
জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা পৃথিবীর নবম বৃহত্তম নগরী। এত কম জায়গায় এত বেশিসংখ্যক মানুষের বসবাসকে কি আপনার অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না?
নজরুল ইসলাম: অবশ্যই জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের প্রথম কয়েকটি শহরের একটি। তবে ঢাকা শহরের চেয়েও বেশি মানুষ বাস করে এমন অনেক শহর আছে পৃথিবীতে। তা সত্ত্বেও সেখানে সবকিছু নিয়মমাফিক চলে। আমরা নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, ঢাকা শহরে এখনো প্রতিবছর প্রায় ৪ শতাংশ হারে মানুষ বাড়ছে। অচিরেই এই বৃদ্ধির হার শূন্যে নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ ঢাকা শহরে আর মানুষ বাড়তে দেওয়া যাবে না। এর জন্য বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানে ঢাকা শহরের চারপাশে স্যাটেলাইট টাউন বা উপশহর গড়ে তোলার কথা আছে। সেটি বাস্তবায়ন করতে পারলে চাপ অনেকটা কমবে। তবে এ ধরনের উপশহরে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। আরও ব্যপক অর্থে দেশব্যাপী সত্যিকারের বিকেন্দ্রীকরণ আবশ্যক। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কী প্রকারের হবে, তা বিবেচনার বিষয়।
ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে?
নজরুল ইসলাম: ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের প্রস্তাবিত মেয়াদ ২০১৬-২০৩৫। কিন্তু মূল প্ল্যানের অনুমোদনের কাজটিই এখনো সম্পন্ন হয়নি, সে ক্ষেত্রে এর সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন, অগ্রগতি প্রশ্ন সাপেক্ষ। পাশাপাশি অনুমোদিত হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি। এই প্ল্যানের অধীনে পরিবহন খাতে কিছু মেগা-প্রকল্প চলমান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত মেট্রোরেল প্রকল্প ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প। তা ছাড়া রয়েছে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান। যদি এসটিপি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে রাজধানী ঢাকার বসবাসযোগ্যতা বাড়বে। তবে এ কাজটি সময়সাপেক্ষ ও অত্যন্ত জটিল। ব্যয় সাপেক্ষ তো বটেই।
রাজউক কি ঠিকমতো তার দায়িত্ব পালন করছে? আমরা দেখছি তারা মূল দায়িত্ব পালন না করে ব্যবসা করছে। ফ্ল্যাট তৈরি করে সেগুলো বিক্রি করছে।
নজরুল ইসলাম: রাজউকের দায়িত্ব হলো বৃহত্তর ঢাকার নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা করা এবং তার বাস্তবায়ন। এ ছাড়া তার দায়িত্ব হলো নানা সংস্থা ও ব্যক্তি খাতে সম্পাদিত নগর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি বা মনিটরিং করা। ব্যবসা করা তাদের কাজ নয়। দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন হলে মানুষ আপত্তি করত না। কিন্তু রাজউকের কাজকর্মে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ আছে। একই জাতীয় সংস্থা ভারতের দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মনে হয় এ ধরনের অভিযোগ আসে না। এই যে নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, রাজউকের একশ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া সেটি সম্ভব হতো না। আসল কথা সেবা প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। ঢাকা শহরকে হতে হবে নাগরিকবান্ধব, মানবিক। সাবেক মেয়র আনিসুল হক তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে কথাটি বলেছিলেন। কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, এসডিজির এমন অঙ্গীকার মনে রাখা উচিত।
কিন্তু বাস্তবে আমরা কি সেটি দেখছি? ঢাকা শহরের একদিকে অভিজাতপাড়ার চাকচিক্য বাড়ছে, অন্যদিকে বস্তির বাসিন্দারা মানবেতর জীবন যাপন করছে।
নজরুল ইসলাম: এটাই তো দুঃখ। এই রাজধানী শহর পরিচালনার ভার যাঁদের ওপর, তাঁরা এটিকে মানবিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন না কিংবা পারছেন না। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বইয়ের শিরোনামের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করব। তিনি লিখেছিলেন, ‘ওরা টোকাই কেন?’ মানবিক শহর করতে হলে এই টোকাইদের কথাও ভাবতে হবে। লাখ লাখ বস্তিবাসীর কথা ভাবতে হবে, নিম্নবিত্তদের কথাও ভাবতে হবে।